কি হয়েছে! যথার্থ অসহায় বোধ করছে মহাদেব সারাভাই, কাগজের এসব লেখা দেখে গেল না! আড়ে আড়ে ক’বার ও প্যাডটার দিকে তাকিয়েছে তুই লক্ষ্য করেছিস? কি মুশকিলেই যে ফেললি আমাকে–
কেউ দেখে গেল বলে নয়, মনে মনে অন্য কারণে শঙ্কা বোধ করছে শঙ্কর সারাভাই। তার আসার উদ্দেশ্যটাই ব্যর্থ হয়ে গেল কিনা বুঝছে না। আপাতত মেসোকেই আগে ঠাণ্ডা করা দরকার। বলল, দেখে গিয়ে থাকলে তোমাকে এরপর খাতিরই করবে দেখো, এ-সব ব্যাপারে তারও লক্ষ লক্ষ টাকা খাটছে।
বিস্ময় সত্ত্বেও একটু যেন জোর পেল মেসো। তারও লক্ষ লক্ষ টাকা খাটছে! এই সব ফাটকা-টাটকার ব্যাপারে। আঃ, এদিকে তাকা না! তোকে কে বলল?
এ লাইনে যারা ঘোরে সকলেই জানে, অম্লানবদনে মিথ্যা আশ্রয় নিল শঙ্কর, আজকের এই মওকার খবরও তার জানা আছে ভাবো নাকি। আমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলে না কেন, তোমায় সামনেই জিজ্ঞাসা করতাম এই ডিলটার প্রসপেক্ট কি-রকম।
যাক, মেসো অন্ধকারে যেন আলো দেখল একটু, মহাজনগত পন্থা অনুসরণের ব্যাপারটা ধরা যদি পড়েও থাকে–ফলাফল অকরুণ না হবারই কথা। বলল, যা হবার হয়েছে, এখন চল, দেখি কি করা যায়।
.
শঙ্কর সারাভাইয়ের ভিতরটা চঞ্চল হয়ে আছে। মেসোকে হাত করা গেছে যখন, মাসির কাছ থেকে টাকা বার করতে খুব বেগ পেতে হবে না হয়তো। নিঃসন্তান মাসি তাকে ভালইবাসে। তবু টাকা হাতে না আসা পর্যন্ত স্বস্তি বোধ করার কথা নয়। তা ছাড়া একটা নৈতিক অধঃপতনের সঙ্গে বিলক্ষণ যুঝতে হয়েছে। যা বলা হবে সেটা সত্যি কথাই। কিন্তু মেসোর বেলায় গোটাগুটি মিথ্যের আশ্রয়ই নিতে হল তাকে। ….আশ্চর্য পরিস্থিতি, সত্যি যা মাসি তাই জানবে অথচ মেসে সেটা ছলনা ভাববে। ছলনা ভাববে বলেই সায় দেবে তার কথায়। সত্যি জানলে বাড়িতে ঢুকতে দিতে চাইত না।
কিন্তু এই অস্বস্তির ফাঁকে ফাঁকেও চেম্বারের বড়সাহেব চন্দ্রশেখর পাঠকের মুখখানা চোখে ভাসছে তার। ভদ্রলোককে দেখার ইচ্ছে ছিল, আজ দেখা হয়ে গেল। ব্যবসায়ী জীবনে তার একাগ্ৰ নিষ্ঠা আর সহিষ্ণুতার গল্প কত শুনেছে ঠিক নেই। শঙ্করের মতো সংগ্রামী জীবন যাদের, তাদের চোখে বিরাট সফল মানুষ চন্দ্রশেখর পাঠক। নিজের চেষ্টায় এত বড় হয়েছে, নিজের বুদ্ধির বলে আজ দেশের একটা প্রধান শিল্পের উপর তার অপ্রতিহত প্রতাপ।
ভদ্রলোকের কীর্তির সব থেকে বড় নজির সম্ভবত বর্তমানের এই কটু চেম্বার। ভিন্ন নামে মিল-মালিকদের এ ধরনের প্রতিষ্ঠান আরও আছে। কটু চেম্বারের পাশে সে-সব নিষ্প্রভ এখন। চন্দ্রশেখর পাঠক নিজে এই চেম্বারের স্রষ্টা, ফলে নিজেই সর্বেসর্বা। এখন সব থেকে বড় বড় মিলগুলো এই চেম্বারের আওতার মধ্যে এসে গেছে। নতুন মিল মালিকেরা স্বপ্ন দেখে কবে ওই চেম্বারের সভ্য হবে। তাই চন্দ্রশেখর পাঠকের শুধু নিজের ব্যবসায় নয়, সমস্ত দেশের বস্ত্র শিল্পের ব্যবসার নীতি এই চেম্বারের দখলে।
