বেপাড়ায় টহল, জঙ্গলে গিয়ে ঢোকে। কপালী বাবার ডেরায় যায়, সপ্তাহের শনি মঙ্গল বারে তিনি বিপুরের শ্মশানে থাকেন, কম দূর নয় কিন্তু রাধা দিব্বি হেঁটে চলে যায়, আরো দূরে বিবিমায়ের মন্দিরে যায়–বুড়ো ফকির সাহেব ওকে বড় ভালবাসেন, বড় পীরের সমাধি দেখিয়েতিনি কতজাগ্রতওর কাছে তাই নিয়ে কত গল্প করেন। আবার পর-পর তিন-চার দিন ওকে না দেখলে শফিদার মা বলেন, ক’দিন দেখা নেই বিবিমায়ের ওপর টান চলে গেল নাকি তোর।
কম দূরে থাক এসব জায়গায় আসার টান রাধার বেড়েই চলেছে। …বড় পীরের মাজারে কত দূর-দূর থেকে লোক আসে, মোম আর ধূপ কাঠি জ্বেলে সারি দিয়ে মৌন প্রার্থনায় বসে যায়, ফল দিয়ে যায়, মানত থাকলে মুরগী দিয়ে যায়। বিবিমায়ের গান আরো বেশ মজার জায়গা। মাথায় ঘোমটা টেনে বিবি বসে আছে, কোলে একটা বড়সড় মেয়ে দাঁড়িয়ে, দু’জনেরই পরনে লাল পাড় শাড়ি, গায়ে জামা, বিবিমায়ের বুক পর্যন্ত সাদা জালি কাপড়ে ঢাকা। এখানেও দূর দূর থেকে বেশির ভাগ সব-জাতের মেয়েরাই পুজো দিতে আসে, কার ছেলে হয় না, কার শ্বশুর বাড়িতে যা, কার বিয়ে হচ্ছে না, কার স্বামীর চাষ-আবাদ ভালো হচ্ছে না, কার স্বামী বিচারের আসামী। ইত্যাদি। সব আসে, মানত করে পুজো দিয়ে যায়। পুজোর নিয়মও বেশ মজার ভাবে রাধা। গ্রাম-শহর ঢুঁড়ে বাড়ি বাড়ি চাল ভিক্ষে করে এনে সেই চাল বাজারে বিক্রি করে যা পাওয়া যাবে সেই টাকা দিয়ে আবার চাল ডাল কাঁচা দুধ ডাব ইত্যাদি কিনে পুজো দিতে হবে।
পুজোর আগে বা পরে শফিদার মা এক এক-হাত একদিকের কানের ওপর রেখে গান করে।
শফিদার মায়ের এখন আর গলায় তেমন সুরটুর নেই, বয়েসও হচ্ছে, তবু শুনতে বেশ লাগে রাধার। শুনতে শুনতে এখানকার গানও তার রপ্ত হয়ে গেছে, সামনে থাকলে শফিদার মায়ের সঙ্গে গলা দেয়, গান করে, আর তখন খুব জমে ওঠে।
তবে তার সব থেকে বেশি টান কপালী বাবা আর তার জংলি কালীর ওপর। এমন স্বপ্নটা দেখে ওঠার পর মনে হল মা-কালী যেন ওর সঙ্গে রঙ্গ করল, বিপদের ভয়ে ওকে ঘরে সেধিযে থাকতে বলল। নিজে মা বিপদ নিয়ে খেলা করে আর ওকে কিনা এই ঠাট্টা! ব্যস রোখ চেপে গেল।
এরপর কপালী বাবার কাছে গিয়ে বাবার কথা বা স্বপ্নের কথা কিছুই বলল না। তাঁকে গিয়ে ধরল ওকে অনেক কালীর গান শেখাতে হবে। কপালী বাবাব গানের গলা অবশ্যই বাবার মতো নয়, আর একটু ফাঁসফেঁসেও। কিন্তু অনেক গান জানেন, আর ভাবে বিভোর হয়ে গান যখন রাধার একটুও খারাপ লাগে না। এমন একটি ছাত্রী পেয়ে বাবা খুব খুশি। রাধার গলা কত সুন্দর তাতে তিনি জানেন।
