–কি গো বোনাইদাদা কি মনে করে?
হারাণ মণ্ডল আরো হকচকিয়ে গেল। খুব গম্ভীর বটে, কিন্তু শালীর গলা অনেকটা আগের মতোই নরম যেন। বিড়বিড় করে জবাব দিল, তোর খপর নিতে এলাম…রোজই তো আসি।
–কেন, বড় খবরটা তোমার কানে ঢোকেনি? লোকে কি বলছে শোনোনি?
আট বছরের বড় দিদিকে হারাণ মণ্ডল যখন বিয়ে করে নিয়ে যায়, এ-মেয়ের তখন ন’বছর মাত্র বয়েস। এখন যে চোখেই দেখুক, বড় আদরেরই তে। ছিল। রাগত মুখে বলে উঠল, যারা বলে তাদের জিভ খসি যাবে!
জবাব শুনে রাধা ভুরু কুঁচকে চেয়ে রইলো একট। ঠোঁটে হাসির আভাস।–হুঁ?..আচ্ছা খপর নিতে এয়েছে। যখন ভালো করেই নাও, ঘরে এসে বোসো।
হারাণ মণ্ডল বিস্ময়ে হাবুডুবু খেতে খেতে দাওয়ায় এসে উঠল, চপ্পল খুলে ভিতরেও ঢুকল। এই মেয়ে আগে তাকে কথায় কথায় নাকাল করে মজা পেত, মাঝে একটা বছর তার দিকে মুখ তুলেও তাকায়নি। রাধা আবার সেই পুরনো দিনে ফিরে এলে তার থেকে খুশি আর কে হবে?
রাধা মাটির মেঝেতে চাটাই পেতে দিল। বোসো বোনাই… খাবে কিছু?
এই ঘরেও হারাণ এক বছর বাদে ঢুকতে পেল। বসে জবাব দিল, আজ বেলায় খেয়ে বেরিয়েছি…কতদিন তো খিদের মুখে ফিরে যাই, খপরও নিস না
–আ-হা, রাধার যেন কাতর মুখ, তোমার খাবার জিনিস যে আমার ঘরে থাকে না, আজও নেই তবু ভালোবেসে জিগেস করে ফেললাম।
হারাণ মণ্ডল ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলো।
-বুঝতে পারছনি? বলি ভাং সিদ্ধির মাত্রা দিদির শোকে ক’গুণ বেড়েছে, দু’গুণ না চার গুণ?
হারাণ মণ্ডল আবারও হকচকিয়ে গেল, মাথা হেঁট একটু। বেচারার একলা ঘরে নেশা বলতে ভাঙে, নেশা। রাতে ওই নেশায় বুঁদ হয়ে পড়ে থাকে। মাত্রাও আগে থেকে ঢের বেড়েছে, তবে দু’গুণ কি চার গুণ বলতে পারবে না। এখন আবার শুধু ভাঙে হয় না, সঙ্গে এটা-ওটা মেশাতে হয়। কিন্তু রাধার মুখে হঠাৎ এসব কথা কেন! মুখ তুলে যা দেখল তা-ও যেন বিশ্বাস হয় না। রাধা তার দিকে চেয়ে টিপটিপ হাসছে।
-কি বলবি বল…
-বলব? শুনে আবার ভিরমি খাবে না তো? বিয়ের নামে তো জিভ দিয়ে টসটস করে জল গড়াতো, এখনো সে সাধ আছে গেছে?
সাহস করে হারাণ মণ্ডল গলা দিয়ে শব্দ পর্যন্ত বার করতে পারছে না।
রাধা একটু চেয়ে থেকে আবার বলল, সাধ যদি থাকে তো সোজা এখেন থেকে কপালী বাবার কাছে যাও, দিনক্ষণ ঠিক করে একেবারে বর সেজে এসো।
হারাণ মণ্ডলের হৃৎপিণ্ডটাই বুঝি বুক ঠেলে বেরিয়ে আসবে। বিশ্বাস করবে না করবে না? বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো। আমি বে করব…মানে তোকে?
রাধা ঝামটা দিয়ে উঠল, না আমাকে কেন–ওই বিলাসী বুড়ীকে!
এই লোককে ঘরে ঢুকতে দেখেবিলাসী সন্তর্পণে দাওযার দেয়ালের আড়ালে দাঁড়িয়ে কথা-বার্তা শুনছিল। হঠাৎ এই মুখ ঝামটা কানে আসতে দু’আঙুল জিভ কামড়ে ছুট লাগালো।
এ-দিকে আনন্দে দিশেহারা হারাণ মণ্ডলও ঘর ছেড়ে বেরুবার মুখে বাধা পড়ল।শোনো বোনাই!
