শাড়িটা গাছ-কোমর করে নামতে যাবে ওমনি ভিতর থেকে কেউ যেন সাবধান করল, যাসনি, বিপদ হবে। রাধা মুহূর্তের জন্য থমকালো। তারপরেই মনে হল মা-কালীকে দেবে ভেবেছে, তাই তাঁরই কৌতুক-মাখা নিষেধ এটা। রাধা জলে ঝাঁপিয়ে পড়ল। শ্যাওলা আর আগাছা ঠেলে অনেক কষ্টে পৌঁছুল, ফুলটাও তুলল। তারপরেই চিওির কাণ্ড। কাপড়ে টান, আগাছা বা কিছুর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। যত ছাড়াতে চেষ্টা করে শাড়িটা খুলে পায়ে আরো বেশি জড়িয়ে যাচ্ছে। ওই নোঙর। জল খেতে খেতে রাধা চোখে অন্ধকার দেখল। সামনে মৃত্যু, আর বুঝি উদ্ধার নেই। জল যে খুব বেশি তা নয়, কিন্তু ডুব-জলের অনেক বেশি। শেষে অনেক কষ্টে যদি বা ছাড়া পেল বাকি জলটুকু আর সঁতরে আসতে পারে না, দু’পায়ে শাড়ি এমনি জড়িয়ে গেছে। প্রাণের আশা ছেড়ে দিয়েই চেষ্টা করছে, আর মা-কালীকে ডেকে চলেছে। হঠাৎ পায়ের নিচে মাটি। কোনরকমে রাধা পাড়ে উঠল, ফুলটা কিন্তু তখনো হাতে ধরা। চিৎপাত হয়ে শুয়ে পড়ল, আপনা থেকেই অনেকটা বমি হয়ে গেল। প্রায় ঘণ্টাখানেক বাদে সেই ফুল নিয়ে ধুঁকতে ধুঁকতে ঘরে ফিরল। বিকেলে সেই পদ্ম মায়ের পায়ে পৌঁছুল, কিন্তু কালীকে ধমকও কম খেতে হল না, রাক্ষসী ফুলের লোভ দেখিয়ে টেনে নিয়ে গিয়ে একেবারে খেয়ে ফেললেই তো পারতিস, ছাড়লি কেন?
…আর একবার কি দুঃসাহসের কাণ্ডই না করে বসেছিল রাখা। অথচ মনে যা ডাক দিয়েছিল তা শুনলেই সে-বিপত্তি ঘটত না। তখন পনেরোয় পা দিয়েছে, বাড়ন্ত গড়নের ছাদ-ছিরি দ্রুত বদলাচ্ছে। কত বদলাচ্ছে সেটা ওই নোহর পাজির চোখ দিয়ে দেখতে চেষ্টা করলে আরো বেশি অনুভব করতে পারে। কিন্তু সে তুলনায় রাধার মনের বয়েস ছাই যদি একটুও বাড়ত। নইলে ওই হাড় বজ্জাতের কথায় বিশ্বাস করে এমন লোভে পড়ে! ও পনেরোয় পা দিয়েছে মানে মনোহরও একুশে পৌঁছেছে। ওর মায়ের মুখেই শুনেছে ঠিক ছ’ বছরের বড় রাধার থেকে। ছিপছিপে লম্বা আর গায়ে শক্তিও কত রাখে সে-তো হাড়ে হাড়েই বুঝেছে।
.. নুন আর কাঁচা লঙ্কা দিয়ে টসটসে পাকা আধ-মিষ্টি কামরাঙা বোধহয় সব থেকে লোভনীয় খাদ্য রাধার কাছে। ও-ছেলে সেটা বেশ জানে। মাঝে মাঝে বাড়িতে এনে রেখে বলে, মা তোর জন্য কামরাঙা এনে রেখেছে–যাস। ওর মা সত্যি ভালো মানুষ, রাধার মুখে মায়ের গান শুনে মুগ্ধ হয়, তাই ডাকলে যায়। কিন্তু কামরাঙা খেয়ে আর নিয়ে ফেরার সময়, এমন কি ছল-ছুতোয় মা-কে সরিয়ে কম বজ্জাতি করে না। কামরাঙা লেগে আছে বলে গাল খিমচে ধরে, ভালো কামরাঙা কেড়ে খাওয়ার অছিলায় কাঁধ-পিঠ খাবলে ধরে, হাত ধরে টানাটানি করে। মোটকথা আরো প্রায় দু’বছর আগে থেকেই ওই বজ্জাত ছেলে ওর দেহটার ওপর হামলা করে মজা পায়। তবু যদি রাধার শিক্ষা হত আর মগজে কিছু থাকত। কপালী বাবা, ফকির সাহেব আর শফিদার মা মিথ্যেই ওকে বুদ্ধিমতী মেয়ে ভাবে।
