ঘোষ সাহেব বড় একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে হাসতে লাগলেন। আমাকেই বললেন, আর রাখা-ঢাকার চেষ্টা করে লাভ নেই।
এরপর সাগ্রহেই আমি আদ্যোপান্ত বললাম, যতটা সম্ভব সহজ করে পরিস্থিতি বোঝাতে চেষ্টা করলাম।
অপলক চোখে তাকিযে এক মনে শুনল। তারপর হঠাৎ বেখাপ্পা প্রশ্ন।–ধরো আর পাঁচ বেড়ে বেপদের ঘরেই এলো, তখন আর কোনো চিকিচ্ছেই নেই?
ঘোষ সাহেব জবাব দিলেন, থাকবে না কেন, তবে সেটা হল সব থেকে কঠিন অবস্থার চিকিৎসা
তাঁর দিকে একটা আঙুল তুলে রাধা বলল, তুমি চুপ করে থাকো, যা বলার ইনি বলুন। আবার আমার দিকে তাকালো যত কঠিন অবস্থাই হোক, চিকিচ্ছে যখন আছে, কেউ ভালো হয় কিনা, একজনও ভালো হয় কিনা?
তাড়াতাড়ি জবাব দিলাম, নিশ্চয় হয়।
চেয়ে আছে। যেন আমার মুখখানাই নিরক্ষণের বস্তু। –ডাক্তার যখন বলেছে পাঁচ সাত বছরও এ অবস্থায় থাকতে পারে…তা লে চের জেবন থাকতে পারে না কেন?
পারে না এমন কথা কেউ বলেনি।…তবে ওই কঠিন রোগ হলে তা থাকে না।
অসহিষ্ণু।–কঠিন রোগ যে হয়েইছে এ-কথা এখনো তো কেউ হলপ করে বলতে পারেনি?
জবাব না দেওয়াই নিরাপদ ভাবলাম, কিন্তু ঘোষ সাহেব আলতো করে বলে বসলেন, জেনে-বুঝেও তুই নিজেই কী বলেছিস– কেবল ডাক্তার বদলানোর তাগিদ দিয়েছিস।
আস্তে আস্তে তার দিকে ফিরল। চেয়ে আছে তো আছেই।– তোমার ভাবনা-টাবনা আর সব বালাই তুমি আমাকে দেছ কি দাওনি?
এবারে ঘোষ সাহেবের চেয়ে থাকার পালা একটু।– তোর কি মনে হয়, দিয়েছি না দিইনি।
-তাহলে এখন থেকে তুমি আমার কিছু কথা মেনে চলবে চিকিচ্ছে যেমন চলছে চলবে, তোমার এই বন্ধুটি নরম মনের ভালো মানুষ, খুব বুদ্ধি ধরেন, তোমার চিকিচ্ছের ব্যবস্থার ভার যখন লয়েছেন ও-ব্যাপারে কখন কী করতে হবে সে-চিন্তা তার–তুমি কেবল ধরে নেবে তুমি ভালো আছ, তোমার কিছু হয়নি–কেবল ধরে নেবে না, বিশ্বাস করবে। দেহ যখন ধরেছ উপসর্গ থাকবেই। তারপরেও যদি দরকার হয় রাধা তোমার কথা ভাববে–দায় যখন দিয়ে দেছ তোমার কি ভাবনা? আমার কথা তোমার মনে লাগছে?
ঘটা করে ঘোষ সাহেব আবার একটা বড় নিঃশ্বাস ছাড়লেন। জবাব দিলেন, খুব সোজা করে বড় কঠিন হুকুম করলি, এমন বিশ্বাস মনে লেগে থাকবে কি না এ-ও তুই জানিস।
কালো সুন্দর মুখখানা ভারি কোমল হয়ে এলো।–থাকবে গো থাকবে, তোমার চেষ্টার জোর এখন কত তার তুমি কী জানো তোমার কেবল আনন্দে থাকা কাজ আর নিশ্চিন্ত থাকার চেষ্টা।
আমার দিকে ফিরল, তারপর আঙুল তুলে সোজা দেওয়ালে টাঙানো কালীর ফোটোটা দেখালো-ওই মেয়ে লড়াই বড় ভালবাসে বুঝলে বাবু, নিজের ছেলেমেয়ের সঙ্গেও লড়াইয়ে নেমে যায়, কিন্তু লড়াইয়ে জিতলে কত দুঃখ পায় আর হারলে কত খুশি হয় এখপরটি আমার নিজের জেবন দিয়ে বুঝে নিয়েছি–বুঝলে বাবু? মোড়া ছেড়ে সোজা উঠে দাঁড়ালো, পটের দিকে দু’পা এগিয়ে গেলো। অদ্ভুত ধীর অথচ টনটনে গলায় বলল, আমিও দেখব তোর মুরোদ কত, হেরে হাসিস না জিতে কাঁদিস!
