এসেছেন। গত দিনে কখন ঘর ছেড়ে বেরিয়ে ছিল আর কোথায় গেছল জিগ্যেস করেছেন। তারপর দাড়িতে খানিক হাত বুলিয়ে বলেছেন, এক কাজ কর, মনোহর পাইকের ঘর চিনিস তো?…পা চালিয়ে চলে যা, বলবি আমি এক্ষুনি ডাকছি।
মনোহর পাইকের ডেরা এখান থেকে মাইলটাক দূরে।
মনোহর পাইক বাবার সাম্প্রতিক কাজের ভক্ত। বছর পাঁচেক আগেও রাধাকে জ্বালাত বলে বাবাটি ওকে ত্রিশূল নিয়ে তাড়া করেছিলেন। মনোহর এখন তা বলে বাবার সাধন-ভজনের ভক্ত নয়, তেল-তত্ত্ব এবং তোয়াজ তোষামোদ কলায় সিদ্ধহস্ত। তার বাপ সাইকেল রিকশা চালাতো, সেই বাপ দু’বছর হল গত হয়েছে, মনোহর পাইক তার বাবু ছেলে। ঘরে বিধবা মা ছাড়া আর কেউ নেই। বছর পঁচিশ ছাব্বিশ বয়েস এখন, রাধার থেকে বছর দু’সাত বড়। কিন্তু ছেলেবেলা থেকেই তার রাধার দিকে চোখ। উপযুক্ত ছেলের বিয়ে দেবার জন্য তার মা নাকি মাথা খুড়ছে, কিন্তু ছেলের বিয়েতে মতি নেই। বাপ। রিকশ চালাতে, ছেলে ঝকঝকে একটা শৌখিন সাইকেলে চেপে গ্রাম শহরে টহল দিয়ে বেড়ায়। পরনে সর্বদা চকচকে চোঙা প্যান্ট, গায়ে নানা রঙ বেরঙের দামী জামা, হাতে ঘড়ি, পায়ে পালিশ করা জুতো, মুখের সিগারেট কপালী বাবা কখনো দেখেন নি কিন্তু শ্রদ্ধাবনত হয়ে সামনে এলে গন্ধ পান। বার প্রতি তার বিগলিত ভক্তির একটাই কারণ। রাধার গার্জেন বলতে এখন কপালী বাবা। মনোহরের বড় আশা এই বাবাটি যদি একবার মুখ খোলন বা হুকুম করেন, রাধা সুভড় করে তার ঘরে চলে আসবে। সাহস করে কপালী বাবার একটা দুর্বল জায়গায় হাত ফেলতে পেরেছে মনোহর। রক্তাম্বর ধুতি চাদর দিয়ে প্রণিপাত শুরু করেছিল, সেটা এখন ‘কারণে’ দাঁড়িয়েছে। দিশির মধ্যে সেরা অর্থাৎ যাকে বলে ‘বেলায়তি’, সে-রকম এক-একটা বোতল এনে তার চরণের সামনে রাখে। এই কারণ-সুধার স্বাদ তিনি কমই পান। ভক্তদের মধ্যে যারা যা এনে দেয় তা নির্জলা দিশি, আর… সঙ্গে যা পান করেন তা একেবারেই চোলাই। আগে শববাহকরা যা একটু ভালো-মন্দ বাবাকে খাওয়াত ওই নোহরের ভক্তির ঠেলায় তার থেকেও ভালো জিনিস জুটছে।
তার উদ্দেশ্য কপালী বাবা গোড়া থেকেই জানেন। তাই প্রথম দিন পায়ের কাছে বোতল রাখতেই চোখ লাল করে তার দিকে তাকিয়েছিলেন। তোর তাহলে এসব চলে?
জিভ কেটে নাক-কান মলে মনোহর মাথা নেড়েছে। খায় না। এই ‘কারণ প্রণামীর গুণেই মনোহরের কিছুটা অন্তরঙ্গ হওয়া সহজ হয়েছে। বাবা খোলাখুলি জিগ্যেস করেছেন, তোর বাপ তত রিকশ চালাতো, তুই এত বাবুয়ানি করার টাকা পাস কোথায়?
মনোহর তক্ষুনি কালীর দিব্বি কেটে বলেছে, তার সবই উপার্জনের টাকা, হকের টাকা, দিন-কাল বুঝে সে কাজের লাইন বদলেছে, তাইতেই ভালো রোজগার হচ্ছে।
সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন, কী কাজ করিস তুই?