প্রতিষ্ঠানটিকে জনপ্রিয় করে তোলার ফন্দি-ফিকিরও ভদ্রলোক কম জানে না। এখানকার সমস্ত ব্যবসায়-মহলে সাড়া জাগিয়ে মহা সমারোহে চেম্বারের বাৎসরিক অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। সেই অনুষ্ঠানের প্রধান লক্ষ্য যেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের উৎসাহ উদ্দীপনা আর প্রেরণা যোগানো, কিন্তু আসলে এটাই বোধহয় চেম্বারের সব থেকে বড় প্রচারানুষ্ঠান। সেই প্রচারই বড় প্রচার যে দেশের সর্বসাধারণের চোখ টানে। ছোট ঘোট ব্যবসায়ীদের তৈরি সেরা কাপড়ের স্যাম্পল নিয়ে মস্ত একজিবিশন হয় প্রতিবার। সেই সব স্যাম্পল নিয়ে এক্সপার্টরা বিচার বসে।–কার কাপড় সব থেকে ভালো। কাপড় বলতে সবই অবশ্য শাড়ি। পাড় নক্সা ফিনিশিং ইত্যাদির বিচারে যে শাড়ি প্রথম হবে, সেই শাড়ির নির্মাতার ভাগ্যে এক লক্ষ টাকা পুরস্কার। এইভাবে জাকজমক করে আর মর্যাদা দিয়ে ছোট ব্যবসায়ীকে নিজের পায়ে দাঁড়াবার প্রেরণা যুগিয়ে থাকে চেম্বার।
শঙ্কর সারাভাইয়ের জীবনের একমাত্র স্বপ্ন, তার খেলনার মতো কাপড়ের ব্যবসাও একদিন মস্ত বড় হবে, এই সব মিল-মালিকদের মতো নিজস্ব মিল হবে তারও। শঙ্কর সারাভাইয়ের এমন অনেক নাম মুখস্থ, যারা তার মতোই নগণ্য ছিল একদিন–যারা ছোট থেকে বড় হয়েছে। ওই চন্দ্রশেখর পাঠকের জীবনেই কি কম ঝড়-ঝাপটা গেছে। অতএব একটা আশার আলো সামনে রেখেই এগোতে চেষ্টা করছে। শঙ্কর। কিন্তু তার আশায় আলোটা জোনাকির আলো। ক্ষণে ক্ষণে জ্বলে আর নেভে। এই আশা নিজের কাছেই শূন্যে প্রাসাদ গড়ে তোলার মতো অবাস্তব মনে হয় এক-একসময়। তবু এই আশা নিয়েই বেঁচে আছে। এটুকু আশা গেলে পায়ের নিচে মাটিও সরে যাবে জানে বলেই চোখ-কান বুজে একেই আঁকড়ে আছে।
কিন্তু তা সত্ত্বেও কটন চেম্বারের এক লক্ষ টাকার প্রাইজের সিকেটা কোনদিন তার ভাগ্যে ছিঁড়বে এমন আশা সে কখনো করে না। তার প্রথম কারণ, মৌলা থেকে ট্রেন ভাড়া গুণে এখানে এসে একজিবিশনের কাপড় সে প্রতিবারই পরখ করে দেখে থাকে। কোনো একটা কাপড়ও দৃষ্টি এড়ায় না, সব খুঁটিয়ে দেখে। এই সব কাপড় যারা পাঠায় তারা অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী হলেও তার তুলনায় অনেক বড়। তাদের সরঞ্জাম আছে, যন্ত্রপাতি আছে। সেকেণ্ডহ্যাণ্ড কি থার্ডহ্যাণ্ডে কেনা শঙ্করের একটা মাত্ৰ ছোট ভাঙা কল মাসে কম করে দশদিন অকেজো হয়ে পড়ে থাকে। আর এটা-ওটা বদলে নিজের হাতে মেরামত করে যে কাপড় তৈরি হয় সেটার সাহায্যে, তার মান কোন স্তরের সেটা নিজেই সে খুব ভালো জানে। যে শস্তার কাপড় বা শাড়ি সে নিজের হাতে তৈরি করে, তার খদ্দের তারই মতো অবস্থার লোক। বিশ-ত্রিশখানা করে এই কাপড় তৈরি করার উপকরণও সব মাসে হাতে থাকে না। কাপড় ছেড়ে তখন শুধু গামছাই তৈরি করতে হয়। আর মেশিন বিগড়ালে তো তাও হয়ে গেল। অতএব, একজিবিশনে স্যাম্পল পাঠানোর চিন্তাটাই তার কাছে হাস্যকর।
