তারা ডাক্তারকে নিয়ে সিড়ির দিকে এগোলেন। অংশুমান সামনের দিকে চেয়ে ডাকলেন, এই–কি-যেন নাম তোর…রাধা এদিকে আয়।
সিড়ির ও-পারের অন্ধকার আলসে থেকে রাধা পায়ে পায়ে সামনে এসে দাঁড়ালো। তাকে দেখেই ডাক্তার হতবাক! এ কি কাণ্ড! রাধা, এত রাতে তুই এখানে…থানায়!
জবাব না দিয়ে রাধা হাটু মুড়ে বসে আগে তাকে প্রণাম করল তারপর উঠে দাঁড়িয়ে গম্ভীর মুখে জিগ্যেস করল, আগে বলো ওই খরা জ্বরের রোগীকে তুমি বেশ করে ঠাণ্ডা জলে চান করালে কিনা?
ডাক্তার অবাক। করালাম তো, তাতে কি?
–কিছু না, এটা বড় মেজাজের জায়গা, আমাকে তোমার সঙ্গে নে চলো
হতবুদ্ধির মতো ডাক্তার ঘোষ দম্পতির দিকে তাকালেন। অংশুমান জিগ্যেস করলেন, আপনি তাহলে একে ভালোই চেনেন?
-আমি তো চিনিই, আমার স্ত্রী মানে ওর ‘ডাক্তার দিদি’ নিজের ছোট বনের মতো দেখে কিন্তু ও এত রাতে এখানে কেন?
অংশুমান তখনো সন্দিগ্ধ গলায় বললেন, ও বলছে রাত ন’টায় জঙ্গলের পথে কোন্ থান থেকে একা ফিরছিল, তিনটে ডাকাত তখন ওর মুখ বেঁধে কোথায় নিয়ে গিয়ে তুলেছিল, কোন্ ফাঁকে মা-কালী এক বুড়ী সেজে ওকে মুক্ত করে দিয়ে গেছে
ডাক্তার চৌধুরী থমকালেন একটু, তারপর বললেন, একটু দাঁড়া তুই। সোজা বাবার অংশুমানের ভিতরের ঘরে চলে এলেন। ওঁরা স্বামী-স্ত্রী পিছনে আসবেন জানা কথাই। গলা খাটো করে ডাক্তার জিগ্যেস করলেন, আপনি কি ওকে এখানে এনে বকা-ঝকা করেছেন নাকি?
অংশুমান অপ্রস্তুত একটু। তার স্ত্রী সুচার দেবী চাপা ঝাঝালো গলায় বলে উঠলেন, পুলিশের মেজাজ, বকা-ঝকা করবে না। দোষের মধ্যে আপনি আসার আগে ছেলেকে অত জ্বরে ছটফট করতে দেখে মেয়েটা বলেছিল, ও কিছু না, বেশ করে ঠাণ্ডা জলে চান করিয়ে দাও, তাইতেই উনি ক্ষেপে গিয়ে বললেন, ঘাড় ধরে তোকে রাস্তায় বের করে দেব–আর আপনি কিনা এসেই ও যা বলল তা-ই করলেন। আমার বড় অদ্ভুত লাগছে মেয়েটাকে..কে বলুন তো?
এবারে ডাক্তার চৌধুরী হাসতে লাগলেন। বললেন, অদ্ভুত মেয়েই বটে, আমার অত বিশ্বাসও নেই বুঝিও না, আমার স্ত্রী বরং আপনাকে ওর সম্পর্কে অনেক কথা বলতে পারবেন…তবে ডাকাতে ধরে নিয়ে গেছল যদি বলে থাকে তবে সেটা ঠিক ধরে নিতে পারেন, ও মিথ্যে কখনো বলবে না।
রাগজ্বরের ছেলেকে সত্যি অত ঠাণ্ডা জলে স্নান করানোর ফলে সুস্থ হতে দেখে অংশুমান একটু অপ্রস্তুত হয়েছিলেন। এখানে এরকম হয় জানা থাকলে ওই দাওয়াই বাতলে দেওয়া এখন খুব একটা কৃতিত্বের ব্যাপার ভাবছেন না। স্ত্রীর ভাব-গতিক দেখে গম্ভীর শ্লেষে বললেন, ডাকাতরা ওকে ধরে নিয়ে গিয়ে খালি ঘরে বেধে ফেলে রেখে ফুর্তি করার জন্য দল বেধে চলে গেল আর সেই ফাঁকে মা-কালী বুড়ী সেজে ওকে মুক্ত করল আর রক্ষা করল-এও তাহলে সত্যি ধরে নেব।
ডাক্তার হেসেই জবাব দিলেন, কাকতলীয় কি ঘটেছে তা বলতে পারব না …কিন্তু ওকে নিয়ে কি করা যায়, আমার স্ত্রী তো ছেলে পুলে নিয়ে তার বাপের বাড়ি, একটা রাত আপনাদের কাছে রাখতে খুব অসুবিধে হবে?
