কথায় কথায় সুচারু দেবী বললেন, হ্যাঁরে রাধা ডাক্তার গিন্নির কোন্ বোনকে দেখে আর তার খুব বিপদের কথা শুনে তুই নাকি বলে দিয়েছিলি পনেরো দিনের মধ্যে সব বিপদ কেটে যাবে–তাই হয়েছিল, সত্যি নাকি?
লজ্জা পেয়ে রাধা বলল, আমি বলার কে, মা বলালে, বলি ফেললাম, ডাক্তার দিদির বোন কান্নাকাটি করছেল সোয়ামীর ব্যাঙ্কের কি গণ্ডগোলে তার বিচার চলছে, শাস্তি হলে চাকরি যাবে জেল হবে, তা ভদ্রলোকের মুখে চেয়ে আমি কোনো বিপদের হেঁয়াই দেখলাম না, কিন্তু ওই বোনের কান্না দেখে ঘাবড়ে গেলাম, তখন মা বলে দিলে কিচ্ছুটি হবে না।
অংশুমান তখনো মুখ থেকে কাগজ সরাননি। কাকতালীয় ব্যাপার কিছু ঘটেছে ধরে নিয়ে মনে মনে হাসছেন। স্ত্রী হঠাৎ সাগ্রহে জিগ্যেস করে বসলেন, তা তোর বড়বাবুকে দেখে বলে দে না, বদলির তো সময় হয়ে আসছে, এবার প্রমোশন মানে উন্নতি টুন্নতি কিছু হবে কি না?
মুখ থেকে অংশুমান এবার কাগজ সরালেন। স্ত্রীর বিশ্বাসের বহর দেখে কৌতুকই বোধ করছেন। রাধা একটু ঘুরে তাঁর দিকে কয়েক পলক চেয়ে রইলো, তারপর তার স্ত্রীর দিকে ফিরে আসতে করে বলে বসল, তোমরা এখন ইখেন থেকে নতুছ টড়হ না-গো দিদি, আমাদের ভাগ্যিতে ইখেনেই তোমরা আরো অনেক বছর আছ।
শুনেই অংশুমান বিরক্তিতে ভুরু কোচকালেন। এদিকে সুচারু দেবী বলে উঠলেন, বলিস কি রে তুইমার ছ’মাস এক বছরের মধ্যে তো নড়তেই হবে, তাছাড়া উন্নতিও হবার কথা।
নেই অংশুমান তাকেই খেঁকিয়ে উঠলেন, এসব তোমাকে কে জিগ্যেস করতে বলেছে-বুজরুকির কথা শুনতে খুব ভালো লাগে –কেমন?
বড়বাবুর হঠাৎ এই রাগ দেখে রাধা প্রথমে বেশ অবাক। তারপর গম্ভীর। মোড়া ছেড়ে আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ালো। স্থির চোখে মুখের দিকে চেয়ে বইলো খানিক। ধীর ঠাণ্ডা গলায় বলল, বুজরুকির কথা আমি বলি না বড়বাবু, মা সহজে বলায় না, কিন্তু রগড় দেখার জন্য হঠাৎ হঠাৎ কেন যে বল তা-ও জানি না, বাগ করো আর যা-ই কবে এখন অনেক বছরের মধ্যি তোমার নড়া-চড়া বা উন্নতি-টুন্নতি কিছুই হবেনি, ইখেনেই থাকতে হবে তোমাকে বড়বাবু।
এবারে অংশুমান আরো রেগে গেলেন। বলে উঠলেন, আর তার অনেক আগে যদি আমাকে এখান থেকে যেতে হয় তাহলে যে-কোনো ছুতোষ আমি তোকে এখানকার লক-আপে ঢুকিয়ে রেখে যাব জেনে রাখিস।
-কোথায় ঢুকিয়ে রাখবে?
অংশুমান চেঁচিয়ে উঠলেন, এখানকার গারদে–বুঝলি? সহজে যাতে না ছাড়ে সেই ব্যবস্থা করে যাব।
এবারে বাধা হেসে মাথা হেলালো। তাই কোরো, এক বছর ছেড়ে তিন বছরে তুমি ঠাঁই না হলে আমি নিজে তোমার লোক অপের বাসিলে হব।
…একটা বছরের ওপর ঘুরে গেল। অংশুমান নিজে কলকাতায় এসে তদবির করে গেছেন। কিন্তু প্রশাসনের চেহারাই তখন অন্য বকম। চতুর্থ জেনারেল ইলেকশনে হেরে প্রযুল্ল সেনকে সরে যেতে হয়েছে, তার জায়গায় অজয় মুখার্জি মুখ্যমন্ত্রী, তার কিছুদিনের মধ্যে প্রফুল্ল ঘোষ। পুলিশের কর্তাব্যক্তিরা তখন নিজেদের নিয়ে ব্যতিব্যস্ত। মফস্বলের এ পর্যায়ের কর্মচারীর ব্যক্তিগতভাবে কার কি ক্ষতি হচ্ছে দেখার ফুরসৎ নেই।
শুনে সুচারু দেবী চিন্তিত। মেয়েটা তাহলে কি কথা বলে গেছল গো?
