রাধা আঁতকে উঠে চেঁচামেচি করে ছুটে আসে, বকাবকি করতে করতে ধাক্কা মেরে মেরে ঠেলে ঠেলে তাকে জায়গায় নিয়ে যায়। নেশার ঘোরে লোকটা বিড়বিড় করে কি বলে, আবার ঘুমিয়ে পড়ে। যার গায়ে পা ঠেকেছে অনেকক্ষণ ধরে তাকে তো বটেই, বাকি সব ছবিতে ভক্তিভরে প্রণাম করে তবে স্বস্তি। কতদিন সকালে বকাঝকা করেছে, এঘরে আর তোমার ঠাঁই হবে না, পিছনের ওই চালা ঘরে তোমার শোবার ব্যবস্থা করব।
বেজার মুখ করে হারাণ বলে, আমি কি ইচ্ছে করে তোর ঠাকুরের গা ছুঁই?
সে রাতে ঘুমনোর আগে রাধা ঘরে থাকলে আর এরকম হয় না, ওকে ডিঙিয়ে তো আর যেতে পারে না। বিছানা পেতে মাঝখানে উঁচু করে কিছু রেখে গেলেও এক-এক রাতে এসে দেখে সে-সব ঠেলেঠুলে ঠিক ফোটোর দিকে বা কোনো ফোটোর গায়ে তার পা। ভেবেচিন্তে রাধা এরপর একটা পাকা ব্যবস্থা করল। ওর নিজের একটা বড়সড় আর উঁচু টিনের বাক্স আছে, আর হারাণের তার থেকে একটা হোট বাক্স আছে। বিছানা পেতে সেই দুই বাক্স মাঝখানে রেখে তবে বেরুত। ফিরে এসে সে দুটো সরিয়ে তবে নিজের শোয়া।
তা সত্ত্বেও নেশার ঘোরে জায়গা ভুল করে সে এক-একদিন রাধার জায়গায় শুয়ে পড়ে। ছবিগুলোর তখন বিতিকিচ্ছিরি দশা। বিলাসীকে বকাবকি করার পর এ-ও অবশ্য কমেছে। লোকটার হুশ থাকতে থাকতে সে-ই দেখে নেয় ঠিক জায়গায় শোয় হল কিনা। হপ্তা তিনেক আগে রাধা বিকেলের দিকে বেরিয়েছিল। সন্ধ্যার মধ্যেই ফেরার কথা। কিন্তু এমন আটকে গেল, ফিরতে রাত নটা। মনে যে আশংকা ছিল এসে দেখে তার থেকেও বিপত্তি। বিছানার মাঝ খানে বিলাসী বাক্স পেতে দেবে এমন আশা করাও ভুল। লোকটা চিৎপাত হয়ে ছবিগুলোর উপরে পড়ে আছে।
তার পর থেকেই রাধা মাঝে মাঝে বিদিকিচ্ছিরি স্বপ্ন দেখে চলেছে। একদিন দেখল মায়ের খা রক্তে ভেজা, কোনদিন দেখল শিবের মাথার সাপ ফণা উঁচিয়ে ফোঁস ফোঁস করে কারো দিকে তেড়ে যাচ্ছে। একদিনের স্বপ্ন, বনবিবির পায়ের কাছ থেকে বাঘ তিনটে জীবন্ত হয়ে উঠে সগর্জনে কারো দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ছে।
এর দুদিন বাদে হারাণ মণ্ডল মারা গেল।
.
