মেয়েটা চকিতে একবার পাইক দুটোকে দেখল। অংশুমান তখন আবার ছেলেকে দেখে আসার জন্য ভিতরের দিকে পা বাড়িয়েছেন। পিছন থেকে মেয়েটা বলে উঠল, ও বড়বাবু, তিনটে নেকড়ের হাত থেকে বাঁচি এলাম, আর ইভেনে এনে আমাকে তুমিই দুটো হাঙরের জেম্মায় রেখে যাচ্ছ। রেতে যে ওরাই আমাকে ছিঁড়ে খাবে!
অংশুমান ঘুরে দাঁড়ালেন। আশ্চর্য, এখানে এসেই থানার ঠিক এই দুটো লোকের সম্পর্কেই গোপন রিপোর্ট পেয়েছেন, চাকরির সুযোগ নিয়ে ওরা গায়ের কয়েকটা মেয়ের সর্বনাশ করেছে ওই দু’জনের চরিত্র অতি মন্দ।
বড়বাবু ঘুরে না দাঁড়ালে রাগের চোটে ওরা হয়তো মেয়েটাকে মেরেই বসত। চোখ লাল করে ওর দিকে চেয়ে রইলো। মেয়েটা আবার বলল, ছেলের জন্য তোমার কোনো চিন্তা নাই গো বড়বাবু, তোমার মুখে শোকের চেহ্নও নাই, তোমার বউ ছেলেমেয়ে আছে, রেতের মতো একটু ঠাঁই দাও পড়ে থাকি, ডাক্তারবাবুটি আলেই বুঝতে পারবে উনি কত ভালবাসেন আমাকে–উনি আসেন বলে–ওনার পরিবার থাকলে আর থানাতক আসতাম না, তার কাছেই থাকি যেতাম।
ডাক্তারবাবুর কথা শুনে দাপটের বড়বাবুটির আরো একটু থমকাতে হল। কি ভেবে বললেন, আচ্ছা আয়
সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে ছোট্ট চত্বরটুকু দেখিয়ে বললেন, এখানে বসে থাক্।
তিনি ভেতরে চলে গেলেন। ছেলে তখনো রাগজরে বেহুশ, কপালে জলপট্টি, আইস ব্যাগের বরফ ফুরিয়ে এসেছে, এত রাতে আরো বরফের খোঁজে যারা গেছে তারা এখনো ফেরেনি। এদিকে এখনো ডাক্তারের দেখা নেই। অংশুমানের স্ত্রী ভয়ে আতঙ্কে অস্থির। হঠাৎ মহিলাকে অবাক মুখে পাশের দিকে চেয়ে থাকতে দেখে অংশুমান ঘুরে দেখেন তার আধ-হাত পিছনে সেই মেয়েটা দাঁড়িয়ে। রেগে উঠতে গিয়েও থমকালেন, কারণ মেয়েটা খুব খুটিয়ে অপলক চোখে তার ছেলেকেই দেখছে।
পনেরো বিশ সেকেণ্ড পরেই খুব নিশ্চিন্ত করার সুরে বলল, কোনো ভয় নাইগো তোমার বড়বাবু, এখার তড়াসে জ্বর, ঠাণ্ডা জল আনি ছেলের সর্ব অঙ্গে বেশ করে ছিটিয়ে দাও জ্বর নামি যাবে।
শোনামাত্র অংশুমানের মাথায় রক্ত উঠল। একশ সাড়ে পাঁচ ছয় জ্বর ছেলের। বলে কিনা ঠাণ্ডা জলে গা ধুয়ে দাও! চাপা হুংকার দিয়ে উঠলেন, তোকে কে এখানে আসতে বলেছে?
