এই ধরনের মানুষকে চিনতে বা বুঝতে অংমানের সময় লাগার কথা নয়। মনে মনে হাসলেন, মুখে জানালেন, আগের ও সি মিস্টার চক্রবর্তীর কাছে তিনিও তার অনেক প্রশংসা শুনেছেন। বিশেষ ব্যস্ততার মধ্যে আছেন বলে আজ আর তিনি বসতে বা সময় দিতে পারছেন না। এরপর তার আসার কারণ অর্থাৎ ঘটনা শুনে অতি বিনয়ী জোতদার শ্রীনাথ পোদ্দার হতবাক। বুড়ীর কথা বলামাত্র চিনল।
বুড়ীটার নাম জিগ্যেস করতে শ্রীনাথ তক্ষুনি মনে করতে পারল না। অন্য একজন স্মরণ করিয়ে দিল নাম কামিনী। শ্রীনাথ সখেদে জানান দিল, এই বুড়ীর সম্পর্কে পাঁচরকম কথা তার কানে আসছিল, ওকে ঘুষ দিয়ে অবাঞ্ছিত লোকেরা এসে নাকি রাত কাটিয়ে যায়, সে নিজেও ভাবছিল বুড়ীটাকে আর ওখানে রাখবে না, কিন্তু আশ্চর্য, একটা মেয়ের মান ইজ্জত রক্ষা করতে গিয়ে নিজে প্রাণটা দিল।
অংশুমান কান খাড়া করে কথা ক’টা শুনলেন। তারপর ফেরার জন্য পা বাড়ালেন। নামী অতিথির সেবা করা গেল না বলে নাথ পোদ্দারের আর একপ্রস্থ খেদ। সঙ্গে সঙ্গে জিপ পর্যন্ত এলো। আসবে জানা কথাই।
বড়সড় জিপ। পিছনে নয়, নিজে ড্রাইভারের পাশে বসে রাধাকেও সামনেই বসতে দিয়েছিলেন। ডাকলেন, রাধা নেমে আয় তো একটু।
রাধা জিপ থেকে নামল। শ্রীনাথ পাোরের দিকে চেয়ে অংশুমান কেবল একটু চোখের ইশারা করলেন। তাইতেই সে আরো দুই এক পা কাছে এগিয়ে এলো।…পরনে অংশুমানের স্ত্রীর দেওয়া সাদার ওপর বেগুনে ডুরের দামী শাড়ি, গায়ে তেমনি চকচকে নতুন হালকা বেগনি রঙের ব্লাউস, স্নানের পর মহিলা নিজের হাতে চুল বেঁধে দিয়েছিলেন। থমথমে মুখ সত্ত্বেও নিটোল যৌবনা মেয়েটাকে দেখাচ্ছিল বড় সুন্দর। দেখার নামে শ্ৰীনাথ পোদ্দারের দু’চোখ তার সর্বাঙ্গ লেহন করল একপ্রস্থ। কিন্তু চতুর মানুষের আত্মস্থ হতে সময় লাগল না বড়বাবুর দিকে ফিরে জিগ্যেস করল, একেই ডাকাতে ধরে নিয়ে গিয়ে আমার জমির কুজিঘরে নিয়ে তুলেছিল?
অংশুমান মাথা নাড়লেন। দু’চোখ রাধার মুখের ওপর। রাধা অপলক চোখে শ্রীনাথ পোদ্দারকেই দেখছে।
-এ কোন্ গাঁয়ের মেয়ে? ডাকাতের খপ্পরে পড়ল কী করে?
–মাতন গাঁয়ের।…আমারও এখন অনেক কিছু জানতে বাকি, বুড়ীকে চেনে এমন কাউকে এখুনি আপনি আমার থানায় পাঠিয়ে দিন, পোস্টমর্টেমে নিয়ে যাবার আগে সনাক্ত করবে, চলি–
শ্রীনাথ পোদ্দার যুক্ত করে আবার আনত হল।
জিপ চলতে অংশুমান গলা খাটো করে জিগ্যেস করলেন, এই লোকটাকে বা তার সঙ্গে যারা ছিল কাউকে কখনো দেখেছিস?
রাখা মাথা নাড়ল। দেখেনি।
…এই লোকটাকে তুই ওভাবে দেখছিলি কেন?
–ওর কুজিঘর বলল, তাই।…লোকটা ভালো না।
–ও তো মস্ত লোক, ভালো না তোকে কে বলল?
