মনোহর গলায় প্রতিবাদের সুর তুলেছে, রাধা সেখেনে যেতে যাবে কেন?
-একবার গিয়েই দ্যাখ, না, হাজার হোক বোনাই তো…মান ভাঙাবার জন্যও তো গিয়ে থাকতে পারে।
অর্থাৎ বিলাসী তাকে গোপনে যে খবরটা দিয়েছে, বাবাকেও তা বলতে বাকি রাখেনি। ঐ সম্ভাবনার কথা শোনামাত্র মনোহরের বুকের ভিতরটা চিনচিন করে উঠেছে। তক্ষুনি সাইকেলে উঠে ছুটেছে। তিন কোয়াটারের মধ্যে হারাণ মণ্ডলকে সাইকেলের ক্যারিয়ারে তুলে নিয়ে ফিরেছে। এ সংবাদ শুনে সে-ই বা ঘরে বসে থাকে কী করে?
এই করে বেলা বেড়েছে আর লোক বেড়েছে। বিবিায়ের থান থেকে শফিদার মা এসেছে, বড় পীরের মাজার থেকে তাজউদ্দীন পীর সাহেব এসেছে, প্রথমে কাছের, পরে দূরের প্রতিবেশীরাও এসেছে। কপালী বাবা, শফিদার মা আর পীর সাহেব একত্র হলে হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে ছুটে আসবেই, আধ-মাইল দূর থেকে হন্তদন্ত হয়ে এসেছে নিতাই স্যাকরা। রাধার কোনো প্রেমিক নেই, তা বলে রাধাকেও কেউ প্রেমিকার চোখে দেখবে না। এ তো আর নয়। মনোহর পাইক আর হারাণ মণ্ডলের পরে তৃতীয় দাবিদার নিতাই স্যাকরা। সাত আর পাঁচ বছরে দুটো ছেলে মেয়ের বাপ, ছেলে হবাব ছ’মাসের মধ্যে তার বউ সৃতিকায় মরেছে। হারাণ মণ্ডলের কাছাকাছি বয়েস, দু’জনে বন্ধুও ছিল, আর দু’জনেরই উনিশ-বিশ একই রকমের কপাল। তফাতের মধ্যে হারাণের শিশু সন্তান দুটোও মরেছে, সে ঝাড়া হাত পা, আর নিতাই স্যাকরার ছেলে মেয়ে দুইই বেঁচে, তাদের স্বাস্থ্যও ভালো। নিতাইয়ের সঙ্গে হারাণ মণ্ডলের মনোমালিন্যও বাবাকে নিয়েই। রাধার মুরুব্বি হিসেবে হারাণের ইচ্ছেটা নিতাই তার কাছেই প্রকাশ করেছিল। ফলে এখন মুখ দেখাদেখি বন্ধ।
…তা সবার সেরা অর্থাৎ সব থেকে উত্তেজনার খবরটি সে-ই এনেছে। এখবরের যোগানদার যে-সে লোক নয়, সকলের সব থেকে পরিচিত এবং শ্রদ্ধার মানুষ ডাক্তার বিজন চৌধুরী। খানিক আগে তিনি বৃদ্ধ কালী ভক্ত দোতারবাবুকে দেখতে এসেছিলেন। দোতারা বাবু রাধাকে খুব স্নেহ করেন, মাঝে মাঝে ডেকে এনে গান শোনেন। বছরে দু’তিনবার রাধাকে তিনি টাকা-কাপড় দ্যান। তাকে দেখতে এসে বিজন ডাক্তার রাধার দুর্বিপাকের কথা বলেছেন। রাধাকে তিন ডাকাত জঙ্গল থেকে মুখ বেঁধে নিয়ে কুলপির কাছে এক চাষের জমির কুজিঘরে এনে তুলেছিল। ওকে বেঁধে ফেলে রেখে ডাকাতরা ফুর্তি করার জন্য মদ কিনতে গেছল। সেই ফাঁকে এক বুড়ী এসে তাকে উদ্ধার করে। খুব সম্ভব রাগের চোটে ওই ডাকাতরাই বুড়ীকে গলা টিপে মেরে ফেলে। বিজন ডাক্তার সেই বুড়ীকে দেখে তবে দোতারা বাবুর কাছে এসেছেন। রাধা এখনো থানার ও সি ঘোষ সাহেবের হেপাজতে কাল রাত থেকে আছে।
দোতারা বাবুর বাজার সরকার নিতাইয়ের বন্ধু। তার দোকানে বসে তেষ্টা মেটায়। রাধার ব্যাপারে বন্ধুর মনও জানে। খবরটা শুনে সবার আগে সে বন্ধুকে জানানো কর্তব্য ভেবেছে। নিতাই স্যাকরা সবে তখন দোকানের ঝাঁপ খুলতে যাচ্ছিল। দোকানের চিন্তা মাথায় তুলে সে ছুটতে ছুটতে রাধার ডেরায় এসেছে এবং সকলকে হালের খবর দিয়েছে। এর পর লোক আসা বাড়তেই থেকেছে।
.