ফ্যালফ্যাল করে কয়েক পলক চেয়ে থেকে বেরিয়ে গেল। সিঁড়ির ও-পাশের অন্ধকার দিকটাতে গিয়ে চুপচাপ বসে রইলো।
এর তিন চার মিনিটের মধ্যে ডাক্তার এলেন। অংশুমান হন্তদন্ত হয়ে সর্ধেক সিঁড়ি নেমে তাকে নিয়ে এলেন। ও-দিকের অবস্থা অন্ধকারে কে বসে কেউ খেয়াল করলেন না, অংশুমান তখন ছেলের রোগের কথা বলতে ব্যস্ত। ডাক্তারটির নাম বিজন চৌধুরী, বয়সে অংশুমানের থেকে কিছু ছোট।
ডাক্তার চৌধুরী সমাচার শোনার পর বেশ করে রোগী দেখলেন তারপর বললেন, বড় বালতির এক বালতি ঠাণ্ডা জল আর দুটো বড় তোয়ালে অনিতে বলুন। বড় একটা অয়েল ক্লথও দরকার।
দু’মিনিটের মধ্যে এসে গেল। অংশুমান আর তাঁর স্ত্রী বলেন, অত রাগজ্বর বলে বেশ করে মাথা ধুইয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু তিনি যা বললেন আর করলেন, তারা স্বামী-স্ত্রীতে হাঁ।
ছেলেকে চাপাচুপি দিয়ে শুইয়ে রাখা হয়েছিল, ডাক্তার সে-সব নিজেই টেনে সরালেন, তারপর বললেন, গা থেকে জামা গেঞ্জি সব খুলে নিন, পরনের প্যান্টও।
খোলা হল। ছেলে তখনো বেহুশ, সম্পূর্ণ নগ্ন। এ-কাত ও-কাত করে তাকে অয়েল ক্লথের ওপর শুইয়ে দেওয়া হল। ডাক্তার শার্টের হাত গুটিয়ে একটা তোয়ালে বালতির জলে ডুবিয়ে বললেন, আর এক বালতি ঠাণ্ডা জল রেডি রাখুন তার স্ত্রীকে বললেন, আমি বললেই ওই শুকনো তোয়ালে দিয়ে আপনি মুছিয়ে মুছিয়ে দিয়ে যাবেন।
বালতির ঠাণ্ডা জলে ভোয়ালেটা সপনপে করে ভিজিয়ে অনেক বার মাথা কপাল মুখে বেশ করে চাপড়ে দিলেন, শেষ বারে তোয়ালের জল নিঙড়ে মাথায় মুখে দিলেন। এর নাম স্পঞ্জ নয়, যাকে বলে ভেজা ভোয়ালে দিয়ে ঠাণ্ডা জলে স্নান করানো।
ডাক্তার নিজেই ছেলেকে এ-পাশে টেনে কাত করে বললেন, অয়েল ক্লথটা বেশ করে মুছে ফেলুন তারপর ছেলেকে এর উপুড় করে শুইয়ে দ্বিতীয় বালতির ঠাণ্ডা জলে বার বার তোয়ালে ভিজিয়ে ঘাড় থেকে পিঠ কোমর আর দু’পা পর্যন্ত একই ব্যাপারের মোহড়া চলল। সব হয়ে যেতে শেষ বার শুকনো তোয়ালে দিয়ে আবার সর্বাঙ্গ বেশ করে মুছে দেবার পর অয়েল ক্লথ সরিয়ে দেওয়া হল। গলা পর্যন্ত একটা পাতলা চাদরে ঢাকা হল। ডাক্তার মাথার ওপর পাখাটা কেবল একটু কমিয়ে দিতে বললেন। ছেলে তখন চোখ মেলে চারদিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকাচ্ছে। ব্যাগ থেকে দুটো বড়ি বার করে তাকে খাওয়ালেন। কাগজ নিয়ে একটা প্রেসকৃপশন লিখে বললেন, কালকের মধ্যে রেমিশন হয়ে যাবে আশা করছি, তবু এ ওষুধটা খাইয়ে যাবেন।
আরো মিনিট পনেরো বসে থেকে টেম্পারেচার নিলেন। জ্বর একশ দুই। চেয়ার ছেড়ে উঠে আশ্বাস দিলেন, কোনো ভয় নেই, হীট স্ট্রোকে এখানে এ-কম সাংঘাতিক জ্বর হয়…কালও ঠিক এ ভাবে নয়, ঠাণ্ডা জলে একবার স্পঞ্জ করিয়ে দেবেন আর বাই চান্স জ্বর বাড়লে আমাকে খবর দেবেন।
সাড়ে পাঁচ ছয় জ্বরের রোগীকে ওভাবে সপসপে করে চান করানো আর মোছার সময়েও অংশুমান থেকে থেকে স্ত্রীর দিকে তাকাচ্ছিলেন, স্ত্রী-ও তার দিকে। এখনো দু’জনে দু’জনের দিকে তাকাচ্ছেন। দু’জনেরই বার বার অজানা অচেনা মেয়েটার কথা মনে পড়ছিল।
