–কি রকম? আপনি পকেট বোঝাই করে ফিরেছেন আর প্রোডিউসার আপনাকে সবটাই অ্যাডভান্স করে দিয়েছে?
এবারে হাসলাম। আমার পকেট কতটা বোঝাই এখন আপনি জানবেন কি করে? আর, প্রোডিউসার সবই অ্যাডভান্স করেছে–কিছু বাকি আছে সেটা আপনার থেকে ভালো আর কে জানে?
পরদিন সন্ধ্যার আগেই আমরা কাগজ-পত্র নিয়ে কলকাতার স্পেশালিস্ট ডাক্তারের কাছে হাজির। গ্রাফিক চার্টে একশ পঞ্চায় ইউনিট দেখে বেশ গম্ভীর। জিগ্যেস করলেন, তাদের কি অ্যাডভাইস …এক্ষুনি অপারেশনের দিকে যেতে চান না তো?
মাথা নাড়লাম। কী অ্যাডভাইস বললাম।
সায় দিয়ে বললেন, আমারও তাই মত। …এক দেড় বছর একই ভাবে চলছে, বারো বছর কত যদি চলে তো চলুক না। তবে মাঝে মাঝে গিয়ে চেক করতে হবে, আর অসুবিধে বোধ করলে তো তড়ি ঘড়ি করাতে হবে। তার আগে পর্যন্ত এক চিকিৎসা, পরে অন্য
যা শুনতে চাইছি সে কথাটাই বলছেন না বলে ভিতরে ভিতরে অসহিষ্ণু হয়ে উঠছি। জিগ্যেস করলাম, আপনার চিকিৎসায় পরের বারের রিডিং তো কিছু নেমে আসতে পারে?
ভদ্রলোক হেসেই ফেললেন একটু।– পারেই না এটা জোর দিয়ে বলছি না, তা নামলে চিন্তার তো অর্ধেক হয়ে গেল, তাহলে টিপিক্যাল ম্যালিগন্যান্ট গ্রোথ নয় বলে আশা করা যেতে পারে, একশ পঞ্চান্ন থেকে আর না বাড়ে সব ডাক্তারের কাছেই এটা এখন এখন চিন্তা।
ঘোষ সাহেব আস্তে আস্তে বললেন, আমার একটি ছেলে আর একটি মেয়ে…ম্যারেড অ্যাণ্ড কোয়াইট অ্যাডালট, তাদের কি কিছু জানানো উচিত মনে করেন?
ডাক্তার বিস্মিত একটু। …এতদিনের ব্যাপার, বম্বে গিয়ে টেস্ট করিয়ে এলেন…অথচ তাঁরা এখনো কিছুই জানে না বা সন্দেহ করেননি?
-না, আমার এই বন্ধুটি সহজেই ম্যানেজ করেছেন, আর বাড়া বাড়ি না হলে ভবিষ্যতেও ম্যানেজ করা যাবে–জানলে খুবই আপসেট হবে…তবু আপনার কি অ্যাডভাইস?
–তাহলে জানাবার জন্য তাড়াহুড়ো করার কি আছে, বাড়লে তো আপনিই জানাজানি হবে, কিন্তু একইভাবে চললে তাদের আর উতলা করে লাভ কি?
ভদ্রলোক বেশ ভেবে-চিন্তে প্রেসকৃপশন লিখলেন। ওষুধ খুব বেশি নয়। সময় ধরে ধরে এক-একটা ব্লড টেস্টের অ্যাডভাইই বেশি।
পরদিন।
বিকেল তখন চারটে হবে। ঘোষ সাহেবের গাড়ি তার দোর গোড়ায় দাঁড়ানো। হীরু দাস চালাচ্ছিল। যাকে আশা করছিলাম সে-ই কিনা দেখার জন্য রেলিঙে ঝুঁকলাম। হা, গাড়ি থেকে রাধা নামল। তারপরের যেটুকু সেটুকুই অপ্রত্যাশিত। রাধার দুচোখ প্রথমে ওবাড়ির দোতলার দিকে উঠল। বারান্দায় কেউ নেই। তারপর এ-বারান্দার দিকে ঘুরল। আমাকে দেখেই দু’হাত জোড় করে নিচতলার দরজার দিকটা দেখিয়ে দিল। অর্থাৎ সানুনয়ে আমাকে চলে আসতে অনুরোধ করল।
রাধা এলে ঘোষ সাহেব একসময় আমাকে ডেকে পাঠাতে পারেন এমন একটা আশা আমার মনের তলায় ছিল। কিন্তু গাড়ি থেকে নেমে বারান্দায় আমাকে দেখেই এই একজন সানুনয়ে আমাকে আসতে বলবে এ ভাবব কি করে। যা-ই হোক পাঞ্জাবিটা গায়ে চড়িয়ে হন্তদন্ত হয়ে চললাম।
দোতলায় উঠে দরজার সামনে এসে দাঁড়াতে ঘোষ সাহেবের খুনি গলা কানে এলো, এত তাড়াতাড়ি এসে যাবি ভাবিনি–রাস্তা ফাঁকা ছিল বুঝি? মোড়াটা টেনে বোস।
পর্দার ফাঁক দিয়ে দেখছি দেয়ালে টাঙানো কালীর পটের সামনে গড়িয়ে প্রণাম সেরে রাধা ফিরল। এবারে ঘোষ সাহেবের পায়ে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করল।
–এত প্রণামের কি আছে, বোস বোস।
মোড়াটা কাছে টেনে বসল মনে হল। কেমন আছ?
