বিস্ময় নয়, আমায় স্নায়ুতে স্নায়ুতে মগজের কোষে কোষে কথা চলে কেবল বিশ্বাস নামে একটা শব্দ নিয়ে। দুর্গেয় বিশ্বাসের মিছিল আমি কম দেখিনি। নিজে তার সঙ্গে ভিড়তে পারিনি, কিন্তু অজ্ঞতা বা দুর্বলতা বলে উড়িয়ে দিতে পারিনি।
…আজ কয়েক পলকের জন্য রাখার চোখে যে আগুন দেখলাম সে-ও বোধ করি বিশ্বাসেরই আগুন। এ-বিশ্বাস জয়ী হবে কি হবে না তা অনাগত ভবিষ্যত জানে। পাঠককে আমি তার হদিস দিতে পারব না। কিন্তু এর আগেও আর একবার রাধার চোখে এ আগুন যিনি দেখেছেন, বিশ্বাসের এমনি আগুন দেখেছেন, আর জয়ী হতেও দেখেছেন–পাঠকের কাছে এখন আমি কেবল সেই বৃত্তান্তটুকুই পেশ করতে পারি।
.
মৃত বুড়ীর দেহ পোস্টমর্টেমে যাবে, সেখানকার রিপোর্ট আসতে ঢের দেরি। কিন্তু তাকে যে গলা টিপে মারা হয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
আবার জিপ পাঠিয়ে ডাক্তার বিজন চৌধুরীকে নিয়ে শব পরীক্ষা করানো হয়েছে। তিনিও নির্দিধায় একই মত দিয়ে গেছেন। বুড়ীকে সনাক্ত করেছে রাধা। অতএব পুলিশকে এখন বিধিমতেই অনুসন্ধান শুরু করতে হবে। অংশুমান রাধাকে আবার ওপরে নিয়ে গিয়ে ধমক-ধামক করেও আর খাওয়াতে পারেননি। তার আগে তার স্ত্রীর অনুনয় ব্যর্থ হয়েছে।
রাধার ঠাণ্ডা জবাব, চোখ দেখিও না বাবু, তোমাদের যা করার করো– আমার মুখে এখন কিছু উঠবে না।
সুচারু দেবী ব্যাকুল মুখে স্বামীকে আড়ালে টেনে নিয়ে গিয়ে বলেছেন, ওকে এখন আর খাওয়ানো যাবে না, দোহাই তোমার ওকে আর একটি কটু কথা বোলো না।
অংশুমান তাকে আশ্বাস দিয়েছেন, ওকে কিছু খাওয়ার চেষ্টাতেই ওরকম করে বলেছেন, ওকে নিয়ে যেটুকু কাজ তা শেষ হলেই জিপে করে ঘরে পৌঁছে দেবেন।
সুচারু দেবী আবার এসে রাধার হাত ধরে অনুনয় করেছেন, তোমাকে নিয়ে উনি এখন একটু তদন্ত করতে বেরুবেন, কিন্তু তুমি কথা দাও ওঁর সঙ্গেই আবার এখানে ফিরে এসে খাবে?
রাধা বলেছে, খাওয়াবার মন হলে তার অনেক সময় পাবে দিদি.. আগে বুঝতে দাও আমাকে বাঁচাতে মা-কালী ওই বুড়ীকে কেন নিল, কে ওই রাক্ষুসীর কাছে এমন দয়া চেয়েছেল?
অন্য তিন-চার কর্মচারীসহ রাধাকে নিয়ে সংশুমান কুলপির দিকেই সেই চাষের জমির পাশের ‘কুজিঘরে এসেছেন। তিনটে ঘরের মধ্যে রাখা শেষের ঘরটাকে দেখালো। ওই ঘরটায় ডাকাতেরা তাকে এনে তুলেছিল, পিদিম হাতে বুড়ী শিকল খুলে হাতমুখ বাঁধা অবস্থায় তাকে দেখে বলে উঠেছিল, ডাকাতরা তোকে জোর করে তুলে এনেছে–টাকার লোভে নিজে আসিসনি?
