ঘোড়ার ডিম পারে, আরে মশাই যখন বলেছিলাম তখন কি এই দিনের মত আপনি এত কাছের কেউ ছিলেন? লেখার আগে আপনি কি হলপ করে নেবেন, যা লিখছি সত্যি লিখছি, সত্যি বই মিথ্যে লিখছি না–না কি আমি গলা বাড়িয়ে দিয়ে বলব, দেখে প্রভুরা, লেখক বানিয়ে কিছু লেখেনি, তোমরা আমাকে বিচারের কাঠগড়ায় এনে দাঁড় করাতে পারে। আমার একটা চুলের ডগাও কেউ ছুতে পারবে না, আর এখানকার মনের অবস্থায় তো আমি যম ব্যাটাকেও কেয়ার করি না।
স্পষ্টই মনে হল আমার শোনার আগ্রহ থেকে তাঁর বলার আগ্রহও কম নয়। আরব সাগরের কূলে হোটেলের দোতলার ঘরে মুখোমুখি বসে শোনার এমন সুযোগ বা পরিবেশ কলকাতায় পাব না।
ভূমিকা হিসেবে আমার প্রথম প্রশ্ন, আচ্ছা জয়নগরের যেখানে আপনি থানার ও সি ছিলেন সেখান থেকে মাতন…মানে যে জংলা গায়ে রাখা থাকে বলেছিলেন, সেটা কত দূর?
–মাইল আড়াই তিন হবে।
…সেখানকার থানার ও সি মানে তো প্রবল দাপট আর প্রতি পত্তির মানুষ, আড়াই তিন মাইল দূরের একটা গ্রাম্য মেয়ে আপনার নাগাল পেল কি করে?
ঘোষ সাহেব হেসে মন্তব্য করলেন, বেশ ধরে বেঁধেই শুরুটা করলেন। তারপর হেসে বললেন, ওর সঙ্গে আমার সত্যি আশ্চর্য ভাবে যোগাযোগ আজ থেকে তেইশ বছর আগে, ওর বয়েস তখন উনিশ…আর সেই বছরেই সবে আমি জয়নগর থানার চার্জ নিয়েছি।
…চৌষট্টি সালের মাঝামাঝি হবে সেটা। আমার তখন বছর চল্লিশ হবে বয়েস, কি কড়া মেজাজের মানুষ ছিলাম তখন আপনি ভাবতে পারবেন না, কিন্তু ওই মেজাজের মাথায় মেয়েটা প্রথম দিনেই একটা থাপ্পড় মেরে বসল।
শুনলাম। মনে দাগ ফেলার মতোই ছোট একট। প্রহসন বটে।
…থানার ও সি অংশুমান ঘোষের এগারো বছরের ছেলে দেবুর হঠাৎ ধুম জ্বর। একশ সাড়ে পাঁচ। রাত তখন প্রায় এগারোটা, গ্রাম দেশের মাঝ রাত। পাইক আর ডিউটির সাব ইনসপেক্টর ক’জন সাইকেল আর জিপ নিয়ে বরফ আর ডাক্তারের খোঁজে ছোটাছুটি করছে। ডাক্তারকে পাওয়া যাচ্ছে না, তিনি নাকি সাইকেলে চেপে পাশের গায়ের এক রোগী দেখতে গেছেন। রাতে ফেরার কথা তখনো ফেরেননি। ডাক্তারের পরিবার কি উপলক্ষে ছেলেপুলে নিয়ে তখন বাপের বাড়ি। রাতে ডাক্তারের ফেরার কথা শুনে দু’জন পাইক সেখানে অপেক্ষা করছিল, সাব ইনসপেক্টর জিপ নিয়ে চলে গেছে সেখানে।
পাইক দুজন ফিরল, তাদের সঙ্গে মাঝবয়সী দু’টো লোক আর এই একটা মেয়ে। অংশুমান তখন ভীষণ উৎকণ্ঠা নিয়ে ডাক্তারের আশায় থানার নিচের দাওয়ায় পায়চারি করছিলেন, আর এক-একবার ছুটে ওপরে গিয়ে ছেলেকে দেখে আসছিলেন।
এত রাতে দুই পাইকের সঙ্গে এই তিনজনকে দেখেই মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে উঠল। এত রাতে কি ব্যাপার?
