রাধা তার মাটির ঘরে দরজার হাত দুই দূরে দাঁড়িয়ে ছিল। তিন জন ছাড়া বাকি লোকদের চলে যেতে দেখল। অবশ্য তাজউদ্দীন, শফিদার মা আর কপালী বাবা ছাড়া। এবারে মাটির উঠোনের মনোহর আর নিতাইয়ের সঙ্গে রাধার চোখাচোখি। আঙুল তুলে রাগত মুখে তাদের দেখিয়ে কপালী বাবাকে ইশারা করল, ওদেরও চলে যেতে বলো।
কপালী বাবা মনোহরের ওপর সদয় একটু, তাকে বললেন, সকাল থেকে তুই অনেক করেছিস বাবা, এখন ঘরে গিয়ে বিশ্রাম করগে যা। তারপর নিতাইয়ের দিকে ফিরলেন, তুই দাঁড়িয়ে কেন বাপু, এক্ষুনি কোনো গয়না-পত্র বানানোর অর্ডার পাবার আশায় নাকি?
মনোহর ক্ষুদ্ধ হয়ে তার সাইকেল নিয়ে চলে গেছে, আর কপালী বাবার মুখের কথা শেষ হবার আগেই নিতাই স্যাকরা প্রস্থান করেছে। রাধার দু’চোখ এবার ভগ্নিপতির মুখের উপর।
চৌদ্দ বছরের বড় হারাণ মণ্ডল কুকড়ে গিয়ে একবার কপালী বাবা আর একবার শালীর দিকে তাকালো। অর্থাৎ আদেশ বা ইংগীত পেলেই সে-ও উঠোন ছেড়ে প্রস্থান করবে। কিন্তু রাধা কেবল একটু চেয়েই রইলো, কিছু বলল না বা ইশারা করল না। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে সে উঠোনের বাইরে এসে দাঁড়ালো। কপালী বাবা তাকে ডাকিয়ে এনেছে, আদেশ না পেলে যায় কি করে।
ফকির সাহেব, শফিদার মা আর কপালী বাবা এবারে ঘরে ঢুকলেন। তারা জানা বা শোনার জন্য কম উৎসুক নয়। মেঝেতে বসে অল্প কথায় রাধা তবু অঘটনের ব্যাপারটা বলল একসঙ্গে ডালে-চালে কয়েকটা আলু-বেগুন ফেলে বিলাসীও দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে আড়ি পেতেছে। সব শুনে তাজউদ্দীন বললেন, বড় পীরের দোয়া, বেটীকে বড় ভালবাসেন। শফিদার মা বললেন, বিবিমায়ের কাছে আমি পুজো দেব। আর কপালী বাবা বেশ রাগ করেই বললেন, কত দিন তোকে সাবধান করেছি রাত দুপুরে জঙ্গলের পথে ফিরবি না?
বিমনার মতো রাধা বলল, তাই তো দেখছি গো বাবা, অমন রাত করে তো কত ফিরি, কিন্তু সেদিন বিবিমায়ের থান থেকে জাঙল পথে পা ফেলতেই আমার মনে ডাক দেছিল…কিন্তু তুমি তো জানো। ডাক দিলেই মা-কে পরখ করার ঝোঁক বাড়ে আমার…
*
বাধার এই মনে ডাক দেওয়া আর তার মেজাজের বা রীতির ষোল আনা বুঝতে হলে এবারে বছর পাঁচ ছয় একটু পিছনে তাকানো দরকার।
তখন কত বা বয়েস, তেরো ছাড়িয়ে চৌদ্দও নয়। এর ঢের আগে থেকেই চার বছরের ছোট ভাই বাবুয়াকে নিয়ে বাবা পথে পথে গান গাইতে বেরিয়ে যায়। দূরে গেলে সন্ধ্যার আগে আর ফেরে না। পাঁচ গায়ে, শহরে, এমন কি কলকাতায়ও বাবার উদাও গলার সেই ভক্তিমূলক গানের খুব কদর ছিল। মেয়ে হলেও রাধা বাবার গলার টনটনে স্বর পেয়েছে, সুর জ্ঞান পেয়েছে। বাবা হাতে গোনা কয়েকটা গান গেয়ে সর্বত্র ভালো পয়সা পেত। বিশেষ করে দুটো গান।
