এই আপোস রাধারও কাম্য ছিল। খুশি হয়েই মাথা নেড়েছে।
…এমনি করেই রাধার মনে ডাক দেয়। রাধা থমকায় বটে। কিন্তু তার পরেই রোখ চাপে। পরীক্ষা ভাবে। যে ডাক দেওয়ায়, ওকে রক্ষা করার দায়ও তারই ভাবে! রক্ষা যে করেই থাকে তাতে কি কোনো ভুল আছে? …সেদিন বিবিষয়ের স্থান থেকে জঙ্গলের পথে পা দিতেই ভিতরের কেউ নিষেধ করেছিল। যাসনি, বিপদ হবে। রাধার সেই একই রোখ চেপেছিল। …কিন্তু তিন-তিনটে ডাকাতের হাত থেকে উদ্ধার তো আশ্চর্যভাবে পেল! যে রক্ষা করার সে রক্ষা না করে পারল?
৫. চৌদ্দ পনেরো বছরের রাধা
কিন্তু সেদিনের চৌদ্দ পনেরো বছরের রাধার সঙ্গে আজকের উনিশ যাই-যাই রাধার অনেক–অনেক তফাৎ। বাবা মারা যাবার পর থেকে নিজের ভিতরের এক স্থির বিশ্বাসের জোরে সে দাঁড়িয়ে আছে। অভাব অনটনের মুখ দেখেনি। বরং স্বাচ্ছল্য যেচে এসেছে, আসছে। বাবার কথা থেকেছে আবার কালীর স্বপ্ন দেখে মনের সেই রোখও সফল হয়েছে। পেট চালানোর জন্যে তাকে পথে-পথে গান গেয়ে বেড়াতে হয়নি, অথচ এই গান গেয়েই অনায়াসে তার দিন চলে যাচ্ছে। বাবা সেই কথার পর এক বছরের মধ্যে মেয়ের গান আর গলার উন্নতি দেখে অবাক হয়েছিল। তারপর জিগ্যেস করেছিল, এসব গান তুই এভাবে গাইতে শিখলি কি করে? রাধার ইচ্ছে করছিল জবাব দেয়, মা-কালী শিখিয়েছে–তার মস্করার জবাব দেবে পণ করেছিল বলেই শেখা হচ্ছে। কিন্তু তা তো আর বলা যায় না। বলেছিল কালীর গান কপালী বাবার কাছে, কারবালার মাতনের গান মাজারের ফকির সাহেবের কাছে আর বিৰিমায়ের দু’তিনটে গান শফিদার মায়ের কাছে শিখেছে। এরা কে কেমন গায় রাধার বাবার জানা আছে, তার মনে হয়েছে মেয়ের আসল গুরু তার ভাব আর আবেগ। এ দুটোর সঙ্গে মিষ্টি মাজা গলা তো আছেই। এরপর মৃত্যুর আগে পর্যন্ত অর্থাৎ প্রায় চার বছর বাবাই সন্ধ্যায় বা রাতে ওকে ডেকে গান নিয়ে বসেছে। কেবল কালীর গান নয়, গোপাল রাধা-কৃষ্ণের গান, এমন কি শিবের গানও। রাধা বুঝেছে পয়সা রোজগার বেশি হয় না বলেই বাবার গলায় এসব গান বেশি শোনেনি। কিন্তু ওর বেলায় এ-সব গানেও রোজগার কম হচ্ছে না। ও অবশ্য রোজগারের দিকটা মোটে ভাবেই না। কিন্তু টাকা এলে কি করবে? আর বাবা মারা যাবার পরে নিজের ভাবেও তো কত মনগড়া গান গেয়ে ফেলে। গাঁয়ের স্কুলের তিন ‘কেলাস’ পড়া তো বিদ্যে, কিন্তু গান ওর মন থেকে উঠে আসে। আবার ভুলেও যায়।
এখন তো কাছে দূরে কত জায়গা থেকে ডাক আসে তার। অবশ্য হাল ফ্যাশনের গানের আসরে নয়। কত বড় লোক মধ্যবিত্ত লোক তাদের ঘরোয়া ঠাকুরের পূজা উৎসব উপলক্ষে ভক্তির গানের আসর বসায়। রাধাকে তারা যেচে এসে ডেকে নিয়ে যায়। এখন বহুজনের কাছে তার খাতির কদর। লক্ষ্মীকান্তপুর, বিষ্টুপুর, জয়নগর, ধপধপি –ভাক এলে কোথায় না গিয়ে পারে? এই বয়সেই বার দুই তিন কলকাতায় গিয়ে পুজো-পার্বণের ঘরোয়া আসরে গেয়ে এসেছে। এ দিকের চেনা-জানা লোকেরাই তাদের কলকাতায় আত্মীয়দের ওই সব আসরে সাদরে নিয়ে যায়।
