সবে সকাল। বেশ মিষ্টি গানের গলা কানে আসতে অংশুমানের ঘুম ভেঙে গেল, বিছানায় উঠে বসলেন, দেখলেন স্ত্রী আগেই উঠে দোর গোড়ায় দাডিযে শুনছেন। অংশুমান ছেলের গায়ে হাত রাখলেন, গা ঠাণ্ডা। দু’কান আবার নিজের অগোচরে সজাগ। গ্রাম, সুবের বড় অদ্ভুত মিষ্টি গান। গলা ছেড়ে গাইছে না, আবার একেবারে আস্তে না।
ও মা, দেহ-জ্বর আসে যায়
ভব-জ্বর তো ছাড়ে না,
মন জ্বলে আর পরাণ জ্বলে
ও মা, তার বদ্যি তো মেলে না
দেহ-জ্বর আসে যায়
ওষুধ গুণে সেরে যায়
মা-গো, ভব-জ্বরে যে জর-জর
সে ওষুধ কোথায় পায়?
রাধা কয়, যা রে মন নিজ ধাম
তার ওষুধ মায়ের নাম।
স্ত্রী দু’হাত জোড় করে কপালে ঠেকালেন। কার উদ্দেশে এ প্রণাম অংশুমান বুঝলেন না। কোনরকম উচ্চাঙ্গের আহামরি গান কিছু নয়। কিন্তু আবেদনে এমনই মূর্ত যে সবল স্নায়ুর মানুষটাও কান পেতে না শুনে পারেননি।
সুচারু দেবী উঠে পায়ে পায়ে রাধার সামনে এসে দাঁড়ালেন। গান থেমেছে, কিন্তু চাউনি এখনো ভাবে তন্ময়। টেনে টেনে জিগ্যেস করল, ছেলে ভালো তো?
–ভালো। এমন গান তুমি কোথা থেকে শিখলে গো?
খুশি। –তোমার ভালো লেগেছে? …তোমার মনখানা ভালো তাই ভালো লেগেছে। কোত্থেকে আর শিখব, আমি কি আর মাস্টার রেখে গান শিখি? বাবা গাইত, কপালী বাবা গায়, শুনে শুনে যে টুকু শেখা যায়, আর মনে যা আসে গেয়ে যাই, আবার ভুলেও যাই–যা গাইছিলাম আবার বললে গাইতে পারব নি।
ঘরে দাঁড়িয়ে অংশুমান শুনছিলেন। হ্যাঁ, ভোরে এই গান শুনে ঘুম ভেঙেছে, ভালো লেগেছে তাতে সন্দেহ নেই, কিন্তু এ ধরনের বোল-চালে বিশ্বাস করার লোক নন তিনি, এমন সুরেলা গলায় টেনে টেনে পদ আর ছন্দ মিলিয়ে গাইছিল, অথচ বলছে ফের গাইতে বললে পারবে না। এটা ভাবের বাহাদুরি ছাড়া আর কিছু ভাবলেন না অংশুমান।
–বড়বাবুকে বলে দিও আমি যাচ্ছি, এরপর রোদ চড়ে যাবে।
সুচারু দেবী ব্যস্ত হয়ে উঠলেন, সে কি! কাল জলটুকুও মুখে দাওনি, আজ এক্ষুনি যাবে কি, আমাদের অকল্যাণ হবে না!
সরল হাসি আর জবাব কানে এলো অংশুমানের।–আমার জন্যি কোনো গেরস্তের কখনো অকল্যাণ হয় না গো দিদি-কিছু ভেবনি।
-না না তা হবে না, আমাকে দিদি বলেছ, কিন্তু আমি তোমার মায়ের মতো দিদি, আমার কথা না রাখলে আমি সমস্ত দিন না খেয়ে থাকব বলে দিলাম
-বড় ঝামেলা করো বাপু, চান করে আবার এই বাসি জামা কাপড় পরব?
–আমি ধোয়া জামা-কাপড় এনে দিচ্ছি।
তা হলে খুব ছেঁড়া-খোঁড়া কিছু দাও, তিন মাইল পথ ঠেঙিয়ে আমি আর ফেরত দিতে আসতে পারবনি।
ছেলে এখনো অঘোরে ঘুমোচ্ছে। অংশুমান সেই খাটেই বসে। স্ত্রীকে ঘরে ঢুকে আলমারি খুলতে দেখলেন। তার এই ভাবাবেগের তিনি খুব দাম দ্যান না, কিন্তু এ নিয়ে খোঁচাখুচিও করেন না। আলমারি খুলে যা-যা নেবার নিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে চোখাচোখি। হাসি দেখেই ভ্রুকুটি।
–সব-কিছু অত তুচ্ছ কোরো না-বুঝলে?
