কপালী বাবা বিয়ের কথা তুলতে তাকে অবাক করে রাধা ঠাণ্ডা মুখে সায় দিল, হ্যাঁ, বিয়ে এবারে একটা করব।
স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন কপালী বাবা। যাক, নিশ্চিন্ত করলি। …তা কাকে বিয়ে করবি ভেবেছিস?
-ভাবিনি। ভাবছি
–মনোহরকে তোর সঙ্গে দেখা করতে বলব?
রাধা ভ্রূকুটি করে উঠল, তোমাকে কারো হয়ে ওকালতি করতে হবে না।
এ-সব কথায় বিলাসীর কান সর্বদা খাড়া। মেয়ের এই ভ্রুকুটি একবারও আসল রাগ মনে হল না। সে ওই দুপুরেই প্রথমে পাড়ার সমবয়সী অন্তরঙ্গ কয়েকটি রমণীর কাছে খুব গোপনে খবরটা ফাস করল। তাদের মধ্যে একজনের গলা পর্যন্ত ধারে বিকিয়ে আছে নিতাই স্যাকরার কাছে। নিতাইয়ের দুর্বলতা তার তত অজানা নেই, সে তার দৃত হয়ে কতসময়ে পাকে প্রকারে বাধার মন বুঝতে চেষ্টা করেছে। সে তড়িঘড়ি ছুটল নিতাই স্যাকরার দোকানে। এদিকে মনোহরকে ফাঁক মতো খবরটা বিলাসীই দিয়ে এসেছে। এ-ও বলেছে রাধার তাকেই পছন্দ মনে হয়। এটুকু মেহনতের সুফল দুটি টাকা হাতেনাতে পেয়েছে।
পরদিন দুপুরেই নিতাই এসে হাজির। এসময় ছাড়া রাধাকে আর নিরিবিলিতে কখন পাবে, সকাল-সন্ধ্যা তো ওই বাবাটি এখানে ঠাঁই গেড়ে বসে থাকেন। রাধার বোনাইয়ের বন্ধু হিসেবে আগে তো এখানে হামেশাই আসত, আর রাধার বাপ বেঁচে থাকতে একই উদ্দেশে তাকেও তোয়াজ তোষামোদ করতে আসত।
উঠোনে দাঁড়িয়ে বার দুই গলা খাকারি দিল, তারপর গলা যতটা সম্ভব নরম করে দু’বার বিলাসী-বিলাসী বলে ডাকল।
দরজা খুলে গেল। রাধার পিঠের ওপর চুলের বোঝা ছড়ানো। গম্ভীর মুখে স্থির চোখে সোজা তাকাতে গলায় মধু ঢেলে বলল, এক বারটি তোর কাছে না আসি পারলাম না–
-সে-তো দেখতে পাচ্ছি। কেন?
–ইয়ে এত ধকল গেল তোর ওপর দে..
–আমার ওপর দে কি ধকল গেল? রাধার গলার স্বর ঈষৎ তীক্ষ্ম।
নিতাই বলল, উ কথা ছাড়, কোনো শালার কথায় আমি কান পাতি না–আমার কথা হল এবার তুই আমার ঘরে আয়, আমি তোকে মাথায় করে রাখব।
রাধা চেয়ে রইলো একটু।–গয়না-টয়না গড়িয়ে রেখেছ?
নিতাই ভেবাচাকা খেয়ে গেল। ইয়ে, মানে তোর জন্যি গয়না?
-হ্যাঁ, গড়িয়ে রাখাই ভালো, দু’বছর মাত্র অপিক্ষে করছ, আর ছের দশেকের মধ্যে তোমার গলাতেই মালা দিতে ইচ্ছে হবে কিনা কে জানে। তার মুখের ওপর দরজা দুটো বন্ধ করে দিল।
সন্ধ্যায় মনোহর পাইক কপালী বাবার ডেরা হয়ে এখানে হাজির। কপালী ববাই বলে দিয়েছেন নিজে গিয়ে রাধার মন বুঝে নেগে যা, আমি আর তাহলে এখন যাচ্ছি না।
এসেই বলল, কপালী বাবা আসতি বললেন-এলাম।
রাধা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ঠাণ্ডা মুখে জিগ্যেস করল, কেন আসতি বললেন?