–খাসা, এই তিন চার দিনেই তরতাজা হয়ে ফিরেছি। সাড়া দিলাম, আসব?
কয়েক নিমেষ থমকালেন কিনা বোঝা গেল না।–আরে মুখুজ্জে মশাই নাকি, আসুন, আসুন–
ভিতরে এসে দাঁড়াতেই সহাস্য প্রশ্ন, ওকে গাড়ি থেকে নামতে দেখেই এসে গেলেন নাকি?
জবাব রাধা দিল, উনি বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছেলেন, দেখে আমিই আসতে বলেছি। চট করে উঠে আর একটা মোড়া এনে সামনে রাখল। –বোসো বাবু।
ও ডেকেছে শুনে ঘোষ সাহেব একটু ভ্যাবাচাকা খেয়ে আমার দিকে তাকালেন। এভাবে ডাকাটা আমার কাছেও দুর্বোধ্য। আমি বসতে রাধা নিজের মোড়াটা আধ-হাত সরিয়ে নিয়ে বসল। ঠাণ্ডা দু’চোখ আমার দিকে।–ভালো বেড়ানো হল?
হাসি মুখে ফিরে বললাম, তোমার বড়বাবু কী বলেন?
জবাব দিল না, ঘোষ সাহেবের দিকে তাকালো না। ঠাণ্ডা চাউনি আমার মুখের ওপরই পড়ে থাকল খানিক। তারপর রয়ে সয়ে যা বলল শুনে আমরা দুজনাই বিমূঢ়। বড়বাবু সম্ভব হলে একশর মধ্যে একশ কথাই মিথ্যে বলে আমাকে, আর তোমার তো শুনি মিথ্যে বলাই পেশা, মাথা থেকে বানিয়ে গপপ লেখো শুনি, তবু তোমাকেই জিগ্যেস করব বলেই ডেকেছি–যা বলব সত্যি জবাব দেবে না ভাওতা দেবে?
হকচকিয়ে গিয়ে ঘোষ সাহেবের দিকে তাকালাম। তিনিও আমারই মত বিমূঢ়।
-অত চোখ তাকা-তাকি করার দরকার নেই, তোমরা বুদ্ধিমান বলে অন্য সকলেই ষোল আনা বোকা নয়। বোম্বাইয়ের ডাক্তার বড়বাবুর কী পরীক্ষা করল কী বলল, সব আমাকে ভালো করে বুঝিয়ে বলো–কিছু ফাঁকি দেবে না।
আমি হাঁ হয়ে ঘোষ সাহেবের দিকে তাকালাম। তিনি আমার থেকেও ডবল হাঁ।
–তুই জানলি কি করে– বুঝলি কি করে?
বিরক্ত ভাব।–এটুকু জানা বোঝা কি খুব বাহাদুরির কাজ। আমার কথায় একে সঙ্গে করে তুমি অন্য ডাক্তার দেখালে চিকিচ্ছে করলে, তারপর এর হুট করে বোম্বাইতে কাজ পড়ে গেল আর সঙ্গে সঙ্গে তুমিও সেখানে বেড়াতে যাবার জন্য নেচে উঠলে-অথচ ছেলে মেয়ে সাধ্য-সাধনা করলেও ঘর ছেড়ে নড়তে চাও না–বুঝেছি বলেই তক্ষুনি তোমার যাবার কথায় সায় দিয়েছিলাম–ছেলেমেয়ে দুটোকে বুঝতে দাওনি ভালো করেছ, আমাকে গোপন করার কি আছে? এখন কথা না বাড়িয়ে আগে সব বলো শুনি