জিপ থেকে আগে রাধা নামল। তার বেশবাস দেখে অন্য সকলে ছেড়ে কপালী বাবা পর্যন্ত অবাক। মুখখানা বেজায় গম্ভীর অবশ্য, কিন্তু নতুন দামী জামা-কাপড়ে দেখাচ্ছে কি সুন্দর। তারপরেই থানার ও সি সাহেবকে নামতে দেখে কার মুখে আর কথা সরবে?
কপালী বাবা দাওয়ায় দাঁড়িয়ে। তার পাশে পীর সাহেব আর শফিদার মা। উঠোন ধরে এগিয়ে গিয়ে রাখা আগে কপালী বাবার পায়ে মাথা রেখে প্রণাম করল। তারপর অন্য দু’জনকে। রক্তাম্বর বেশে কপালী বাবাকে অংশুমান সেই প্রথম দেখলেন। অন্য দু’জনকেও, কিন্তু এই একজনকেই মেয়েটার গুরু মনে হল। থানায় ফে ছাড়া তার আর করণীয় কিছু নেই এখন। তবু দাওয়ায় উঠে একবার সামনের ঘরটার ভিতরে উঁকি দিলেন। মাটির ঘরের তকতকে মেঝের কোণে অনেকগুলো ছোটবড় দেব-দেবীর ফোটো দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড় করানো।
বিৰি মায়ের স্থান থেকে ফেরার সময় অংশুমানেরও কেন যেন ইচ্ছে হয়েছিল মেয়েটাকে আবার থানায় ফিরিয়ে নিয়ে গিয়ে স্ত্রীর হাতে তুলে দেন। মুখ ফুটে সে-প্রস্তাবও করেছিলেন। রাধা মাথা নেড়েছে, এখন না।
-কেন, তুই তো বুঝতে চেয়েছিলি, তোকে বাঁচানোর জন্য তোর মা-কালী ওই বুড়ীকে কেন নিল।…তা আমি যা খবর পেলাম বুড়ীটা ভালো লোক ছিল না, ওকে টাকা খাইয়ে অনেক বদ লোক ওখানে আশ্রয় নিত, মেয়ে মানুষ নিয়ে ফুর্তিও করত, তোর বেলায় তার সুমতি হয়েছিল, তার ফল পেল, আর বোঝার কী আছে?
রাধা তার দিকে তাকায়নি, সামনে চোখ রেখে বলেছিল, মা-কালী। ওর ওপর ভর না করলে তার এমন সুমতি হতে যাবে কেন…।
-তাই না-হয় হল, কিন্তু তোর বোঝা তত হয়ে গেলো, এখন যেতে আপত্তি কি?
-না।…তোমার কাজ হয়ে গিয়ে থাকে তো আমাকে এখানেই ছাড়ি দিতে পারো।
আর জোর না করে অংশুমান তাকে তার ডেরায় নিয়ে এসেছেন। ঘরটা একবার উঁকি দিয়ে দেখে নিয়ে আর অনুরোধ না করে চলে গেলেন।
রাধা তার ঘরের মধ্যে।
মাতনের চার ভাগের তিন ভাগ বাসিন্দা মুসলমান, বাকিরা নানা বর্ণের হিন্দু। ভিড় করে আছে যারা তারা প্রায় সকলেই সাধারণ মানুষ, রাধাকে বেশির ভাগই ভালবাসে। মেয়েটার কী হল, চূড়ান্ত সর্বনাশ কিছু হয়ে গেল কিনা এটা জানা বোঝার জন্য তারা ব্যাকুল। যদিও অনেকেরই বিশ্বাস ( তাকে দেখার পর আরো বেশি) এ-মেয়ের বড় ক্ষতি করার সাধ্য কারো নেই। আবার এই রাধা-অঙ্গের প্রতি ভিতরে ভিতরে লুব্ধ জোয়ান মরদও বেশ কিছু আছে, আর তার চলন বাঁকা দেখে এমন মেয়ে-পুরুষও নেই এমন নয়। তাই কপালী বাবার আদেশ আর ফকির সাহেব তাজউদ্দীন আর বিবিমায়ের পূজারিণী শফিদার মায়ের অনুরোধে ভক্ত হিন্দু মুসলমানদের বেশির ভাগই চলে গেল বটে, আবার অনেকে ভালো করে জানা যোঝর জন্য দাঁড়িয়ে রইলো। এবারে কপালী বাবা তেড়ে এলেন, তাঁকে সাহায্য করল মনোহর পাইক আর নিতাই স্যাকরা। শেষ পর্যন্ত ভগ্নিপতি হারাণ মল, মনোহর পাইক আর নিতাই স্যাকরা ছাড়া একে একে সকলেই চলে গেল।
