মনোহর সঙ্গ নিয়ে ঘন জঙ্গলের দিকে চলছে। এরই মধ্যে ও প্রথমে একটা হাতের ওপর দখল নিয়েছে, তারপর সেই হাত ওর পিঠে বেষ্টন করে কাঁধে উঠেছে। হেসে বলেছে, জঙ্গলের মধ্যে হোঁচট মাচট খাবি, আমার সঙ্গে পা ফেলে সাবধানে চল। এটুকু বলার ফাঁকে কাঁধের ওপর চাপ বেড়েছে, মুখটা গালে ঠেকেছে। রাধা ঘাড় ফিরিয়ে যেটুকু দেখে নেবার দেখেছে, বুঝে নেবার বুঝেছে। চোখে মুখে লোভ আর মতলব ঠিকরে পড়ছে।…এ ছেলের সঙ্গে গায়ের জোরে পারবে না, উল্টে মাথায় খুন চাপবে হয়তো। ভুল হচ্ছে না, তবু একটু যাচাই করে নেওয়া দরকার, মা-কালীর নামে দিবি করেছিল। ঠোঁটে চেষ্টা করে একটু হাসি টেনে আনল, একবার দু’বার টেরিয়ে তাকালো, বেশ হালকা গলায় বলল, আর যদি যেতে না চাই, ঘরে ফিরে যেতে চাই?
দাঁড়িয়ে গেল। কাঁধটা আরো জোরে চেপে ধরল, দাতে দাঁত চেপে বলল, তাহলে তোর দু’গালে প্রথমে ঠাস ঠাস করে এমন চড় মারব যে চোখে আন্ধার দেখবি, তারপর তোকে এমনি করে বুকের সঙ্গে পিষে মারব! তুই আমাকে অনেক ভুগিয়েছিস
বলেই নিজের বুকের সঙ্গে সজোরে চেপে ধরল, চোখ দুটো কুর লোলুপ।
রাধা এবারে একটু বেশিই হাসছে, সেটুকুই এই ছেলের অবাক হবার মতো যথেষ্ট। কথা শুনে আরো যেন হতবাক।
ছাড়ো, আর বীরত্ব ফলাতে হবে না, তোমার মতলব আমি কামরাঙা খেতে নিয়ে যাবার কথা শুনেই বুঝেছি…আরো ভিতরের দিকে চলল, কে কোথায় এসে পড়বে
এযে এখন সৌভাগ্যের দিন মনোহর কি কল্পনাও করতে পেরেছিল। আজ একটা হেনেস্ত করার জন্য তৈরি হয়েই বেরিয়েছিল, এমন হামলাই করবে যে ওকে বিয়ে করতে এ মেয়েকে রাজি হতেই হবে। কিন্তু বাধাও যে তলায় তলায় ওকে মন দিয়ে বসে আছে জানবে কি করে? ছেড়ে দিয়ে আনন্দে আটখানা হয়ে আবার তার কাঁধ জড়িয়ে ধরল, আর হাসি-হাসি মুখে রাধাও এক হাতে ওর পিঠ বেষ্টন করে এগিয়ে চলল। পায়ের দিকে চোখ। এদিকের জঙ্গলের সবকিছু ওর চোখের দর্পণে। হাসি-ছোঁয়া চোখ তুলে এক-একবার তাকাচ্ছে, আবার মাথা নামিয়ে চারদিকে দ্রুত চোখ চালাচ্ছে।
-এখানেই বসি আয়, কেউ দেখবে না।
–আঃ এসো না!