মাঝবয়সী লোক দুটো হাত জোড় করে যা নিবেদন করল তার সার, তারা অমুক গায়ের লোক, হেঁটে বাড়ি ফিরছিল, কোথা থেকে এই মেয়েটা আলুথালু মূর্তিতে ছুটে এসে বলল, আমাকে বাঁচাও। শুনল তিনটে ডাকাত মুখ বেঁধে আর পিছমোড়া করে হাত বেঁধে ওকে কোন এক দূরে মাঠের ধারে চালা ঘরে নিয়ে গেছল, মা রক্ষা করবে বলেই ওকে ওমনি বেঁধে ফেলে রেখে ডাকাতরা ওকে ঘরের শিকল তুলে দিয়ে মদ কিনতে ছেল। মা-কালী তখন এক বুড়ী সেজে পিদিম হাতে এসে শিকল খুলে ওকে বার কবে দিয়ে বলেছে, শিগগীর পালা। এসে দেখতে না পেলে ও’ আবার তোর পেছনে ছুটবে, বাঁচতে চাস তো মরণ ছোটা ছোট।
লোক দুটো এ শুনেই ভয় পেয়ে গেছে, ওকে নিয়ে যে পথে আসছিল সে-পথেই পা চালিয়ে দিল। তখন মেয়েটা বলল, এ-পথেই আধকোশ (ক্রোশ) এগোলে ডাক্তারবাবুর বাড়ি, খুব চেনা লোক, সেখেনে ছাড়ি দিয়ে চলে যাও। তার কথা মতো সেই বাড়ি এসে শোনে ডাক্তারবাবু ভিন গেরামে, তার পরিবারের সব বাপের বাড়ি– আর সেখানে এই দু’জন পাইক বসে সব শুনে তারা বলল তারা থানার লোক, বড়বাবুব ছেলের অসুখ তাই ডাক্তারের জন্য বসি আছে, এতক্ষণে ডাক্তারকে লিসপেক্টর বাবু জিপে তুলে নে চলে গেছে, ডাকাতের কেস বলছ এতে রতে থানার জিম্মায় রেখে আসাই ভালো –তাই নে এসেছে।
অংশুমান এবার মেয়েটাকে ভালো করে দেখলেন। আঠেরো উনিশ বছরে সোমত্ত মেয়ে, কালো। এপর মিষ্টি মুখ, ডাকাতে ধরে নিয়ে গেছল বলছে, হাত মুখ বেঁধে ফেলে রেখে গেছল-কিন্তু তার চোখে মুখে এখন অন্তত ভয় বা উদবেগের কোনো চিহ্ন নেই।
ভুরু কুচকে জিগ্যেস করলেন, তোর নাম কি?
–রাধা।
–কোথায় থাকিস?
–মাতন গাঁয়ে।
অংশুমান নতুন এসেছে, জিজ্ঞেস করলেন সেটা কোথায়?
–বিষ্টুপুরের পথে।
মেয়েটার কথাবার্তা পরিস্কার আর মুখ দেখে এতবড় বিপদ ঘটেছে বোঝাই যায় না। সন্দিগ্ধ হয়ে উঠলেন, তোর বাড়িতে কে আছে?
-কেউ নাই।
–ডাকাতরা তোকে কখন ধরে নিয়ে গেছল?
–তা এখন দেড় দু’ঘণ্টা হবে।
আশুমান ঘড়ি দেখলেন, তখন রাত এগারোটা। জিগ্যেস করলেন, ডাকাতরা তোকে ঘর থেকে তুলে নিয়ে গেল কেউ টের পেল না?
তা কেন গো, আমি তো বিবি মায়ের স্থান থেকে জাঙল পথে ঘরে ফিরতিছিলাম, সিখেনে ওই তিন ডাকাত ওঁত পাতি ছেল, পলকে মুখ বেন্ধে তুলি নিয়ে চলি গেল, অনেক পথ হাঁটি একটা খেতির ধারের ক’টা খোল ঘরের একটাতে আনি তুলল, তারপর আমাকে পিছমোড়া করি বান্ধি রেখে ঘর বন্ধ করে ফুত্তি করার জন্যি চোলাই আনতি চলি গেল, তখন
পরের কথা অংশুমান আগেই শুনেছেন, আর শোনার ধৈর্য থাকল না। জোরেই ধমকে উঠলেন, ডাকাতে তুলে নিয়ে যাবে বলেই রাত ন’টার পরে একলা মেয়েছেলে তুই জঙ্গল পথে ঘরে ফিরছিলি কেমন? পাইক দুটোর দিকে ফিরে বললেন, একে বাতের মতো কোনো ঘরে ফেলে রাখ–ও কি-রকম ভাঁওতাবাজ মেয়ে কাল বুঝব।
