কিন্তু স্ত্রীর ঘরে এসে হেসে হেসেই মন্তব্য করতেন, মুখে বলে বটে, কিন্তু ভয় ও এই দুনিয়ায় বোধহয় কাউকেই করে না, বরং ওর কখন কি মেজাজ থাকে এই নিয়েই ভাবনা সকলের।
অংশুমান এটুকু খুব অবিশ্বাস করতে পারেননি। কারণ, সেই প্রথম দিনের যোগাযোগে তাঁর নিচের কর্মচারীদের সামনে এক বুড়ীর মৃতদেহের পাশে বসে তার শাসানির জবাবে যে-রকম পাথুরে যা করে আর পাথুরে চোখ তুলে যা বলেছিল তা ভোলা নয়।
…বলেছিল, তোমার ঘরে ছেলেমেয়ে আছে, তোমার বউ ভালো মানুষ, তার এমন কথা বোলো না-মা-কালী তোর জিভ টেনে ছিঁড়ে নেবে।
…ভয়-ডরের লেশ মাত্র থাকলে থানার দাপটের বড়বাবুকে এমন বলার বুকের পাটা আর দেখেননি।
…তারপর আট বছর পরের সেই এক ঘটনা। যে-ঘটনার পরে মেয়েটার যত না হোক, অংশুমান ঘোষের জীবনের পরিবর্তন ঘটে গেছে ঢের বেশি। তারপরে মাস আড়াই মাত্র সেখানকার চাকরিতে বহাল ছিলেন তিনি। ওই আড়াই মাসের মধ্যে স্বামী-স্ত্রীতে ওই মেয়ের সঙ্গে যেন জন্ম-জন্মান্তরের শুদ্ধ বোগ অনুভব করেছেন। মাত্র আড়াই মাসে অনন্তকালের ব্যবধান উত্তীর্ণ হতে পেরেছেন। প্রমোশন পেয়ে দূরে চলে আসার পরেও সেই যোগ আর ছেড়েনি বরং দৃঢ়তর হয়েছে।…ওই আড়াই মাসে সপ্তাহে দু’তিন রাতও রাধাকে তাঁর কোয়াটার্স-এ ধরে রাখতে পেরেছেন। সে এক অনির্বচনীয় আনন্দের দিন গেছে। রাধার ছেলেবেলার দিনগুলির কথাও রাতে পাশাপাশি শুয়ে সুচারু দেবী তার মুখ থেকেই শুনেছেন, আর পরে স্বামীকে বলেছেন, সেখান থেকেই শুরু করে ঘোষ সাহেব আট বছর পরের সেই একটি দিনের ঘটনা বিস্তার করে পরের উপসংহারে এসে থেমেছেন।
বিছানায় শুয়েই ঘড়ি দেখলাম। রাত সাড়ে চারটে। সাড়ে তিনটেয় আমরা শুয়েছি। এরই মধ্যে পাশের শয্যায় ঘোষ সাহেবের নাসিকা-গর্জন বেড়েই চলেছে। বড় তৃপ্তির ঘুম ঘুমোচ্ছেন।
আমার চোখে ঘুম নেই। কিন্তু তার জন্য কোনো ক্লান্তিও নেই। নিঃশব্দে উঠে পড়লাম। চোখে মুখে জল দিয়ে চেয়ারটা জানালার থারে তুলে এনে বসলাম। সামনে চেয়ে বসে আছি বটে, কিন্তু আবছা অন্ধকারে কিছু দেখছি না বা দেখতে চেষ্টাও করছি না।
ভোরের আলো স্পষ্ট হচ্ছে। আরব সাগরের কালো জলে লাল সূর্যের গলানো সোনার রঙের ছোঁয়া লাগল।
আমার চোখের সামনে সমুদ্র-জোড়া একখানা সুশ্রী কালো মুখ। সেই কালো মুখের ওপর ওমনি সোনার রং ঝিকমিক করছে।
৪. সকাল দশটার ফ্লাইটে
সকাল দশটার ফ্লাইটে রওনা হয়ে বেলা বারোটায় কলকাতায় পৌঁছেছি। রওনা হবার ঘণ্টাখানেক আগে ঘোষ সাহেব হোটেল থেকে মেয়েকে ফোন করেছিলেন। মেয়ে আবার তার দাদাকে ফোনে জানিয়ে থাকবে। অফিল কামাই করে ছেলে আর জামাই এয়ারপোর্টে উপস্থিত।