মনে ডাক দেওয়ার ব্যাপারে সেই ছেলেবেলাতেই অনেক রকমের ব্যাপার ঘটে গেছে।…যেমন ঘরে ফিরে বাবার একবার মনে হয়েছিল পয়সা আরো অনেক বেশি পড়েছিল, কিন্তু বাড়ি এসে গুনে দেখা গেল অত নয়। গান গাইতে গাইতে যেখানে দাঁড়িয়ে যায়, বাড়ির এক-তলা দোতলা বা কলকাতায় গেলে তিন-চার তলা থেকেও সিকি আধুলি এমন কি টাকাও পড়ে, পাঁচ দশ পয়সার তো কথাই নেই। সে-সব বাবুয়া তুলে কাঁধে ঝোলানো থলেতে ফেলে। রাস্তার লোক যার দিয়ে যায় তারা সোজা থলেতেই ফেলে। বাবুয়া সে-সব দিদির হাতে তুলে দেয়, রাধা বাবাকে জানায় এত হল, তারপর তুলে রাখে। সেবারে কত হল শুনে বাবা একটু অবাক হয়েই বলল, সে কি রে, আজ তো মনে হয়েছিল অনেক বেশি পেলাম।
বাবা সরে যেতে রাধা বার কয়েক ভাইয়ের দিকে তাকালো। তারপর কথা নেই বার্তা নেই তার গালে ঠাস করে একটা চড় বসিয়ে দিল।–পাজি তোর মুণ্ডুটা আমি ছিঁড়ে নেব, কোথায় পয়সা লুকিয়েছিস বার কর!
বাবুয়া বিষম ভেচাকা খেয়ে গেল, তবু জোর প্রতিবাদ তুলল, বা রে, আমি পয়সা সরিয়েছি তোকে কে বলল–
রাধার আবার হাত উঠল।–আমাকে মা-কালী বলে দেছে, কোথায় রেখেছিস বার কর আগে–
বাবুয়া সুড়সুড় করে তার লুকনো জায়গা থেকে আরো চার টাকা বারো আনা বার করে আনল। অল্প-স্বল্প বোজই সরায়, সেদিন অনেক পেতে লোভে পড়ে অনেক বেশিই সরিয়েছিল। বাবুয়া এরপর দিদির হাতে পায়ে ধরেছে, আর কখনো করবে না, নাক-কান মলেছে।
আশ্চর্য, এমন চিন্তা কোনোদিন রাধার মনের ধারে কাছেও ছিল না। বাবার ওই কথা শোনার পর ভাইয়ের দিকে তাকাতেই কেউ যেন ওর ভিতর থেকে বলে দিল, ওকে ধরে ঝাঁকালেই পয়সা বেরুবে।
…আর একবার। ওদের কুটীর গঙ্গার অর্ধেকেরও ও-ধারে শ্যাওলা-ছাওয়া জলে হঠাৎ চমৎকার একটা গোলাপী আভার মস্ত পদ্ম ফুটেছে দেখল। কুটীর গঙ্গা বলতে বাড়ির পিছনের নোঙরা পুকুরে। এখানে সব বাড়ির সব পুকুরই গঙ্গা। বাড়ির নাম বা পদবীর নামের সঙ্গে জুড়ে পুকুরকে গঙ্গা বলা হয়। সেই কোন্ কাল থেকে লোকের বিশ্বাস এখান দিয়ে গঙ্গা বয়ে গেছল, এখনো কিছু মাটি খুড়লেই জল বেরোয়–তাই ছোট-বড় সব পুকুরই গঙ্গা। বেলা তখন এগারোটা সাড়ে এগারোটা হবে। পুকুরের ওদিকটায় শ্যাওলা শুধু নয় আগাছায় ভর্তি। সাত আট বছর বয়েস থেকে এই পুকুরেই রাধা হুটোপুটি করে চান করেছে, সাঁতার কেটেছে। কিন্তু পুকুরের যা অবস্থা এখন, এ-জলে প্রায় চান করাই বন্ধ করে দিয়েছে। বিশ পঞ্চাশ গজ দূরের প্রতিবেশীদের মানে বাড়ইদের গঙ্গায় চান করে। পদ্মটা দেখে রাধার ভারি লোভ হল। ওটা তুলে নিয়ে বাবার জংলি কালীর পাযে দিতে পারলে বেশ হয়। কালীর পদ্মপ্রীতির কথা জানা নেই, কিন্তু অমন সুন্দর ফুল কার না ভালো লাগবে?