‘গিরি এবার উমা এলে,
আর উমায় পাঠাব না,
বলে বলবে লোকে মন্দ,
কারো কথা শুনব না।
যদি এসে মৃত্যুঞ্জয়,
উমা নেবার কথা কয়,
এবারে মায়ে ঝিয়ে করব ঝগড়া,
জামাই বলে মানব না।
সকলের মতো আর একটা গানও রাখার দারুণ ভালো লাগত।
সেটা শিব-স্তোত্র। বাবার মুখে শুনে শুনে ওই গানও মুখস্ত। একই সুরে রাধা সেটাও গাইতো। কিন্তু বাবার গম্ভীর গমগমে গলার সে গান যেমন আয়ুতে ঝংকার তুলত, ওর গলায় সে-রকম হত না। আর ভাইয়ের চি-চি গলায় সে গান শুনলে বাধা হেসে লুটোপুটি খেত।
…বাবা প্রথমে যেন পেটের নিচ থেকে ‘ওম’ বলে একটা শব্দ বার কবে মিনিট খানেক ধরে রাখত। তারপর গাইত :
‘জয় শিবশংকর, হয় ত্রিপুরারি,
সাধক জনগণ মানসবিহারী।
ত্রিলোকপালক, ত্রিলোকনাশক,
পরাৎপর প্রভু, মোক্ষবিধায়ক।
করুণনয়নে হের ভকতজনে,
লয়েছি শরণ চরণে তোমারি।
এই গান রাধার যতই ভালো লাগুক, শিব-শংকরের মূর্তি যতই চোখে ভেসে উঁকি, ও এ গান গাইলে যেন বাবার গানই মাটি। কিন্তু আগের গানটা বাবা বাবুয়াকে নিয়ে বেরিয়ে গেলে সে কত জায়গায় গেয়েছে ঠিক নেই। গিরি এবার উমা এলে আর উমায় পাঠাবে না’ বলে সুর চড়ালেই অদ্ভুত একটা শিহরণ জাগত। মনে হত ও নয়, এ গান যেন ওর মা গাইছে, আর রাধাই যেন উমা, তাকে স্বামীর ঘরে পাঠানো না পাঠানো নিয়ে মায়ের সঙ্গে বাবার বোঝাপড়া হচ্ছে।
মেয়ে যে জন্মগত ভাবে গানের গলা পেয়েছে সুর-ভাব পেয়েছে এটা বাবারও মনে হত। মায়ের গান দু’চারটে তো প্রথম বাবার কাছেই শিখেছে। কিন্তু রাখার মনে বড় দুঃখ বাবা ভাইকে নিয়ে গাইতে বেয়োয়, ওকে নিয়ে নয়। ওর ধারণা, ওকে নিয়ে বেরুলে বাবার এর থেকে ঢের বেশি রোজগার হবে। কিন্তু বাবা মোটে কানই পাতে না। বায়না ধরলে ফুৎকারে উড়িয়ে দেয়। বলে, হুঃ, তোকে এসবের মধ্যে টেনে শেষে আমি বিপদে পডি আর কি, বড় হচ্ছিস খেয়াল আছে…
বাবার সঙ্গে বেরুবে, গান করবে, মায়ের নাম করবে তাতে বিপদ কি হতে পারে রাখা ভেবেই পায় না। বাবার কথাগুলো সর্বক্ষণ মাথার মধ্যে নড়াচড়া করেছে। রাতে স্বপ্ন দেখল, কপালী বাবার জংলি কালী ওর দিকে চেয়ে মিটি মিটি হাসছে আর বলছে, কাজ নেই বাপু আমার নাম করার জন্য পথে বেরিয়ে, কখন কি বিপদ হয় ঠিক আছে। ঘরের মেয়ে ঘরে থাক।
এ-স্বপ্ন রাধা কোনদিন ভুলবে না। কপালী বাবার ডেরায় তার জংলি কালীর সঙ্গে রাধার বলতে গেলে প্রায় রোজই দেখা হয়। হবে না কেন, সকালের খাওয়া খেয়ে বাবুয়াকে নিয়ে বাবা সমস্ত দিনের মতো বেরিয়ে পড়তে রাধার আর বাধা কোথায়?