–একটু বসতে দিবি না দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা হবে?
রাধা ভিতরে চলে গেল। এক হাতে চাটাই অন্য হাতে লণ্ঠনটা নিয়ে বেরুলল। দাওয়ায় চাটাই পেতে লণ্ঠনটা সামনে রেখে নিজে আবার দরজা ঘেঁষে দাঁড়ালো।
মনোহর গ্যাঁট হয়ে বসল। কপালী বাবা তোর মন বুঝে নেবার জন্য আসতি বললেন।
একটু চুপ করে থেকে রাধা জিজ্ঞেস করল, মনের কী বোঝার জন্যি?
যতটা সম্ভব সমর্পণের সুরে মনোহর জবাব দিল, তোর বে-তে মত হয়েছে, এখনো তুই আমাকে বাতিল করবি কিনা সেটুকু বোঝার জন্যি।
রাধা আবার চুপ খানিক। আমাকে কুজিঘরে টেনে নে গিয়ে তিন ডাকাত বে-ইজ্জৎ করেছে সে-কথা শোনোনি?
মনোহর এবার দরাজ গলায় জবাব দিল, তিন ছেড়ে পাঁচ হলেও আমি কেয়ার করি না, ডাকাতের অত্যাচার তুই সেধে নেতে গেছিস, এ-জন্যিই তো আগের থেকেও তোর ওপর আমার বেশি দরদ, বেশি টান।
এবারে রাধার গলার সুর রুদ্ধ একটু।–ও, লোকে যা বলে বেড়াচ্ছে তুমি তা বিশ্বাস করেছ, তার পরেও টান দেখাতি এয়েছ?
চতুর মনোহর তক্ষুনি বুঝে নিয়েছে সে কোন ফঁদে পড়ল। তাড়াতাড়ি সামাল দিতে চেষ্টা কবল, যারা অমন কথা বলে তারা হারামীর বাচ্চা বুঝলি? এ-কথা যারা বলে আমার ও-কথাগুলো তাদের মুখের ওপর জবাব–নইলে গঙ্গা জলে দাঁড়িয়ে হলপ করলেও কি তাদের বোঝানো যাবে–নইলে তোর তেজ আমি জানি না… এক হাজার লাল পিঁপড়ে দিয়ে খাইয়ে আমাকে মারতে বসেছিলি? তোর কথা বিশ্বাস না করা আর মা-কালীর কথা বিশ্বাস না করা তো সমান কথা।
রাধা চেয়ে আছে। ঠোঁটের ফাঁকে একটু একটু হাসির ফাটল ধরছে।–ঠিক আছে এখন ঘরে যাও, পরে আমার মনের কথা বাবার কাছেই জেনে নিও।
.
রাধার ভগ্নিপতি সকালে দুপুরে বা বিকেলে যখনই হোক রোজই একবার করে শ্যালিকার খবর নিতে আসে। বিষ্টুপুরের আগের স্টেশন জয়নগর ট্রেনে কয়েক মিনিটের পথ। আর স্টেশন থেকে এক দেড় ক্রোশ হেঁটে আসা কিছুই না। কপালী বাবা তাকে রাধার সামনেই ডেকে বলেছিলেন, আপনার জন বলতে তো একমাত্র তুমি, যেটুকু পারো খবর টবর নিও।
তা হারাণ মণ্ডল নোজই এই কর্তব্য করতে আসে। রাধার সঙ্গে এ ক’দিনের মধ্যে একটা কথাও হয়নি। উঠোনে দাঁড়িয়ে দেখে রাধা চুপচাপ ঘরে বসে আছে। না ডাকলে ঘরে ঢোকার সাহস নেই, দাওয়ায় বা উঠোনের পিছন দিকে চালা ঘরে বসে বিশ্রাম করে খানিক। বিলাসীর কাছ থেকে খবর নেয়। তারপর চলে যায়।
সেদিন (অর্থাৎ মনোহর পাইক বড় রকমের আশা নিয়ে চলে যাবার পরদিন ) বিকেলে হারাণ উঠোনে পা দিয়েই ধমকে দাঁড়ালো। আজ ঘরে নয়, রাধা দরজার বাইরে দাওয়ায় দাডিযে। তাকে দেখে অপলক দুই চোখ মুখের ওপর আটকে রইলো।