জোর করেই টেনে নিয়ে চলল। মনোহর হাওয়ায় ভেসে জড়াজড়ি করে চলেছে। রাধা আচমকা এক জায়গায় দাঁড়িয়ে গেল, মনোহরকে ঠেলে খানিকটা সরিয়ে নিজের দিকে ফেরালো। হাসছে অল্প-অল্প, দু’হাতে তার গলা জড়িয়ে ধরে ঝুলেই পড়ল প্রায়, বোসো, বসে পড়ো–আর না।
গলায় আর বুকে ওজনের ভারেই মনোহর ধপাস করে বসে পড়ল, রাধা বলতে গেলে প্রায় তার কোলের ওপর, সোহাগ করেই যেন তাকে ধাক্কা মেরে মাটিতে শুইয়ে দিল, তারপর তেমনি হাসি-হাসি মুখে কয়েক পলক চেপে ধরে থাকল, রাধার সমস্ত দেহই প্রায় ওর উরু আর বুকের ওপর। তারপরেই ছিটকে নেমে এলো।
সঙ্গে সঙ্গে গেছি–গেছি–মরে গেলাম মরে গেলাম! বলে বিকট আর্তনাদ! কিন্তু রাধার কানেই এলো শুধু, দেখার জন্য সে আর দাঁড়িয়ে নেই। জঙ্গলের পথ ধরে হরিণীর মতো ছটছে। …শয়তান এখন কোন যন্তন্নায় দাপাদাপি করছে, সব্ব অঙ্গ জ্বলে যাচ্ছে খুব ভালো করেই জানে। …গলায় ঝুলে পড়ে মস্ত একটা লাল পিঁপড়ের ঢিপির ওপর ওকে ঝপাং করে বসিয়েছে তারপর বুকের আর শরীরের ওপর চেপে বসে আদর করে শুইয়ে দিয়ে এসেছে। বড় বড় লাল পিঁপড়ে, একটা কামড়ালে অঙ্গ জ্বলে যায়, কম করে কয়েক শ’ কামড়াচ্ছে। জ্বলুক, জ্বলুক, সব অঙ্গ জ্বলে যাক, পাজী ইতর কোথাকার!
এরপর রাধা কেন, পনেরো বিশ দিনের মধ্যেও বাইরের কেউ মনোহরের মুখ দেখেনি। ওদের এক পড়শিনীর মুখ থেকে রাধা জেনেছে, মনোহরের মা নাকি ছেলের দুর্দশা দেখে কপাল চাপড়ে কেঁদেছে, কোন্ গাছ থেকে সে একটা লাল পিঁপড়ের ঢিপির ওপর পড়ে গেছল, শ’য়ে শ’য়ে পিঁপড়ের কামড়ে সব-অঙ্গ ফুলে ঢোল, বিজন ডাক্তারকে বাড়িতে ডেকে এনে চিকিৎসা করাতে হয়েছে, সুঁই নিতে হয়েছে। মরেই যায়নি রক্ষা।
এতটা শুনে অবশ্য রাধার একটু খারাপ লেগেছিল। কিন্তু ওর কি দোষ, দশ বিশটা পিঁপড়ে কামড়ালে ওই রাক্ষসের কাছ থেকে সেদিন ছাড়া পেত!
সুস্থ হবার পরে এক দুপুরে মনোহর এসেছে। তাকে আসতে দেখেই রাধা দরজা বন্ধ করে বসেছিল। মনোহর গলা উঁচিয়ে ফের মা-কালীর দিবি কেটে শাসিয়ে গেছে, এর প্রতিশোধ সে নেবে–এমন প্রতিশোধ যা জীবনে ভুলতে পারবে না।
জবাবে ঘরে বসে বাধা জিভ ভেঙিয়েছে।
কিন্তু এরপর কিছু দিন সত্যিই ও ছায়ার মতো পিছনে ঘুরেছে। আর সুযোগ খুঁজেছে। বাবা ভাইকে নিয়ে বেরিয়ে গেলে রাধা একলা আর টহল দিতে বেরুতে পারে না। মাজারে যাওয়া বন্ধ, বিবিমায়ের থানে যাওয়া বন্ধ। পিছনের পুকুর ধারের জংলা পথে কেবল কপালী বাবার কাছে যেতে পারে। নিরুপায় হয়ে রাধা তার কাছেই সমস্যার কথাটা বলল। ঘটনা শুনে বাবার সে কি হাসি। পিঠ চাপড়ে বলেছেন, ঠিক করেছিস, আমি দেখছি।
তারপর একদিন শ্মশানের রাস্তায় ওকে দেখে কপালী বাবা ত্রিশূল হাতে এমন তেড়ে গেছলেন যে মনোহরের হৃৎকম্প। কোন রকমে পালিয়ে বেঁচেছে। তারপরেও ওর এক বন্ধুর মারফৎ কপালী বাবা শাসিয়ে দিয়েছেন, রাধার গায়ে একটা আঁচড় পড়লে উনি তাকে চিবিয়ে খাবেন।
ছেলে এরপর সমঝেছে। বাড়িতে এসে রাধার কাছে ক্ষমা চেয়েছে। বলেছে, আমি খুব অন্যায় করেছিলাম, কিন্তু তার জন্য তুই তো আমাকে প্রায় মেরেই ফেলেছিলি। রাগের মাথায় অমন দিব্বি কেটেছি, দিব্বি তুলে নিচ্ছি, তুই আমাকে ক্ষমা করে দে।