ওর জ্বালাতনে রাখা প্রায় দুপুরেই ঘরে থাকে না। দিদির কবেই বিয়ে হয়ে গেছে, বাবুয়াকে নিয়ে বাবা গাইতে বেরুনোর পরেই তো রাধা একেবারে একলা। মনোহর সকালে নিজের ধান্ধায় ব্যস্ত থাকে, তার ফুরসৎ দুপুরে। একবার না একবার আসবেই। ওকে কলা দেখাবার জন্যই রাধা অনেক সময় ঘর ছেড়ে কোথাও না কোথাও চলে যায়। ওর যাবার জায়গার তো আর অভাব নেই। এভাবে জব্দ হয়ে একদিন দিব্বি কেটে বলেছে আর ওকে জ্বালাতন করবে না, মা-কালী নাকি ঘুমের মধ্যে তাকে চোখ রাঙিয়ে নিষেধ করেছে। শোনামাত্র রাধা বিশ্বাস করেছে। দারুণ খুশি। এ তো হতেই পারে, মা-কালী ওকে কত যে ভালবাসে তাতে কোনো সন্দেহ আছে।
এরপর বেশ কয়েকদিন মনোহর ভারি ভদ্র আর ভালো ছেলে। অনুনয় করে সাধাসাধি করে দু’দিন ওর মুখে কালীর গানও শুনেছে। রাধা বুঝে নিয়েছে পাজি ছেলেব মতি ফিরেছে। মা ইচ্ছে করলে কি না হয়।
সেই দুপুরে এসে মনোহর জানালো, ওমুক জায়গায় জলের এক গাছে মস্ত বড়বড় কামরাঙা পেকে টসটসে হয়ে ঝুলছে, মনোহরের দেখেই নাকি জিভে জল গড়িয়েছে তক্ষুনি ভেবেছে রাধাকে নিয়ে আসবে, চোখে দেখলে ও আহ্লাদে আটখানা হবে। বলল, একটা ঝোলা নিয়ে চল কত আনতে পারিস দেখব
শোনামাত্র রাধার দারুণ লোভ হল। কিন্তু তার পরেই কি রকম খটকা লাগল।-বাজে ভাওতা দিচ্ছ না তো?
মনোহর সঙ্গে সঙ্গে ভয়ংকর আহত যেন। বলল, এখনো আমাকে অবিশ্বাস তোর! যাক্ যেতে হবে না…মা-ই শুনে বলে দিল, যাচ্ছি যখন রাধাকে নিয়ে যা…দেখেও খুশি হবে। আমার মায়ের কথা না-হয় ছেড়ে দে, আমি কার দিব্বি কেটেছি মনে আছে-গাছে কামরাঙা এমন ঝেপে আছে তুই চোখে না দেখলে বিশ্বাস করবি না–
সংশয় ঝেড়ে ফেলে রাধা জিজ্ঞেস করল, কাঁচা লঙ্কা আর নুন নিয়ে যাব?
নিয়ে নে, এত মিষ্টি যে নুনের খুব দরকার হবে না।
খোশ মেজাজে জঙ্গলে পা দিয়েই থমকে দাঁড়ালো। কেউ যেন ভিতর থেকে স্পষ্ট নিষেধ করল, যাসনি, মুশকিলে পড়ে যাবি।
-কি হল?
জবাব না দিয়ে রাধা কয়েক পলক তার মুখের দিকে চেয়ে রইলো। মুখ দেখে কিছু বুঝতে পারছে না। তারপরেই হনহন করে আগে আগে চলল। ভিতর থেকে যে বলল কথাগুলো মনে মনে তাকেই ধমকে উঠল, বেরুবার মুখে বলেনি কেন–মজা পেয়ে গেছ, কেমন? মুশকিলে পড়লে মুশকিল আসানও তুমি করো কিনা আমি দেখে ছাড়ব।