ব্যস্ত হয়ে সুচারু দেবী আগ বাড়িয়ে বললেন, আর কিছু অসুবিধে হবে না, আমি খুব যত্ন করেই ওকে রাখব
ডাক্তার আবার বেরিয়ে এলেন, ওঁরাও। সুচারু দেবী রাখার হাত ধরে বললেন, আমরা এখানে নতুন এসেছি বোন, তোমার কথা ডাক্তার বাবুর মুখে এই প্রথম শুনলাম, তোমার সঙ্গে তখন ও-ভাবে কথা বলা খুব অন্যায় হয়েছে, ডাক্তারবাবুর স্ত্রী ঘরে নেই, একটা রাত আমার কাছে থেকে যেতে তোমার কোনো অসুবিধে হবে না
মেয়েটা অংশুমান-গৃহিণীর আপাদমস্তক চোখ বুলিয়ে নিল, তার পর ফিক করে হেসে বলল, মেজাজের ঘরে তুমি যে দেখি আনন্দময়ী গোতারপরেই সংশয়, কিন্তু তোর ওই বড়বাবু ফের জেরা করতে বসে আবার আমাকে গলা ধাক্কা দিয়ে বার করতে চাইবে না তো?
সুচারু দেবী জোরেই মাথা নাড়লেন, না না, আমি তো বলছি!
গম্ভীর মুখে অংশুমান বললেন, কোনো চিন্তা নেই, মা-কালী বুড়ী সেজে তোকে রক্ষা করলেন আজ রাতের মতো না-হয় তাও বিশ্বাস করব।
শ্লেষটুকু স্ত্রীর উদ্দেশে।
ডাক্তার তাড়াতাড়ি বললেন, তোর কোনো ভাবনা নেই, ওঁরা খুব ভালো লোক।-বুঝলি?
কিন্তু বড়বার আগের কথা শুনেই রাধা অসন্তুষ্ট। ডাক্তারকেই ঝাঁঝিয়ে উঠল, তুমি ডাক্তারি করে শরীলের রোগ ধোভালোমল চেনার কত ক্ষ্যামোতা তোমার! তারপরেই দু’চোখ বড়বাবুর মুখের ওপর, যেন ভালো কি মন্দ যাচাই করার ক্ষমতা তার আছে। এবারে হাসিহাসি মুখ, সুচাৰু দেবীর দিকে ফিরল, খারাপ নয় গো দিদি তবে কড়া পুলিশ, বড়বাবুর অবিশ্বাসের রোগ ছাড়াতে তোমার প্রায় জেবন কেটে যাবে।
ডাক্তার চলে যাবার পরে ছেলের জ্বর আরো নেমে এসেছে সুচারু দেবী তার বিচিত্র অতিথি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। কিন্তু মেয়েটা সবরকম তোয়াজের চেষ্টা দু’কথায় নাকচ করে দিল। বলল আমি মেঝেতেই পড়ে থাকি, চাইছ যখন একটা চ্যাটাই দাও, তার বেশি সহ্যি হয় না। না না, খাবার ভাবনা কোরো না, তিন হাবাতে দেহটা ছানাছানি করে বয়ে নিয়ে গেছে-সকালে চানের আগে গলা দিয়ে কিছু নামবে না।
সুচারু দেবী চানের যোগাড় করে দিতে চাইলেন, একটু দুধ খাবার জন্য ঝোলাঝুলি করলেন। রাধা বিরক্ত ‘কেন দিক্ করছ বলো তো?’
অংশুমান স্ত্রীকে ডেকে বললেন, যেমন আছে থাকতে দাও, বেশি বাড়াবাড়ি কোরো না।