একটা বছরের ওপর কেটে গেল, আটষট্টি সাল পেরিয়ে উনসত্তর চলছে। ও সি হিসেবে অংশুমানের এখানে ছ’ বছর চলেছে। যেমন হতাশ তেমনি বিরক্ত। প্রশাসনের স্থিতি আসা দুরে থাক, দিনে দিনে আরো জটিল হয়ে পড়েছে। গেল বছরে প্রেসিডেন্ট রুল গেছে, তার প্রতিক্রিয়া পুলিশ কতৃপক্ষের ওপরেও পড়েছে। এ বছর আবার দ্বিতীয় যুক্তফ্রন্ট সরকার শাসনে এসেছে, অজয় মুখার্জি মুখ্যমন্ত্রী, জ্যোতি বসু উপমুখ্যমন্ত্রী। এই সরকারের স্থিতিশীলতা অনিশ্চিত, পুলিশ প্রশাসনেরও বিশেষ কাউকে নিয়ে মাথা ঘামানোর অবকাশ নেই। তার ওপর নকশাল উপদ্রব নানা জায়গায় ছড়িয়ে পড়ছে, ফলে শক্ত অফিসার হিসেবে অংশুমানের সুনামই তাঁর ক্ষতির কারণ। বড় কর্তাদের কাছ থেকে বন্ধ খামে যা আসে তার বেশির ভাগই সতর্ক তৎপরতার আদেশ বা নির্দেশ।
মনের এই অবস্থায় অনেক দিন পরে রাধার সঙ্গে দেখা। সঙ্গে স্ত্রী সুচারু দেবী।
তাঁর সঙ্গেও রাধার দেখা সাক্ষাৎ কমে গেছে, কারণ, বিশেষ কোনো অনুষ্ঠান ছাড়া রাধা বাড়ি যাওয়া ছেড়ে দিয়েছে। হারাণ মণ্ডল মারা যাবার পর সুচারু দেবী একবার এসেছিলেন। ওকে তেমন শোকগ্রস্ত না দেখে কিছুটা নিশ্চিন্ত হয়েছিলেন। কিন্তু তারপর ডেকেও আর তাকে বাড়িতে আনতে পারেননি। ইতিমধ্যে ডাক্তার গিন্নির বাড়িতেও সে আর আসেনি। মাঝে একবার মাত্র তার গান আছে শুনে ডাক্তার গিন্নিকে সঙ্গে নিয়ে দু’মাইল দূরের এক অনুষ্ঠানে গেছলেন। তখন দেখা হয়েছে। কিন্তু রাধাকে তখন অনেকে ঘিরে, কথা বলার সুযোগ হয়নি। দোতারাবাবুর মারফৎ রাধাকে একবার দেখা করার কথা অংশুমান নিজে মুখ ফুটে বলে পাঠিয়েছিলেন। এখানে আসার অনেক দিন পরে দোতারাবাবুর সঙ্গে আত্মীয়তার যোগসূত্র বেরিয়ে পড়েছিল। তার স্ত্রীর দুর সম্পর্কের কিরকম ভাই হন। বয়সে অংশুমানের থেকেও পাঁচ-ছ বছরের বড়। এদিকে এলে মাঝে মাঝে কোয়ার্টারস-এ আসেন। খোলামেলা মনের দূর-সম্পর্কের এই কালীভক্ত দাদাটিকে সুচারু দেবীর ভালো তো লাগেই, অংশুমানও পছন্দ করেন। তাঁর মারফৎ রাধাকে আসতে বলার কারণ স্ত্রীর ক্ষোভ আর চাপা গঞ্জনা। ওর প্রসঙ্গ উঠলেই বসেন, ও এখানে আর আসবে কেন, বাড়িতে নেমন্তন্ন করে এনে যে মূর্তি দেখিয়েছ। এখন ওর কথাই ফলছে কিনা?
ব্যাপার শুনে দোতারাবাবু হেসেছিলেন আবার একটু অবাকও হয়েছিলেন। বলেছিলেন, কখন যে কি মুডে থাকে মেয়েটা কিন্তু ও ভবিষ্যদ্বাণী-টানি করে এতো জানতাম না। তারপর সুচারু দেবীকে বলেছেন, তবে নিশ্চিন্ত থাকো, ও কারো ওপর রাগ পুষে রাখার মেয়েই নয়, এখন কারো বাড়িতেই বিশেষ যায়টায় না, ওর গান শোনার ইচ্ছে হলে আমাকেই এখন কপালী বাবার ডেরায় যেতে হয়, সন্ধ্যার পর বেশির ভাগ সময় সেখানেই পড়ে থাকে, জংলি কালীকে গান শোনায়। আমার বাড়িতে বিগ্রহ নেই, রুমা সেন আর বিন্দুবাসিনী দেবীর বাড়িতে গোপালের বিগ্রহ আছে, কেবল ওই দু’ বাড়িতে যায় শুনেছি। তবু বলব’খন।
থানার বড়বাবু যেতে অনুরোধ করেছেন শুনে রাধা বলেছে, মন না টানলে কোথাও তোত যেতে পারি না, দেখি–
