অংশুমান উঠে ধরা-চুড়া পরে এবার নিচে নামার জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন। এত বছরের চাকরিতে এর থেকে ঢের বেশি দুঃখ আর অত্যাচারে জর্জর শতশত জীবন দেখেছেন।
কিন্তু ও-ঘরে স্ত্রীটি আ- আ-হা করে অস্থির।–তাহলে তোর দেখাশুনা এখন করে?
–মা-কালী করে, বিবি-মা করে, বড় মাজারের পীরবাবা করে কপালী বাবা করে–ও-জঞ্চি আমি ভাবি না গো দিদি। তারপরেই ফিক করে একটু হাসি। দেখা শোনা করার লোভ তো তিন গায়ের আরো কত জনার, কিন্তু ভগ্নিপতির দাপটে পেরে ওঠে না–তার নিজের জিভেই যে অষ্টপ্রহর টসটস করে জল গড়াচ্ছে! মা-কালীর যেমন ইচ্ছে তেমন হবে।
…মেয়েটার কথা-বার্তা যেমন সহজ সরল, ওর ভিতরটাও সত্যি সে-রকম কিনা অংশুমান ভেবে পান না।
সুচারু সামনে বসে রাধাকে খাওয়াচ্ছেন। সবে খান দুই লুচি মুখে দিয়েছে, সিঁড়িতে ব্যস্তসমস্ত পায়ের শব্দ শোনা গেল। তারপরেই বড়বাবুর সঙ্গে কার কথা কানে এলো।
কুলপির দিকে এক চাষের জমির কাছে একটা বুড়ী মরে পড়েছিল। দেখে মনে হয় রাতে তাকে গলা টিপে মারা হয়েছে। তাকে তুলে থানায় নিয়ে আসা হয়েছে। ওই জমির ধারে চাষের সময় মালিকের লোক থাকার তিনটি ‘কুজি’ ঘর আছে, আশপাশের কেউ কেউ বলছে, যখন কেউ থাকে না বুড়ীটা তখন ওই ঘরগুলোর কোনটাতে পড়ে থাকত।
সুচারু দেবী বাধা দেবার সময় পেলেন না, রাধা খাওয়া ফেলে ছিটকে উঠে দাঁড়ালো। সুচারু দেবী হাঁ-হাঁ করে ওঠার আগেই সে বাইরে।
তুই খাবার সব ফেলে রেখে উঠে এলি কেন, আয় শিগগীর, থানায় এ-রকম খবর হামেশা আসে
রাধার কানেও ঢুকল না, বড়বাবুর সামনে যে ইনসপেক্টর দাঁড়িয়ে তাকে গলা চড়িয়ে জিগ্যেস করল, কী বললে গো বাবু তুমি, রেতে চাষের জমির সামনে বুড়ীকে গলা টিপে মারা হয়েছে। সেখানে কুজিঘর আছে তিনটে-কুলপির দিকে। অস্বাভাবিক চাউনি বড়বাবুর দিকে ফিরল।–আমি আঁধারে ছুটতে ছুটতে যে লোক দুটোকে পেলাম তারা তো কুলপির দিক থেকেই আসছিল, সেপথেই ডাক্তারবাবুর বাড়ি–তাহলে যে বুড়ী কাল আমাকে ডাকাতদের হাত থেকে বাঁচালে, বুঝতে পেরে তারাই ওকে মেরে ফেলেনি তো?
এদিকে সুচারু দেবী হাত ধরে ওকে ধরে নিয়ে যাবার আর টানছেন। ঝটকা মেরে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে উত্তেজিত মুখে বড়বাবুকে বলে উঠল, হাঁ করে আমার দিকে চেয়ে আছ কি, আমাকে নে চলে আমি দেখব কোন বুড়ীকে নে আসা হল, সে হলে আমি ঠিক চিনতে পারব।
অংশুমান ঠাণ্ডা গলায় বললেন, কাল রাতে তো তুই বললি, মা কালী বুড়ী সেজে এসে তোকে উদ্ধার করল?
-আঃ, কী-যে বিবেচনা তোমাদের বুঝি না-মা-কালী ওর ওপর ভর করে আমাকে বাঁচাতে পারে না?
অংশুমান গম্ভীর মুখে একবার স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে নিয়ে বললেন, এই মেয়ে নিচে নেমে আয়
-খাওয়ার নিকুচি করেছে। ছুটে সিঁড়ি ধরে নিচে নেমে গেল। ইনসপেক্টরটি বিমুঢ়। বড়বাবুর রাগ হচ্ছে কিন্তু অবাকও কম হচ্ছেন না।
অংশুমান নিচে নেমে এলেন। বুড়ীর মৃতদেহ সামনের বারান্দায় শোয়ানো। তার পাশে ধুলো মাটির মেঝের ওপর নিশ্চল পাথর মূর্তির মত রাধা বসে। গত রাতে যে ওকে ডাকাতের হাত থেকে উদ্ধার করেছিল এ সেই বুড়ী কিনা, এ আর জিগ্যেস করাও নিরর্থক। কিন্তু অংশুমান পুলিশী ধাতেই কর্তব্য শুরু করলেন।–এ সেই বুড়ী তাহলে?
