বিন্দুবাসিনী দেবী ভাবে বিভোর গান শুনে একদিন ছলছল চোখে বলেছিলেন, গোপালেব আমার এতদিনে মান ভাঙল, তুইই বোধ হয় কোনো জন্মে রাধা ছিলি।
আর রুমা সেন বলেছিলেন, বিভোর হয়ে গান করিস যখন তোকেই যে আমার রাধা মনে হয় রে!
তা হেসে হেসে দু’জনকে একই জবাব দিয়েছিল রাধা শ্ৰীমতী রাধা তো কাঞ্চনবর্ণ রূপসী ছেলেন গো, আমি তো কালো!
বিন্দুবাসিনী মনের খেদে খেঁকিয়ে উঠেছিলেন, তোব মতো রূপ পেলে এ-কালের দেমাকী রূপসী রাধার বর্তে যেত বুঝলি? কটাক্ষ তিন বউয়ের উদ্দেশে। তারা সকলেই বেশ ফসা আর সুশ্রী।
আর রুমা সেন খানিক ওর মুখের দিকে চেয়ে থেকে বলেছিলেন, তোর কত রূপ যদি জানতিস থাক না জানাই ভালো।
রূপের এই বিশেষত্বটুকুই রাধা ঠিক-ঠিক ধরে উঠতে পারে না। …তবে, একটু কিছু আছেই জানে, যা দেখে আদেখলে পুরুষগুলোর লোভী চোখ অন্যকে ছেড়ে আগে ওর দিকেই ছোটে।
.
কিন্তু যে-বিশ্বাস তার আসল পুঁজি, যার জোরে ও নিঃশঙ্ক চিত্তে সর্বত্র ঘুরে বেড়াতে পারত, এমন একটা ঘটনার ফলে সেই বিশ্বাস আর জোরের ওপর বড় রকমের একটা ধাক্কা পড়েছে। …হ্যাংলা লোভীর দল চারদিকে তো আছেই জানে, কিন্তু ওর অনিচ্ছায় কেউ ওর একটা কেশও স্পর্শ করতে পারবে না এ-ধারণা একেবারে বদ্ধমূল হয়ে গেছল। যে রক্ষা করার সে তাকে রক্ষা করেই যাবে। কিন্তু এবারে কি হল, দু’দুটো ডাকাত ওকে জাপটে মাপটে ধরল, একজন নোঙরা গামছা দিয়ে ওর মুখ বেঁধে ফেলল, তারপর এক-একবার এক একজন ছানাছানি করে ওকে কাঁধে তুলে নিয়ে গেছে, ছাড়াতে চেষ্টা করলেই পিছনে কিল-চড় পড়েছে।…মা শেষ পর্যন্ত ওকে রক্ষা করল বটে, কিন্তু সে-জন্য এক বুড়ীকে প্রাণ পর্যন্ত দিতে হল।
রাধা এই চিন্তা নিয়েই পাগলের মতো ছটফট করে কাটালো কটা দিন। তার এই জোর আর এই বিশ্বাস গেলে আর থাকল কি? যায়নি বটে, কিন্তু বড় রকমের নাড়া তো খেয়েছে। মায়ের কি ইচ্ছে, এমন শাস্তি দিয়ে মা ওকে কি বোঝাতে চায়।
এমন একটা ঘটনা চারিদিকে রটে যেতে সময় লাগল না। যাকে নিয়ে এই ঘটনা তার নাম রাধা-পাঁচ দশ ক্রোশের মধ্যে তাকে না চেনে কে? আর যে বুড়ী ওকে উদ্ধার করতে গিয়ে জেবন দিল সে হল গিয়ে লক্ষ্মীকান্তপুরের ছিনাথ (শ্ৰীনাথ) পোদ্দারের লোক–ওই একটি জোতদারকেই বা গোটা অঞ্চলের মধ্যে না চেনে কে? কিন্তু এ রটনা লোকের মুখে মুখে রসালো হয়ে ছড়াতে লাগল। একটা থুথুড়ি বুড়ী রাধাকে তিন ডাকাতের হাত থেকে উদ্ধার করে প্রাণ দিয়েছে এ কি একটা বিশ্বাসযোগ্য কথা? ফুর্তির সময় ঝামেলা বরদাস্ত করতে পারেনি বলেই ডাকাতরা বুড়ীকে মেরে চাষের জমির ধারে ফেলে রেখেছে এ বরং সম্ভবের মধ্যে পড়ে। এমনও হতে পারে ডাকাতদের মধ্যে বুড়ীর কেউ চেনা লোক বেরিয়ে পড়েছে, তাই আগে থাকতে তাকে মেরে তারা নিশ্চিন্ত হয়েছে। বুড়ীকে মারার ব্যাপারটা রাধাও দেখে থাকবে, বুড়ীর দেহ সনাক্ত হবেই জেনে ডাকাতদের হাত থেকে ছাড়া পেয়ে রাধা থানায় এসে নিজের উদ্ধার পাওয়ার গল্প কেঁদেছে।
