মন বিষিয়ে আছে কেবল মনোহর পাইক আর নিতাই স্যাকরার। এই কারণেই দুজনের ভাব এখন। বাবার কাছে এক চেলার মুখের খবর, নিতাইয়ের দোকানে বসে মনোহর নাকি বুক ঠুকে বলেছে, রাধাকে সে একদিন না একদিন চরম শিক্ষা দেবেই দেবে–না যদি পারে তাহলে ওকে যেন সবাই বে-জন্মা বলে। দোতারবাবুর বাজার সরকারও বাবাকে ভয়-ভক্তি করে। সে-ও এসে চুপিচুপি বলে গেছে, হাওয়া ভালো নয়, মনোহর পাইকের মেজাজ ভালো মতো বিগড়েছে। এখানকার মস্তানদের লিডার হিসাবে মনোহরের ক্রোধ দুর্বলের গর্জন বলে ভাবে না কেউ।
কিন্তু মনোহর পাইক চতুর কত সেটা কপালী বাবার বুঝতে বাকি। ক’দিন না যেতে তারও মনে হয়েছে ভিতরের ক্রোধ একটু বেশি জাহির করে ফেলেছে। বাইরে অনেকেই তাকে একটু সমঝে চলে বটে, কিন্তু রাধা আর বাবার ভক্তের সংখ্যা কম ন্য।-না, বাবাকে অন্তত সে বিৰূপ করে তুলতে চায় না এখন। যেসব কাজে-কর্মে ভিড়েছে, তাতে বাবার ভক্ত হিসেবে তার পরিচয় আরো উজ্জ্বল হওয়া বরং বাঞ্ছনীয়।
বুদ্ধিটা মাথায় আসতেই রাতে দামী বোতল নিয়ে বাবার কাছে হাজির। তাকে দেখেই বাবার রক্তচক্ষু। বোতল পায়ের কাছে রেখে সাষ্টাঙ্গে প্রণিপাত করে উঠতেই তিনি ব্যঙ্গম্বরে বলে উঠলেন, আবার এসব ভড়ং কেন, তোরা শালারা তো রাধার শেষ দেখে নিবি বলে শাসাচ্ছিস শুনলাম।
করজোড়ে মনোহর বলল, মানুষ ক্ষ্যাপা হয়ে গেলে কি হয় তোমার তো জানা আছে বাবা–দুঃখে যন্ত্রণায় আমার কি মাথার ঠিক ছেল! মাথা এট্ট ঠাণ্ডা হতে মনে হল, যা হয়ে গেছে, এরপর বাবার ছিচরণ খোয়ালে তো সই গেল–যা বলেছি সেসব ক্ষ্যাপা কুকুরের কথা বাবা, সব ভুলে মানা করে দাও।
এরপর খুশি হয়ে বাবা বোতল খুলেছেন। উপদেশ দিয়েছেন, এবারে তুই দেখে শুনে একটা বে করে ফ্যাল
মুখখানা কালি করে মনোহর মাথা নেড়েছে। বলেছে, সেই ছেলেবেলা থেকে আশা হিল থাকে ঘরে আনব, তা যখন হলনি, আর বে নয়।
এসব কথা বাবা পরদিনই রাধাকে বলেছেন। শুনেই রাগতমুখে রাধা বলে উঠেছে, ও একটা পাজির পা-ঝাড়া বাবা, ওর কোন কথা বিশ্বাস কোরো না।
বলেছে বটে, কিন্তু কোথাও একটু খচখচ করে লেগেছে। সেই ছেলেবেলা থেকে পিছনে লেগেছিল, সত্যি কথাই। ওর বিয়ের সাধ ভালো হাতে মেটানোর জন্য লাল পিঁপড়ের কামড় খাইয়ে একেবারে আধমরা করেছিল। একটু চুপ করে থেকে রাধা আবার বলেছে, ওর চরিত্তি আমার জানা আছে, তুমি থমকে বলে দাও এক মাসের মধ্যে বে করতি হবে। ঠিক করবে দেখে নিও, এ, রাধার জন্যি একেবারে বিবাগী দশা–বে করবে না।
.