–কেউ না। আমার মনে এলো।
–ওই তিন ডাকাতের কাউকে যদি দেখিস চিনতে পারবি?
-জঙ্গলের আন্ধার থেকে টেনে নে আন্ধার পথে গেছল, হাত মুখ বেন্ধে আন্ধার ঘরে ফেলে রেখেছিল, মুখগুলো খুব আছা চোখে লেগে আছে…ঠিক চেনতে পারবনি
ওখান থেকে অংশুমান বিবিমায়ের থানে এলেন একাই নেমে খোঁজ নিতে গেলেন বিবিমায়ের পুজো করে শফিদার মা শফিদা জানালো, রাধা দিদির বাড়িতে কী গণ্ডগোলের কথা শুনে তার মা সেখানে গেছে
রাধা কাল কখন এখানে এসেছিল আর কখন চলে গেছল?
জবাব, দুকুরে এয়েছিল, রেতে গেছে, আলে অনেকক্ষণ থাকে।
–রাতে জংলা পথে একলা ফেরে?
মেয়েটা ঘাড় কাত করল। মুখেও বলল, রাধা দিদির কুনো ভয়-ডর লাইগো বাবু।
বেলা সাড়ে দশটা। রাধার চালা-ঘরের সামনে তখন ভিড় জমে গেছে। গতকাল বেলাবেলি মেয়ে বেরিয়েছে, সমস্ত রাতের মধ্যে আর দেখা নেই সেটাই উত্তেজনার ব্যাপার। রাতে রাধার ঘরের সামনের দাওয়ায় যে বয়স্কা মেয়েলোকটি ঘুমোয় আর দিনমানেও বেশির ভাগ সময় এখানে পড়ে থাকে তার নাম বিলাসী। আগে শ্মশানে রাত কাটাতে, কপালী বাবাকে খুব ভক্তিশ্রদ্ধা করে, রাধার বাপ মরে যাওয়ার পর থেকে কপালী বাবার হুকুমে সে রাধার কাছে থাকে। ভাইটা তো বাপ মারা যাবার পরে-পরেই নিরুদ্দেশ। রাধা খুশি মনেই তার খাওয়া দাওয়ার ভার নিয়েছে। রাত পর্যন্ত আসছে না। দেখেও বিলাসী উতলা হয়নি। কারণ এটা কোনরকম অনিয়মের মধ্যে পড়ে না। কোথাও গাইতে গেলে ফিরতে রাত হয়, কপালী বাবার সঙ্গে শ্মশানে বা তাঁর ডেরার জংলি কালীর কাছে গিয়ে বসলেও ফিরতে কত সময় বেশি রাত হয়ে যায়।
দাওয়ায় পড়ে এক ঘুম দিয়ে ওঠার পরেও বিলাসী ঘরে চুপি দিয়ে দেখে রাধা নেই। কত রাত জানে না, কিন্তু গহিন রাত এটুকু আন্দাজ করতে পেরেছে। তখন দুর্ভাবনা শুরু হয়েছে।
…শনি মঙ্গলের রাত কপালী বাবা শ্মশানে কাটান। অন্য পাঁচ দিন ঘরেই নিজের জংলি কালীর পুজো নিয়ে থাকেন। রাধার ঘর থেকে পিছনের পুকুর পার দিয়ে জংলা পথ ধবে গেলে দশ মিনিটের মধ্যে তার ডেরায় যাওয়া যায়। আর সামনের ঘুর পথ ধরলে মিনিট পনেরো লাগে। কপালী বাবার আজ ঘরেই থাকার কথা। কিন্তু এত রাতে বিলাসীর পিছনের জংলা পথ ধরে যেতে সাহস হয়নি। ঘরের শিকল তুলে দিয়ে লণ্ঠন নিয়ে সামনের রাস্তা ধরেই গেছে। গিয়ে দেখে জংলি কালীর সামনে মাটির মেঝেতে শুয়ে বাবা গভীর ঘুমে। ভয়ে ভয়ে তাকে ঠেলে তুলল।
রাধা এত রাতেও ঘরে ফেরেনি শুনে তিনি হকচকিয়ে গেলেন। মায়ের মূর্তির দিকে খানিক চেয়ে থেকে বিলাসীকে বললেন, এত রাতে আর কোথায় খোঁজ করব, তুই ঘরে যা, আমি সকাল হলেই যাচ্ছি।