জবাবও দিল না, তার দিকে তাকালোও না।
এবারে আর একটু ঝাঝালো গলায় প্রশ্ন, এই বুড়ী তোকে চিনত বা আগে দেখেছে কখনো?
এবার নির্বাক, মুখও ফেরালো না।
হাতের বেটনটা দিয়ে শপাং করে দেয়ালে থামের ওপর বসালেন।-কথা কানে যাচ্ছে? এদিকে তাকা!
আস্তে আস্তে ফিরল। তেমন পাথর মূর্তি।
-আমি যদি বলি ডাকাত-টাকাত সব মিথ্যে কথা, তুই ওদের সঙ্গে ফুর্তি করার জন্য ওদিকে গেছলি-বুড়ীকে দেখে ধরা পড়ার ভয়ে ওকে মারা হয়েছে–তারপর ছুটে এসে যা বলেছিস সব বানানো কথা?
পাথর মূর্তিতে সাড় ফিরে আসতে লাগল। অপলক চেয়ে রইলো। আশ্চর্য, এত দিনের পোড় খাওয়া ও সি অংশুমান ঘোষ কিরকম অস্বস্তি বোধ করতে লাগলেন। তারপর জবাব এনে আরো স্তব্ধ। একটি একটি করে বলল, তোমার ঘরে ছেলেমেয়ে আছে, তোমার বউ ভালো মানুষ, আর এমন কথা বোলো না–মা-কালী তোমার জিভ টেনে ছিঁড়ে নেবে।
ঘোষ সাহেব আমার দিকে চেয়ে হাসছেন অল্প অল্প। ঘড়িতে রাত তখন এগারোটার কাছাকাছি। বললেন, থানার প্রবল দাপট তার প্রতিপত্তির ও সি’র নাগাল আড়াই তিনমাইল দূরের একটা গ্রাম্য মেয়ে কিভাবে পেল-এটাই তো আপনার প্রশ্ন ছিল?…পার আমি বলেছিলাম, এই কড়া মানুষের মেজাজের মাথায় যোগাযোগের প্রথম দিনেই মেয়েটা একটা থাপ্পড় মেরে বসল-মিলেছে?
হেসেই জবাব দিলাম, অনেকটা…তবে আমার প্রশ্নটা এর থেকেও অনেক বড় কিছুর ওপর থেকে যবনিকা তোলার ভনিতার মধ্যে ছিল।
মুখের মৃদু হাসিটুকু সুন্দর লাগছে। কোনরকম উদ্বেগের হিটে কেঁটাও দেখছি না। জানালা দিয়ে সমুজের দিকে চেয়ে আছেন। রাতের অপেক্ষাকৃত নির্জনতায় সমুদ্রের একটা শাঁ শাঁ শব্দ আসছে। বোম্বাই তটের এদিকের আরব সাগর বেশ শান্ত।
যবনিকা তোলার ব্যাপারেও ঘোষ সাহেব ছোট একটু ভূমিকা করে নিলেন। মেয়েটার উনিশ বছর বয়সে তাঁর আর তার স্ত্রীর সঙ্গে প্রথম যোগাযোগ। কিন্তু মেয়েটার সাতাশ বছর বয়েস পর্যন্ত তিনি অন্তত এই মোগাযোগটুকু খুব একটা ভাবাবেগের দিকে গড়াতে দেননি। আরো পাঁচজন ভদ্রলোকের গৃহিণীর মতোই তাঁর স্ত্রীরও মেয়েটার প্রতি স্নেহ আর আকর্ষণ বাড়ছিল। কিন্তু এই ক’বছরের মধ্যে স্বামীর কুটির ভয়ে তাকে বাড়িতে অর্থাৎ থানার দোতলার কোয়াটার্স-এ ডেকে এনে কখনো নাম-গানের আসর বসাননি। কাছে বা তিন মাইলের মধ্যেও কোথাও রাধার গান হবে জানতে পারলে তিনি যাওয়া আসার জন্য আগে ভাগে জিপের বায়না করে রাখতেন। তার, ছেলেমেয়ের জন্মদিনে হোক বা যে-কোনো অছিলায় হোক রাধাকে নেমন্তন্ন করে জিপ পাঠিয়ে আনাতেন এবং পৌঁছে দেবার ব্যবস্থা করতেন। প্রায় চব্বিশ ঘণ্টা উপসী থেকে মেয়েটা খেতে বসেও না খেয়ে চলে গেছে এই খেদ ভুলতে মহিলার অনেক সময় লেগেছিল। কিন্তু তখনো বড়বাবুটি ওই মেয়ের তেমন কাছের মানুষ মোটেই নন। স্ত্রীকে নাকি বলত, তোমার বাড়িতে যাব কি, বড়বাবুটিকে দেখলেই আমার বুকের তলায় কাঁপুনি ধরে।