ডাক এলেই রাখা আবার গান গাইতে যায়। কিন্তু সর্বত্র আসরে প্রথম যে গানটি গায় তা হল ডাকাতে ধরার ফলে যে কুৎসা রটেছিল তার সরস জবাব। এ-গানও নিজের মন থেকে উঠেছিল, পাছে তুলে যায় তাই লিখে রেখেছিল। নিজের সুরে বাঁধা ওই গানটাই প্রথমে গায়। লোকে কান পেতে শোনে, খুশিতে মন ভরে ওঠে, আবার চোখও সজল হয়। রাধা চোখ বুজে দুলে দুলে গায়ঃ
তুই কালের বুকে দাঁড়ায়ে কালী।
চার আঙুল লাজ দেখালি,
মা আলো (আর) তার মেয়ে কালো
এমন বিচার কোথায় পেলি?
নিজে সাজলে দিগম্বরী
সবাই বলে আহা মরি।
মেয়ে রয় বসন পরি
তবু বলে লাজে মরি!
মা তোর সবই দেখি উল্টা পালটা
মা সতী আর মেয়ে কুলটা!
এবার মাগো রঙ্গ ছাড়
হতেছে খুব বাড়াবাড়ি,
(মা) যদি রাখতে চাস নিজের মান
তবে মায়ে-মেয়ে কর সমান।
পাড়ার কালীপুজোর আমন্ত্রণে সৌজন্য রক্ষার্থে সস্ত্রীক এসে ওর মুখে এ-গান অংশুমানও শুনেছেন। ভালো লেগেছিল। ওই এক গানেই আসর জমিয়ে দিয়েছিল। সুচারু দেবী সানন্দে জানিয়েছেন, ওর মুখে এ-গান আমি আরো দুবার দু’জায়গায় শুনেছি। ডাকাতে ধরে নিয়ে যাবার পর সেই যে নানা কুৎসা রটেছিল, তার জবাব দেবার জন্য এ-গান ও নিজে বেঁধেছে!
অংশুমান কোনো মন্তব্য করেননি। কিছুদিনের মধ্যে সুচারু দেবী মেয়ে-জামাই দুজনকেই নেমন্তন্ন করেছেন। রাধা প্রথম এসে তার বাড়িতে উপোসী থেকে গেছে, এ খেদ তার যায়নি। ওদের আনার জন্য জিপও পাঠিয়েছেন। কিন্তু রাধা একলা এসেছে। অন্য জনের কথা জিগ্যেস করতে হেসে বলেছে, জামাই তোমাদের রাতের ভাঙের জের কাটাতে নিমানেও ঢুলুঢুলু–তাকে কে আনে। পরের আড়াই তিন বছরের মধ্যে রাধা আর বার-তিনেক সুচারু দেবীর নেমন্তন্ন রাখতে কোয়ার্টারসে এসেছে। বাড়িতে কোনো আনন্দ অনুষ্ঠান হলেই রাধার নেমন্তন্ন। সব বাড়িতেই রাধার কদর কত সুচারু দেবী তা স্বচক্ষে দেখে আসছেন। অংশুমান মুখে প্রকাশ করেন না, কিন্তু মেয়েটার ভারি সহজ চালচলন সাদাসাপটা কথাবার্তা তারও ভালোই লাগে। অবশ্য স্ত্রীর মতো নয়, তাঁর বিশ্বাসের আবেগ অন্যরকম।
তৃতীয়বার রাধা আসতে তার এমনি সাদাসাপটা কথা শুনে অংশুমান কিন্তু রেগেই গেছলেন।…তার তিন বছর হয়ে গেল এখানে, এবার কেবল বদলি নয়, মনে মনে প্রমোশনের আশা করছেন। এমএসসি ডিগ্রি আর চাকরির রেকর্ডের বিবেচনায় এটা দুরাশা কিছু নয়। তাছাড়া তিন থেকে চার বছরের মধ্যে বদলি তো তারা হয়েই থাকেন।
খাওয়া-দাওয়ার পর এটা-সেটা গল্প হচ্ছিল। অংশুমান সামনে বসে সেদিনের কাগজে চোখ বোলাচ্ছিলেন, কলকাতার ইংরেজী বাংলা কাগজদুটো বেশ দেরিতে আসে, সকালে প্রায়ই ভালো করে পড়া হয়ে ওঠে না।