অভিভূত বিস্ময়ে চেয়ে আছি। মনে হল রাধার সরল শান্ত টান দুই চোখে এই প্রথম আমি আগুন দেখলাম।…
দেখছি। দু’চোখ বুজে স্থির দাঁড়িয়ে রইলো খানিক। তারপর সুডোল দেহে একটু ঝাঁকুনি তুলে নিজেকে নিজের মধ্যে ফেরালো যেন। আগের সেই শান্ত কোমল মুখ। ঘোষ সাহেবের দিকে ফিরল। -হীরুকে ডাকো, আমি এক্ষুনি ফিরব।
ঘোষ সাহেবেরও সম্বিত ফিরল যেন।-সে কি! এত পথ যাবি একটু জলও তো মুখে দিলি না।
-আজ জল মুখে দেবার মন নিয়ে আসিনি বড়বাবু, আমার তাড়া আছে
দরজার দিকে এগলো। নিজের অগোচরে আমিও মোড়া ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। ব্যস্ত হয়ে ঘোষ সাহেব হীর উদ্দেশে হাঁক-ডাক করে উঠলেন। হীরু প্রস্তুতই ছিল।
ঘোষ সাহেব সামনের বারান্দার রেলিংএ এসে দাঁড়ালেন। সঙ্গে আমিও। হীরু গাড়ির দরজা খুলে দিতে রাধা সোজা উঠে গেল। একটু পরেই গাড়ি চোখের আড়ালে।
ঘরে ফিরে আবার বসলাম আমরা। মনে হল ঘোষ সাহেবের ভেতরটাও এই মুহূর্তে দূরে সরে আছে। একটু হেসে জিগ্যেস করলেন, কীরকম বুঝলেন মশাই?
একটু থেমে ফিরে জিগ্যেস করলাম, আমার থেকে আপনি এঁকে ঢের ভালো জানেন… আপনি কী-রকম বুঝলেন?
বিমনা ভাব একটু। তারপরেই হালকা হবার চেষ্টা।–ও যা বলে গেল ভাবলে বোঝা সকলের পক্ষেই সোজা। …ডাক্তারদের বা আমাদের যা আশংকা ও তার উল্টো কিছু ভাবছে না বা বলছে না।
পরের প্রশ্নটা করে আমি নিজেই অপ্রস্তুত একটু।
এরকম লড়াইয়ে আপনার বিশ্বাস আছে?
স্বস্তি, একটুও চিন্তিত বা বিব্রত দেখলাম না। হেসেই জবাব দিলেন, এ-সব লড়াইয়ের মর্ম বুঝি না খবর রাখি যে আমি বিশ্বাস করব? আমার আগের সেই উদ্বেগ আর নেই এটুকু শুধু বলতে পারি …আর আজ দেখে রাধার বিশ্বাসও কিছুটা আঁচ করতে পারি।
উৎসুক।– কী রকম?
–যত কঠিনই হোক জিতবে এই স্থির বিশ্বাস নিয়েই ও লড়াইয়ে নামছে
ফিরে আসার পর অনেক সময় অনেকগুলো ঘণ্টা পার হয়ে গেছে। আমি খুব আত্মস্থ বোধ করিনি। রাতে ভালো ঘুম হবে না মনে হলে আগে থাকতে কোনো-একটা ঘুমের ট্যাবলেট খেয়ে নিই। আজ শষ্যা নেবার দু’ঘণ্টার মধ্যেও চোখে পাতায় এক হল না, তবু ওষুধের দিকে হাত বাড়াইনি কারণ জেগে থাকতেই ভালো লাগছে।
নিঃশব্দে উঠলাম। আবছা অন্ধকার সামনের বারান্দায় একে উড়ালাম। রাত কত দেখিনি। শহর ঘুমুচ্ছে।