কি নিয়েছেন সেটা এক-রকম আড়াল করেই দ্রুত চলে গেলেন। কিন্তু পরের কথাও অংশুমানের কানে এলেই।
ও-ঘরে রাধার গলায় রাজ্যের বিস্ময়।–শাড়ি সায়া ব্লাউজ সব যে একেবারে নতুন দেখছি–এত ভালো আমি কখনো দেখেছি না পরেছি-বললাম না ছেঁড়া-খোঁড়া কিছু দাও।
স্ত্রীর জবাব, দিদি কি তোকে এক প্রস্থ জামা-কাপড় দিতে পারে না? এত লজ্জা কিসের
লজ্জা! আমি ভিক্ষে করে খাই, আমার আবার লজ্জা! কি ভাগ্যি গো দিদি আজ আমার-কাল রেতে কালামুখোগুলো ও ভাবে বেন্ধে নে গেল বলে মনে খুব দুঃখ হয়েছিল–আর আজ মা কি দেল দেখো।
এঘরে বসে অংশুমান একটু ভুরু কোচকালেন।
স্ত্রীর অতিথিপরায়ণতা এরপর একটু বাড়াবাড়িই মনে হয়েছে অংশুমানের। চান করে আসার পর নিজে ওর চুল বাঁধতে বসে গেছেন। ওদিকে রাধুনিকে হুকুম করেছেন লুচি বেগুনভাজা আর তরকারি করতে। চাকরকে পাঠিয়েছে মিষ্টি আনতে। দু’জনের কথা বার্তাও কানে আসছে।
কালো হলেও কি সুন্দর চেহারাখানা তোর। কী মিষ্টি চোখ মুখ–এভাবে থাকিস কেন?
হাসি।–মা-কালী কালো করেছে বেশ করেছে, এর ওপর হদ কুচ্ছিৎ করলে আরো ভালো হত, নিশ্চিন্তে থাকতাম
-কেন? স্ত্রীর প্রশ্ন।
–বোঝো না? পাঁচ বাড়ি থেকে ডাক আসে, গান গেয়ে ভিক্ষে করে খাইলোকে সন্দ করতে ছাড়ে না পিছনে লাগতে ছাড়ে?
-কেন, তোর কেউ কোথাও নেই? স্ত্রীর গলায় স্নেহ ঝরা উৎকণ্ঠা।
নির্লিপ্ত গোছের সাদা-মাটা জবাব কানে এলো অংশুমানের।– বাবা মা, অনেক বড় দিদি আর একটা ছোট ভাই ছিল। মা ওর ন’বছর বয়সে সগগে চলে গেল, ভাইটা তখন পাঁচ বছরের। ওর থেকে আট বছরের বড় দিদির সবে তখন বিয়ে হয়েছে। বাবা হারমোনিয়াম গলায় ঝুলিয়ে গান গেয়ে যা রোজগার করত তাতেই বেশ চলে যেত। ছ’সাত বছর বয়েস হতে ভাইও বাপের সঙ্গে যেত, দোহার করত, করতাল বাজাতে। কেবল গ্রামে নয়, টেরেনে চেপে তারা হরদম কলকাতায়ও চলে যেত। দু’বছর আগে বাবা আবার বিষম দাগা পেল। পঁচিশ বছরের জোয়ান দিদিটাকে সাপে কাটল, নামী-নামী ওঝা এসেও কিচ্ছুটি করতে পারল না। তা দিদির মনেও সুখ ছিল না, দু’ দুটো সন্তান হয়েছিল, একটা এক বছর বেঁচেছিল আর একটা দেড বছর। শেষে নিজে মরে হাড় জুড়ালো।…পরের বছরই বাপ কলকাতার রাস্তায় গান গাইতে গাইতেই ধুপ করে পড়ল আর মরে গেল। কেবল থাকল ছোট ভাইটা। পনেরো বছর বয়েস হলে কি হবে, বাপ বেঁচে থাকতেই বখাটে হয়ে গেছল, তিন চার মাস না যেতে একদিন সেই যে পালালো আজও ফেরেনি। কপালী বাবা বলেছে ও বদ সঙ্গে পড়ে অনেক দূরে চলে গেছে, ওর আশা আর রাখিসনি। শেষটুকুতে তপতপে রাগের গলা, মা-কালীর রঙ্গ দ্যাখো গো দিদি, এক-এক সময় ইচ্ছে করে ওই সকলকে জিভ টেনে ছিড়ে আনতে।