মনোহর দালাল শব্দটা মুখে উচ্চারণ করেনি। বাবাকে বুঝিয়েছে, সব লেন-দেনের কাজের মধ্যেই আজকাল মাঝখানে একজন লোক থাকে, যে দুই পার্টির যোগাযোগ করিয়ে দেয়। যেমন একজন টাকার দরকারে জমি বেচবে আর একজন কিনে বাড়তি টাকা খরচ করবে দু’জনের যোগাযোগ করিয়ে দিলে দু’তরফ থেকেই তার কিছু পাওনা হয়। তেমনি কারো চালের আড়ত আছে, সে তিন টাকা কিলো দরে একশ বস্তা চাল ছাড়বে, আবার কলকাতার কোনো চালের ব্যবসায়ী চাল দেখে সাড়ে তিন টাকা দরে সেই চাল কিনতে রাজী, তার তখন কিলো প্রতি আট আনা লাভ–মাল পৌঁছে দেওয়ার খরচ-খরচা বাদ দিয়েও কিলো প্রতি চার পাঁচ আনা নেট লাভ তো থাকবেই।
কপালী বাবার দু’চোখ কপালে বলিস কি রে?
তার আসল রোজগার যে চোলাইয়ের দালালি থেকে এটা মুখ ফুটে বলার মতো বোকা সে নয়। চোলাই তৈরি করে এমন তিন তিনটি ঘাটির মাল মেয়ে মজুবনির মারফত নানা জায়গায় চালান করেই কাঁচা টাকার মুখ দেখছে সে।
কপালী বাবার বিবেচনায় ছেলেটা চৌকসই বটে। অতএব রাধার মন বুঝতে চেষ্টা করেছিলেন। শুনেই রাধা ঝাঁঝিয়ে উঠেছে, ওটা হাড়-বজ্জাত, খবার তুমি ওকে আস্কারা দেবে না বাবা।
কারণের লোভে এ-মেয়েকে তার অনিচ্ছায় কারো ঘাড়ে চাপিয়ে দেবার লোক নন তিনি। তাকে সোজা বলেছেন, যা চাইবার সোজা মায়ের কাছে চাইবি, নামঞ্জুর করলে সব পাওয়া যায়, নইলে লবডঙ্কা।
আরজি নিয়ে মা পর্যন্ত পৌঁছুতে পারবে এ বিশ্বাস মনোহরের নিজেরও নেই। অতএব এ ব্যাপারেও সে কপালী বাবাকে মিডলম্যান হিসাবেই তোয়াজ করে চলেছে।
বিলাসীর মুখে খবর শুনে মনোহর তার সাইকেল উড়িয়ে পাঁচ মিনিটের মধ্যে চলে এলো। কপালী বাবা তীক্ষ্ণ চোখে প্রথমে তাকে নিরীক্ষণ করেছেন। কাল দুপুরে বেরিয়ে আর বাড়ি ফেরেনি.. তার কী হতে পারে?
মনোহর আর্তনাদ করে উঠল, অন্তর্যামী হয়ে বাবা আপনি আমাকে শুধাচ্ছেন?
ভেবে চিন্তে কপালী বাবা তাকে বিবিমায়ের থানে, তারপর বড় পীরের মাজারে আর একবার শ্মশানে খবর নিয়ে আসতে বললেন।
মনোহর পাইক আবার সাইকেলে উড়ে গেছে। মিনিট চল্লিশের মধ্যে হাঁপাতে হাঁপাতে ফিরেছে। তার খবর, বিবিমায়ের থান থেকে রাধা একটু রাতেই রওনা হয়েছিল, মাজারে বা শ্মশানে তার কোনো খবর নেই।
কপালী বাবা বলেছেন, চট, করে একবার বিষ্ণুপুরে ওর বোনাই হারাণ মণ্ডলের কাছ থেকে ঘুরে আয়, সেখানে যদি গিয়ে থাকে–
হারাণ মণ্ডল লোকটাকে দু’চক্ষে দেখতে পারে না মনোহর। তার ধারণা, বয়সে চৌদ্দ পনেরো বছরের বড় হলেও ওই লোকটারই শালীর ওপর সব থেকে বেশি চোখ। এমন খবরও বিলাসীর মারফত কানে এসেছে বিয়ের প্রস্তাব দিতে রাধা নাকি তাকে ঘর থেকে বার করে দিয়েছিল। বাবার পেয়ারের চেলাকে বিলাসী বলবেই বা না কেন? বিলাসী তাকে সুনজরেই দেখে।