রাধা তখন নিশ্চিত জানে না-কালী বুড়ী সেজে ওকে বাঁচাতে এসেছে, কারণ আকুল হয়ে ও তখন মা-কালীকেই ডাকছিল। কথা শুনে রাগই হয়ে গেছল, জোরে জোরে মাথা নেড়েছে।
কাছে নয় দূরে-দূরে কিছু জনবসতি আছে। জিপে করে সে দিকে গিয়ে অংশুমান কয়েকজন বয়স্ক লোকের কাছে বুড়ীর সম্পর্কে খবর নিয়েছেন। তারা কেউ ভালো বলল না। চাষের সময় ভিন্ন জমির মালিকেরা কোনো লোককে তারা ওই কুজিঘরে থাকতে দেখেনা। ঘর তিনটে তখন ওই বুড়ীকেই আগলাতে দেখা যায়। সে জমির মালিকের লোক কিনা কেউ জানে না। …ওই ঘরগুলো তখন মাতাল বদমায়েসের আড্ডা হয়ে ওঠে। সকলেরই ধারণা বুড়ীটা এদের কাছ থেকে টাকা-কড়ি পায়।
জমির মালিকের নাম শ্রীনাথ পোদ্দার, অনেক জায়গায় অনেক জমি-জমার মালিক, অর্থাৎ নামকরা জোতদার। লক্ষ্মীকান্তপুরে নিবাস।
এই একটি নাম অংশুমান ঘোষের শোনা আছে। যে কয়েকটি শাঁসালো লোকের নাম আগের বন্ধু ও সি তাকে দিয়ে গেছলেন, এই নাম তাদের ওপরের সারিতে। তার পিছনে জোরালো রাজ নৈতিক পার্টির মদত আছে। হাতে গুণ্ডা আর মাস্তানের দল। চালের সাদা-কালো কারবারে ফুলে-ফেঁপে উঠেছে। কলকাতায় মদের দোকান আছে, অন্য লোক চালায় কিন্তু আসল মালিক সে-ই। সুদে টাকা খাটায়, কিন্তু যেসব খাতকের ঘরে সুন্দরী মেয়ে বউ আছে–তারা। তার বদান্যতার প্রশংসা করে। মোট কথা লোকটার সব গুণই পুলিশের অনুকূলে। পুলিশ তার দিকে চোখ তুলে তাকানোর আগেই সবিনয়ে সে পর্যাপ্ত সম্মানদক্ষিণা দিয়ে থাকে। তার কোন পুকুরে বায়ো চৌদ্দ কিলো রুই কাতলার চাষ হয় কেউ জানে না, কিন্তু পূজা-পার্বনে নিজস্ব পুকুরের ও-রকম মাছের আস্বাদ থানার পদস্থ জনেরা পেয়ে থাকে। তার কাছে সর্ব-ধর্ম সমান, ঈদ বা বড়দিনকেও তুচ্ছ করে না, পর্যাপ্ত মাছ মাংসসহ বিদেশী বোতলও আসে। তাছাড়া সমাজের শান্তি-রক্ষকদের আমের দিনে আম-মিষ্টি, ইলিশের মৌসুমে গঙ্গার ইলিশ খাওয়ানোটাও তার কর্তব্য-কর্মের মধ্যে পড়ে। এই ফিরিস্তি দেবার পর গলা খাটো করে প্রাক্তন ও সি বন্ধুটি বলেছিলেন, শ্রীনাথ পোদ্দারের এসব দাক্ষিণ্যের মর্যাদা করাটা কিন্তু থানার ও সি’র চাকরির পক্ষে খুব নিরাপদ নয়।
ঘটনাস্থল থেকে জিপে লক্ষ্মীপুরে আধ-ঘণ্টার পথ নয়। পুলিশের গাড়ি তারও আগে শ্রীনাথ পোদ্দারের মন্ত দালানের সামনে দাঁড়ালো।
অংশুমান পরিচয় দেওয়া মাত্র বন্ধুর বিবৃতির জ্যান্ত পট দেখলেন। দু’হাত জোড় করে কোমর পর্যন্ত মাথা নোয়ালো। পরনের দামী তাঁতের ধূতি খাটো করে পর, গায়ে পাক্ষির থ্রি-কোয়াটার-হাত ফতুয়া, গলায় সোনার হার। বছর চৌত্রিশ-পঁয়ত্রিশ হবে বয়েস। ছিপছিপে দোহারা চেহারা গায়ের রং ফস, নাকের নিচে কালো ভোরার মতো এক ইঞ্চি প্রমাণ পুষ্ট গোঁফ। মাননীয় অতিথিকে নিয়ে কী করবে, কোথায় বসাবে ভেবে না পেয়ে অস্থির যেন। দীন কুটিরের বিলাসবহুল বৈঠকখানায় এনে বসিয়ে বার বার খেদ প্রকাশ করল, বিশেষ কাজে তিন সপ্তাহের ওপর দিল্লিতে থাকতে হয়েছিল, ফিরে আসতে কলকাতার কর্তাদের তলব, মাত্র তিন চারদিন হল ঘরে ফিরে হাঁপ ফেলতে পেরেছে–আজ কালের মধ্যেই সে নিজে গিয়ে বড়বাবুর দর্শন-প্রার্থী হত–এই ত্রুটিটুকু মাপ করতেই হবে, আগের সদাশয় ও সি তাকে খুব স্নেহ করতেন, তার খুব আশা এই ত্রুটির জন্য নতুন বড়বাবুর কাছ থেকেও এই স্নেহ থেকে বঞ্চিত হবে না, ইত্যাদি।
