দুই শয্যায় দু’জনে মুখোমুখি বসে আছি। প্রসঙ্গ বদলে ঘোষ সাহেব জিগ্যেস করলেন, আচ্ছা সেই কালীপুজোর রাতের পর থেকে আমাকে দেখে আপনার কেমন মনে হচ্ছে?
বললাম, আনন্দেই আছেন মনে হচ্ছে।
–আর সেটা মেকি বলেও মনে হচ্ছে তো?
অস্বীকার করতে পারলাম না। তাঁর এ ক’দিনের খোশ মেজাজ সত্যিই অকৃত্রিম ভাবিনি।
ঘোষ সাহেব রয়েসয়ে এরপর যা বলে গেলেন সেটা বিজ্ঞান-যুগের যুক্তিগ্রাহ্য কোনো ব্যাপার তো নয়ই, বিশ্লেষণ করতে বসলে নিছক ভাবাবেগ ছাড়া আর কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না।
…অংশুমান ঘোষের ধারণা, নিজেটের না পেলেও তার এই গলার নোগটা দু’বছর আগে থেকেই শুরু হয়েছে। এ-ধারণাটা হয়েছে যেদিন হুট করে রাধা এক দুপুরে নিজে থেকে বাড়িতে এসে নতুন ডাক্তার দেখানোর তাগিদ দিয়ে গেল।…মোটামুটি দু’বছরই হল (ঘোষ সাহেব। তখন তার কোয়াটার্সএ থাকেন) রাধা থেকে থেকে তার কাছে হাত জোড় করে অদ্ভুত একটা ভিক্ষে চায়। বলে, বড়বাবু, তোমার সব চিন্তা ভাবনা, সব বালাই আমাকে ভিক্ষে দাও। ভাবের কথা ধরে নিয়ে উনি তক্ষুনি হাসি মুখে মাথা নাড়েন, বলেন দিলাম।…একবার রাধা বেশ রাগ করেই বলল, কেবল মুখেই বলো, দাও কোথায়? দিলে তোমাকে নিয়ে আমার মনে ভাবনা জমছে কেন? এ-কথার কোনো অর্থ হয়, অর্থ নিয়ে ঘোষ সাহেব মাথা ঘামাননি।…কিন্তু নতুন ডাক্তার দেখাবার কথা যেদিন বলতে এসেছিল রাধা সেদিন শুধু ওই কথাই বলেনি, দস্তুরমতো রাগ আর অভিমানও করেছিল। বলেছিল, চোখ বোজার আগে দিদি (ঘোষ সাহেবের স্ত্রী) বলে গেল রাধা সব রইলো দেখিস–কিন্তু কাকে দেখব কে আমার কথা শোনে, কতবার হাত জাড কবে ভিক্ষে চেয়েছি, তোমার সব বালাই সব ভাবনা-চিন্ত। আমাকে ভিক্ষে দাও বড়বাবু–কিন্তু কে দেয়, রোগ-শোকের আমিটাও কে ছাড়তে চায়?
সেদিন থেকেই বিজ্ঞান-পড়া মানুষটার মনে ডাক দিয়েছে গলার রাগটা সহজ ব্যাপার নয়।…সহজ যে নয় কলকাতার ডাক্তাররাই তা বলে দিয়েছেন। তাবপব কালীপুজোর রাতে উনি দেখলেন অন্যান্য বারের তুলনায় বাধা অনেক বেশি ভাবের ঘোরে আছে, পুজোয় বসার আগে পর্যন্ত ছেলেমেয়ে জামাই বউ নাতি-নাতনির সঙ্গে কত-রকম ঠাট্টা মস্করা করে, এবারে একেবারে অন্যরকম। শেষে ঘোষ সাহেব সব থেকে বেশি ঝাঁকুনি খেলেন পুজোর পর তার পায়ে মাথা রেখে বাধাকে ও ভাবে কাঁদতে দেখে।…মঙ্গল-প্রদীপের শিখা তাঁর কপালে মাথায় বুকে পিঠে বুলোচ্ছিল যখন তখনো অনুভব করছিলেন ওর ভিতরে কেউ কাঁদছে আর সব আপদ মুছে তুলে নেবার জন্য আকুল হয়ে উঠছে। কিন্তু তারপর পায়ে মাথা রেখে ও-ভাবে কদল যখন, আর কোনো সন্দেহই থাকল না এখানকার টেস্টের ফলাফল কি পাবেন। একশ ষাটের বদলে একশ পঞ্চান্ন দেখেই তিনি বরং অবাক হয়েছেন।