নিশ্বাস বন্ধ করে হারাণ ঘুরে দাঁড়ালো। হাসি চাপার চেষ্টায় ডাগর দুই চোখ পাকিয়ে রাধা বলল, এখন পর্যন্ত বোনাই বলব না তো কি বলব?
বিগলিত হারাণ মণ্ডল জবাব দিল, তোর যা খুশি তাই বল
-ও-বাব্বা! তা শোনো আগে থাকতে বলে রাখি, বে’র পর আমি কারো ঘর করতি যেতে পারব নি, এখান থেকে ঠাঁই-নাড়াও হব না, তোমার যখন ইচ্ছে এখেনে যখন ইচ্ছে বিষ্টুপুরে থাকবে…কিন্তু আমাকে নিয়ে টানাটানি করলে বে ভেঙে দেব জেনে রাখো।
–ঠিক আছে ঠিক আছে। তোর ইচ্ছা মতোই সব হবে।
খেয়ালী মেয়ের আবার পাছে মত বদলায় সেই ভয়ে পড়িমরি করে সে কপালী বাবার ডেরার দিকে ছুটল।
.
এদিন একটু রাত করে কপালী বাবা রাধার খোঁজে এলেন। ওকে সামনে পেয়েই বললেন, কি রে পাগলী, দুই ডবল বয়সের বোনাইকে বেছে নিলি শেষ পর্যন্ত।
রাধা হেসেই জবাব দিল, ডবল হবে না, বছর তেরো-চোদ্দ বড় হবে। তা শিবের বয়সের কি আর গাছ পাথর আছে!…একদিক থেকে খুব মিল বুঝলে বাবা, ভাং খেয়ে ব্যোম হয়ে পড়ে থাকে।
দিন কয়েকের মধ্যে কপালী বাবা হারাণ মণ্ডল আর রাধাকে তার জংলি কালীর সামনে বসিয়ে তন্ত্রমতে বিয়ে দিয়ে দিলেন। তার জনাকয়েক চেলা কেবল এ-বিয়ের সাক্ষী থাকল। মা-কালীকে প্রণাম করে রাধা মনে মনে প্রার্থনা করল, কেউ না থাকলে নয় বুঝে এই একজনকেই নিলাম, কিন্তু দিদির ব্রত কোনো না যেন মা-গা, তার থেকে বরং আমি সন্তান চাই না।
রাধার বিয়ে আর সেটা কিনা ভগ্নিপতি হারাণ মণ্ডলের সঙ্গে। দু দিনের মধ্যে এখবর কেবল মাতন জয়নগর বা বিষ্টুপুর কেন, দূরে দূরেও ছড়িয়ে গেল। এমন ভক্তিমতী মেয়েটাকে ডাকাতে ধরে নিয়ে গেছল শুনে তারা কতটা বিষণ্ণ হয়েছিল, ক’দিনের মধ্যে তার বিয়ের খবর শুনে ততোটাই খুশি তারাও যেচে এসে শুভেচ্ছা জানিয়ে এটা-সেটা দিয়ে গেল। আর কাছের মানুষদে তো ভিড়ই পড়ে গেল। আবার ঠারেঠোরে এমন কথাও বাতাসে উড়ল যে, তিন তিনটে ডাকাতের পাল্লায় পড়েছিল, কোন্ বিপদ ঘটে সেই ভয়ে এমন তড়িঘড়ি বিয়ে এবং ভগ্নিপতিকে বিয়ে কিন্তু বিশিষ্টজনদের আনাগোনার ফলে এই কুৎসা তেমন সোচ্চার হয়ে উঠতে পারেনি। কালীভক্ত দোতারবাবু এসে একশ এক টাকা দিয়ে আশীর্বাদ করে গেছেন, রুমা সেন আর বিন্দুবাসিনী দেবী রাধাকে একখানা করে গয়না দিয়ে গেছেন। সঙ্গে একজনের ভাগ্নে অন্যজনের ছেলে ছিল। –হ্যাঁ, মন বিষিয়ে ছিল বলে রাধারই চোখের দোষ হয়ে ছিল। এই দুজনের চোখে এখন আর লোভের ছোবল দেখছে না-ও সি অংশুমান ঘোষের স্ত্রী খুব সুন্দর একখানা শাড়ি দিয়েছেন। রাধা বলেই এ ধরনের বিয়ের পরেও তার প্রাপ্তি যোগ খুব কম হল না।