..এসবের এক কণাও কি ওর নিজের শক্তি নিজের জোরে হয়েছে। ছাই। মস্করা করে স্বপ্ন দেখিয়ে যে ওকে গানে নামিয়েছিল সব তার শক্তি, তার জোর। গান নয়, এই শক্তির মহিমা নিজের সত্তা দিয়ে অনুভব করে, বিশ্বাস করে। …সাধারণ লোক নয়, গানের দৌলতে এ-ভাবে এগোনর ফলে অনেক বড় ঘর শিক্ষিত ঘরের ছেলেদের চোখে লোভ দেখেছে, আসরে আলাপের ফাঁক খুঁজে কাছে ঘেষার চেষ্টা দেখেছে। যার জোর আর বিশ্বাসের ওপর সে দাঁড়িয়ে, রাগের বদলে হাসিই পায়। ঘরে ফিরে আয়নায় দাঁড়িয়ে অনেক সময় সকৌতুকে নিজেকে দ্যাখে। লম্বা স্বাস্থ্য-টাস্থ্য এ নিজেও স্বীকার করে, আর ছেলেবেলা থেকে পাঁচ জনের মুখে নিজের ডাগর চোখ দুটোর প্রশংসা শুনে এ-ও মেনেই নিয়েছে চোখ দুটো সুন্দরই, কিন্তু কালো তো, আর এমন আহামরি মুখও কিছু নয়, তবু আসরের রূপসীদের ছেড়ে হ্যাংলা ছোঁড়াগুলো ওকে গিলে খেতে চায় কেন? আর ঠিক এই চিন্তা করতে গিয়ে বিষ্টুপুরের রায় বাড়ির গৃহিণী বিন্দুবাসিনী দেবী আর জয়নগরের সেন বাড়ির রুমা সেনের কথা মনে পড়ে যায়। ওঁরা দু’জনেই গোপাল ভক্ত। নিয়মিত বিগ্রহ পূজা হয়। রুমা সেন মস্ত লোকের ঘরণী ছিলেন, নিঃসন্তান, বিধবা হবার পর থেকে দেশের অর্থাৎ জয়নগরের বাড়িতে ভাগ্নেকে নিয়ে থাকেন। ভাগ্নে অজয় গুপ্তর বছর বাইশ বয়েস, জয়নগর থেকে কলকাতায় যাতায়াত করে কী পড়াশুনা করে নাকি। আরবিন্দুবাসিনীও বড়লোকের বাড়ির গিন্নি, চার ছেলের মা। স্বামী আর বড় তিন ছেলে কেবল টাকার পিছনে ছুটছে, ছোট ছেলেটা ভদ্র কিন্তু অলস গোছের, সে-ই কেবল সর্বদা মায়ের কাছে থাকে, কিছুই করে না। কিন্তু বড় তিন ছেলের বউ নিয়ে বিন্দুবাসিনী দেবীর মনে অশান্তি, কারো সঙ্গে কারো মিলমিশ নেই, স্বামী ছেলেরা বা বউরা কেউ গোপালকে মোটে ভক্তিশ্রদ্ধা করে না, যেমন-তেমন করে কেবল দায়সারা কর্তব্য করে। এই দুঃখেই বিন্দুবাসিনী এখন পর্যন্ত ছোট ছেলের বিয়ের নাম করেন না। তার ধারণা, তার গোপাল মাঝে মাঝে রাগ অভিমান করে, মান করে, আর তখনই রাধার ডাক পড়ে। রাধা গান গেয়ে গোপালের মান ভাঙাতে যায়। আর রুমা সেনের বাড়িতেও গোপালের নামে বাধার ডাক পড়েই। ওই দু’বাড়ি থেকেই বছরে দু’জোড়া দু’জোড়া চার জোড়া শাড়ি রাধার বাঁধা প্রাপ্য। তাছাড়া প্রতি মাসেই নিতে না চাইলেও তারা ওর বটুয়ায় বিশ পঁচিশ টাকা করে গুঁজে দেবেনই। শাড়ি টাকা এমন আরো কতজনই দেয়। সে-কথা নয়। এই দু’জনেই একই রকমের আবেগের কথা ওকে শুনিয়েছিলেন।