…কিন্তু সেই কালীপুজোর রাতে যুক্তি বুদ্ধি ব্যাখ্যার বাইরে ঘোষ সাহেবের মনে যে ব্যাপারটা ঘটে গেছে সেটা সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছু। রোগের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্কই নেই।
…রোগের লক্ষণ যে আদৌ ভালো নয় সে তত কলকাতার সার্জন আর ডাক্তারের কথা থেকেই বোঝা গেছে।
রাধার কান্নর আসল অর্থটাই তখন তিনি বুঝতে পারেন নি। কিন্তু ওই রাতেই পেরেছেন।
সেই রাতে ঘোষ সাহেবের সামনের ঘরে শোর ব্যবস্থা। কারণ বরাবরই রাধা পুজোর ঘরেই থাকে কি করে, ঘুমোয় কি ঘুমোয় না সে-ই জানে। ঘোষ সাহেবের শুতে শুতে রাত প্রায় সাড়ে বারোটা। বিছানায় গা দেবার দেড় দু’মিনিটের মধ্যে ঘুম।
…হঠাৎ দেখেন, তিনি দাঁড়িয়ে আছেন, রাধা তার পায়ে মাথা রেখে ঠিক তেমনি করেই কাঁদছে। চোখের জলে দু’পা ভেসে যাচ্ছে। ঘোষ সাহেব বার বার বলছেন, ওঠ, ওঠ, রাধা ওঠ, যে ভিক্ষে চেয়ে আসছিস তা এবার আমি তোকে সত্যি দিলাম, আমার সব ভাবনা সব চিন্তা সব দায সব বালাই সব-সব তোকে দিলাম, তুই আমাকে সেই শক্তি দে, নিজের বলে আর যেন কিছু না রাখি।
না, স্বপ্ন-টপ্ন বড় একটা দেখেন না ঘোষ সাহেব সেই বাতে এই এক স্বপ্ন দেখলেন। তখন ভোব-ভোর, একটা হাত আপন থেকেই চোখে উঠল। চোখে জল।
ঘোষ সাহেব বলে উঠলেন, বিশ্বাস করবেন না মশাই, কি যে হয় গেল তার পর থেকে, আমার সমস্ত চিন্তা-ভাবনা হিসেব-নিকেশ যেন এই দেহটার অস্তিত্ব ছেড়ে গেল। এখানকাব রিপোর্ট ভালো পাব না ধরে নিয়েও বিশ্বাস করুন, তাবপ থেকে আমার এতটুকু উদ্বেগ নেই, বিনাইন হলেও ন’ ম্যালিগন্যান্ট হলেও না, বাঁচাব চিন্তাও নেই মরার চিন্তাও নেই, আগে মেযেটাব কথা ভেবে মন খারাপ হত দুশ্চিন্তা হত, তাও গেল।
এই অনুভূতি আমার বোধের অতীত, কিন্তু আমি একটুও অবিশ্বাস করছি না।
জানান দিয়ে হোটেলের বয় আমাদের ডিনার দিয়ে গেল। একটু বেশি সাভিস চার্জ দিয়ে দু’বেই আমরা ঘরে বসে খাই। খেতে খেতে আর একটি কথাও হল না। দু’জনার মুখ পোবার ফাঁকে বেয়ারা ডিশ-টিশ সরিয়ে টেবিল পরিষ্কার করে চলে গেল। জিগ্যেস করলাম, মন হালকা বলছেন, এবারে বেশ আরাম কবে ঘুমোন বোধ হয়?
নিজের শয্যায় বসে পাশ বালিশটা কোলে টেনে নিয়ে অল্প অল্প হাসতে লাগলেন। বললেন, বোধহয় না, আপনার মনে যে সব প্রশ্ন জমে আছে তার জবাব সেরে না নিলে আপনার ঘুম হবে না।
শোনামাত্র আমি ভিতরে ভিতরে কত উদগ্রীব বুঝতে না দেবার চেষ্টা। হেসে বললাম, প্রশ্নতত এক দু’দিনের নয়, অনেক দিন ধরে অনেক প্রশ্ন জমা হচ্ছে…কিন্তু বলতে আপনারই আপত্তি ছিল, বলেছিলেন, কবর খুড়েও আবার তত্ত্ব-তল্লাসী হতে পারে।