অংশুমান বিরক্ত। ছাড়ো তে! কলকাতার বাবুদের কি এভাবেই চলবে নাকি? এখন না হয় ছ’মাস আট মাসের মধ্যে হবে!
*
ডাক্তার বিজন চৌধুরীর মুখে খবরটা শুনে সুচারু দেবী তো কেঁদেই ফেললেন, মনে যত রাগই থাক অংশুমানও স্তম্ভিত।
রাধার স্বামী হারাণ মণ্ডল মারা গেল। সেরিব্রাল থ্রম্বসিস, এক থাবাতেই দেহের একদিক পড়ে গেছে, গত কাল বিকেলে খবর পেয়ে ডাঃ চৌধুরী ছুটে গেছলেন, আজ গিয়ে ডেথ সারটিফিকেট লিখে দিয়ে এলেন।
রাধার তেইশ বছর বয়েস মাত্র।
ডাক্তারের পরের কথায় স্বামী-স্ত্রী দুজনেই বিস্মিত। বললেন, আশ্চর্য মেয়ে মশাই আর তেমনি স্নায়ুর জোর। কান্নাকাটি হা-হুতাশ কিচ্ছু নেই। উল্টে ঠাণ্ডা মুখে তাকে নাকি বলেছেন, এরকম কিছু একটা ঘটবে ও আগেই বুঝেছে, করাত ধরে খুব বাজে স্বপ্ন দেখছিল।
কি স্বপ্ন সেটা তিনি বলতে পারলেন না, জিগ্যেস করার সময়ও নয়।
রাধার চার বছরের বিবাহিত জীবনে হারাণ মণ্ডলের অস্তিত্ব প্রায় নিষ্প্রভই ছিল। তার বাইরের কাঠামো দেখে বোঝা যায়নি ভাঙের সঙ্গে নানা ছাই-ভস্ম মিশিয়ে খেয়ে খেয়ে জীবনী শক্তি কত ঝঝিরা করে ফেলেছে। রাধার মতো বউ পেয়েই খুশি, কিন্তু তার সাধ যতো ছিল সাধ্য ততো ছিল না। কিন্তু এ নিয়ে রাধার খুব একটা অভিযোগ ছিল না। নেশা ছাড়াতে চেষ্টা করে দ্যাখে লোকটার খাবিখাওয়া মাছের মতো প্রাণ যায় যায়। তাই চেষ্টা ছেড়েছে। লোকটা তার কথায় ওঠে-বসে, রাধা নিজের মন মেজাজ আর ভাব নিয়ে বেশ আছে।
কেবল এক ব্যাপারে বয়স্ক মানুষটার ওপর খুব বিরক্ত। লোকটার শোয়া বড় খারাপ। নেশার ঘোরে কিনা জানে না, জায়গা পেলে বেহুশ ঘুমে ঘরের চারদিকে গড়াবে। এদিকে তার ঘরের মাটির দেয়ালে ঠেস-দেওয়া সারি সারি ছবি বসানো। মাঝখানে মা-কালীর বড় ছবি, তারপর শিবের। এদের এক পাশে ফকির সাহেবের দেওয়া মলোঙ্গা বাবার ছবি, বড়পীরের ছবি। অন্যদিকে শফিদার মায়ের দেওয়া বনবিবি আর বিবিমায়ের ছবি। বনবিবির পায়ের কাছে তিন-তিনটে বাঘ। রাধা রোজ সক্কলের সামনে ফুল-জল রাখে, ভক্তিভরে সবাইকে প্রণাম করে। গান গেয়ে বা কপালী বাবার জংলি মায়ের আরতি দেখে রাধার ফিরতে একটু রাত হয়ই। কিন্তু এসেই সেই এক দৃশ্য তাকে দেখতেই হবে। মানুষটার লুংগি ঠিক থাকে না বলে রাধার হুকুমে তাকে একটা পাজামা পরে শুতে হয়। কিন্তু ঘুমের মধ্যে গড়াতে গড়াতে কোনো না কোনো ছবির গায়ে তার পা ঠেকবেই।