শমীর বাড়িতে দুপুরের খাওয়ার ব্যবস্থা। দেবু বলল, আমায়। ওখানেই ব্যবস্থা করতে চেয়েছিলাম, শমীটা কিছুতেই রাজি হল না, মাঝখান থেকে আমাদের সুদ্ধ ওর ওখানে নেমন্তন।
দেবুর দিকে চেয়ে আমি ওর সেই এগারো বছরের মুখখানা কল্পনা করতে চেষ্টা করছিলাম, একশ সাড়ে পাঁচ ছয় অবে, ভাজাভাজা, বেহু, সেখানে ডাকাতের হাত থেকে প্রাণ আর ইজ্জত রক্ষা পাওয়া একটা উনিশ বছরের মেয়ে পাকেচক্রে এসে গিয়ে ওর বাবার পাশে গড়িয়ে দেখছে আর তারপর বিধান দিচ্ছে।
কল্পনা করতে পারব কেন, মাঝে তেইশ বছরের ফারাক। কিন্তু রাধার সেই উনিশ বছরের মুখ দিবি চোখের সামনে আসছে।
বাপের সঙ্গে আমাকেও পেয়ে শমী খুশিতে আটখানা। ছেলের বউ ঊর্মিলা তো কডার করিয়ে নিল, সকলে মিলে একদিন তার কোয়াটার্স এও জমায়েত হতে হবে। তারপর তাদের সাগ্রহ প্রশ্ন, প্রোডিউসারের সঙ্গে আমার হিন্দী ছবির কথাবার্তা পাকা হয়ে গেল কিনা।
ঘোষ সাহেব মাঝখানে ফোড়ন কাটলেন, পকেট কি-রকম বোঝাই করে ফিরলেন সেটা বরং জিগ্যেস কর।
ওরা সানন্দে বিশ্বাস করল, কারণ ওদের ধারণা বকের ফিল জগতে টাকার গাছের ছড়াছড়ি, ধরে একবার নাড়া দিতে পারলেই ঝরঝর করে পড়ে। শমী আনন্দ করে বলে উঠল, তাই নাকি! তাহলে তো আমাদের আর একটা বড় খাওয়া পাওনা হয়ে থাকল।
রসিকতা করতে গিয়ে ঘোষ সাহেব একটা বড় রকমের সত্যি কথাই বলে ফেলেছেন। অনেক বার কাজের তাগিদেই বোম্বাই গেছি এসেছি, থোকে টাকাও কম পাইনি, কিন্তু এবারের মতো এখন পকেট বোঝাই করে আর কখনো ফিরিনি। খুশি মুখে সায় দিয়েছি, নিশ্চয়, যেদিন বলবে সে-দিনই হবে, তোমরাই ঠিক করো–
মেয়েটার মধ্যে সত্যি কৃত্রিমতা কম, সেটা অন্যভাবে প্রকাশ করল।–আগে বলুন কত টাকা অ্যাডভান্স নিয়ে ফিরলেন, আমরা সেই বুঝে প্রোগ্রাম করব, শুধু খেলেই তো হবে না কি বলো বউদি?
আড় চোখে একবার ঘোষ সাহেবের মুখখানা দেখে নিয়ে জবান দিলাম, আমার এবারকার পোডিউসার সবটাই অ্যাডভান্স করে দিয়েছেন–তোমরা খুশিমতো ইলাস্টিক প্রোগ্রাম করতে পারে।
জামাই তার গাড়িতে পৌঁছে দিতে চেয়েছিল, তার প্রস্তাব নাকচ করে ঘোষ সাহেব বিকেল চারটে নাগাদ ট্যাক্সি ডাকিয়ে আমাকে নিয়ে রওনা হয়েছেন। তারপরেই বলেছেন, আপনিও তো মশাই ঝানু কম নন, পুলিশের ওপর একেবারে টেক্কা দিয়ে বসলেন! আমি গেলাম সাদা মনে একটু রসিকতা করতে–
আমি যতটুকু সম্ভব গম্ভীর। যতই খুশির চাল চালি এই লোকের গলা নিয়ে মনের তলায় একটা বড়-রকমের অস্থিরতা থিতিয়েই আছে। কথার মাঝে ওকে থামিয়ে দিয়ে বললাম, বসিকতা করতে গিয়ে আপনি একটু মিথ্যের আশ্রয় নিয়েছেন, আর আমার দিক থেকে আমি নিজল। সত্যি কথাই বলেছি।