মাতনের কিছু লোক ছাড়া কেউ এ গুজবে মন থেকে বিশ্বাস করতে চায়নি অন্তত। কিন্তু এসব রটনা ছোঁয়াচে ব্যাধির মতো একটু নাড়াচাড়া দিয়েই যায়। প্রতিবেশিনীদেরই কেউ কেউ নিজেরাই এসে রাধার কানে কথাটা তুলেছে, বিলাসীও বলেছে। ড্যাকরারা সব এই-এই বলছে, মুখে আগুন সব।
সাত দিনের মধ্যে রাধা আর ঘর ছেড়ে নড়েনি। তাই নিয়েও কথা, দেহের কি হাল হয়েছে কে জানে, বেনোর শক্তি থাকলে তো। কোন্ মাস্তান নাকি বিজন ডাক্তারকে একটু বেশি রাতে রাখার ঘর থেকে বেরুতে স্বচক্ষে দেখেছে। …চিকিৎসার দরকার হয়েছে নিশ্চয়। তাকে কপালী বাবার সঙ্গেও কথা বলতে দেখেছে। দেখাটা মিথ্যে না হতে পারে, কাবণ, দু’দিন বাদেই অংশুমানের স্ত্রী জিপে ডাক্তার চৌধুরীর স্ত্রীকে তুলে নিয়ে তার ডেরায় এসে দেখে গেছেন। রাধা সারাক্ষণই গুম হয়ে বসেছিল, পাঁচটা কথাও বলেনি। স্ত্রীর মুখে এ কথা শুনে পরদিন রাতের দিকে একটু ফুরসৎ পেয়ে ডাঃ চৌধুরীও রাধাকে দেখতে এসেছিলেন। তাঁর ভয় হয়েছিল বড় রকমের মানসিক আঘাতটাঘাত পেল কিনা। কপালী বাবা সকাল সন্ধ্যায় অনেকটা ময়ই এখন এখানে কাটিয়ে যান। তার সঙ্গেও ডাক্তারের দেখা হয়েছে। রাধা ভালো আছে দেখে তিনি উঠোনে দাঁড়িয়ে রাখার সম্পর্কেই কিছু কথাবার্তা বলেছেন। তাঁর এবং তার স্ত্রীর মত, চেষ্টা চরিত্র করে এখন রাধার একটা বিয়ে দেওয়া উচিত।
আগে-পরে রাধাকে দেখতে অনেকেই এসেছেন। কালীভক্ত দোতারাবাবু এসেছেন, ভাগ্নে অজয় গুপ্তকে নিয়ে রুমা সেন এসেছেন, ছোট ছেলে নিখিল রায়কে নিয়ে বিষ্টুপুরের বিন্দুবাসিনী দেবী এসেছেন। আশ্চর্য, কতগুলো ব্যাপারে মানুষের ভাবনা চিন্তা একই রকমের হয়। তারা প্রত্যেকেই একই মত ব্যক্ত করে গেছেন–রাধার এবারে একটা বিয়ে হওয়া উচিত। আর সেটা সব থেকে বেশি মনে হয়েছে কপালী বাবারও।
নিজের সেই বিশ্বাস আর জোরের ওপর নাড়া পড়তে রাধার দৃষ্টিও যেন অন্যরকম হয়ে গেছে। …মামী আর মায়ের সুবাদে অজয় গুপ্ত আর নিখিল রায়ও তাকে পছন্দ করত, রাধাও তাদের ভদ্র ভালো মানুষই ভাবত। বেশি রাতেও কতদিন এক-একজন ওকে ডেরায় পৌঁছে দিয়েছে, রাধা সাইকেল-রিকশয় এসেছে, তার কেউ না কেউ পাশে পাশে সাইকেলে। কিন্তু এবার তারাও যখন মা বা মামীর সঙ্গে এসেছে, তাদের চোখেও রাধা যেন লোভ উঁকিঝুঁকি দিতে দেখেছে। এ কি হল রাধা, বিশ্বাস কি এরপর তাহলে ও আর কাউকেই করতে পারবে না?
