ঘোষ সাহেব গম্ভীর।–নাবালক নিয়ে যাচ্ছেন, ভালো করে শুনে রাখুন চোর ডাকাতের সঙ্গে বন্দুক আর রিভলবার নিয়ে মোকাবিলা করত সে হল অংশুমান ঘোষ…কারো বাবা তো নয়।
মেয়ে হেসে ফেলল।–বেশ। তুমি আর সেই লোক আছ?
.
সকালের প্লেনে যাচ্ছি। বেলা সাড়ে বারোটার মধ্যে পৌঁছনোর কথা। কলকাতার স্পেশালিস্ট ডাক্তার যে ভদ্রলোকের কাছে চিঠি দিয়েছেন পারলে তার সঙ্গে আজই যোগাযোগ করতে বলেছেন।
প্লেন আকাশে ওড়ার আধঘণ্টা খানেক বাদে ঘোষ সাহেব হাসি মুখে আমার দিকে ঘুরলেন।আপনি সেই থেকে কি ভাবছেন বলে দেব?
-কি ভাবছি?
-যে টেস্ট করাতে যাচ্ছি তার রিডিংএ কি বেরুবে–একশ চল্লিশ পঁয়তাল্লিশ ইউনিট না একশ ষাট, বিনাইন না ম্যালিগন্যান্ট।
একটু চুপ করে থেকে জিগ্যেস করলাম, আপনি কি ভাবছেন?
-আমিও এই ভাবছি, তবে একটু অন্যভাবে।
–কি রকম?
হাসছেন।– কালীপুজোর পরে রাধা বরাবরই আমার পায়ে ওই রকম মাথা রেখে প্রণাম করে…ভাবছি, কোনবার কাঁদে না, এবারে ও এত কাঁদল কেন?
ভিতরটা ছ্যাঁৎ করে উঠল। বললাম, ভক্তি আবেগের ব্যাপার, বেশি-কম তো হতেই পারে।
–তা পারে। হাসছেন। আবার টেস্ট-এর রেজাল্ট একশ ষাট বা তার বেশিও হতে পারে…আমি বিজ্ঞান-টিজ্ঞান ভুলে গেছি মশাই।
বেশ নাড়াচাড়া খেলাম। তারপর রাগত সুরেই বললাম, আমি খুব আশা নিয়েই যাচ্ছি, এক বছরের ওপর হয়ে গেল আপনি একই রকম আছেন, আগে থাকতে আমার মেজাজ খারাপ করে দেবেন না।
–ঠিক আছে ঠিক আছে। মুচকি হেসে তিনি জানলার দিকে মুখ ফেরালেন।
মুখে যা-ই বলি আমার মনটা দুশ্চিন্তায় ছেয়েই থাকল।
বম্বে পৌঁছে পরিচিত এক মাঝারি হোটেলে উঠলাম। পরিচ্ছন্ন, ব্যবস্থাপত্র ভালো। পছন্দমতো ডবল-বেডের ঘর পেলাম।
খাওয়া দাওয়া বিশ্রামের পর বিকেলের মধ্যে চিঠি আর রিপোর্ট গুলো নিয়ে দু’জনে বেরুলাম। ট্যাক্সিঅলাকে ঠিকানা বলতে সে সহজেই পৌঁছে দিল।
ভদ্রলোক চিঠিটা ভালো করে পড়লেন। রিপোর্ট দেখলেন না। জানালেন তিনি ডাক্তার নন, ম্যানেজমেন্টের একজন। অ্যাডভাইস আর রিপোর্টগুলো নিয়ে পরদিন সকালে যশলোক হাসপাতালের ওমুক ডিপার্টমেন্টে এসে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে বললেন।
পরদিন ঠিক সময়ে আমরা উপস্থিত। সেই ভদ্রলোক আমাদের যেখানে নিয়ে গেলেন সেখানে দু’জন ডাক্তার বসে। দুজনেই অবাঙালী। অ্যাডভাইস দেখলেন কলকাতার যাবতীয় রিপোর্ট খুটিয়ে পড়লেন। খানিকক্ষণ ধরে গলাও পরীক্ষা করলেন। তারপর চার্ট দেখে দু’দিন পরের ডেট দিলেন, সকালে ওমুক সময় টেস্ট হবে।
এই দুটো দিন রোগ নিয়ে আমরা একটি কথাও বললাম না। এমন কি রাধা প্রসঙ্গেও কোনো কথা নয়। বম্বে শহর ঘোষ সাহেবের কাছে বলতে গেলে নতুন, চাকরি জীবনের শেষের দিকে একবার এসেছিলেন, যে ক’দিন ছিলেন কাজের চাপে নাওয়া খাওয়ার সময় মেলেনি। ঘুরে ঘুরে তাঁকে শহর আর শহরতলী দেখালাম।
যথা সময়ে টেস্ট হয়ে গেল। ঘোষ সাহেবের মুখ দেখে কিছু বোঝা যায় নি, রিপোর্ট হাতে না আসা পর্যন্ত আমারই সংকটের মধ্যে কেটেছে। রিপোর্ট আসার পর অনিশ্চয়তার অবসান ঘটে, কিন্তু এতটুকু সুন্তি বোধ করার কোনো হেতু নেই। ইলেক্ট্রোগ্রাফিক রিডিং একশ পঞ্চান্ন ইউনিট। আর মাত্র পাঁচ বাড়লে ক্যানসার ধরেই নিতে হবে।
ডাক্তার দুটির সঙ্গে আলোচনা করে বোঝা গেল গ্রোথের পোজিশন ‘হাইলি ট্র্যানজিটারি’, তবে একশ পঞ্চান্নতে এসে দীর্ঘকাল থেমে আছে কিনা সেটা আগে আর এ টেস্ট করা হয়নি বলে বোঝ যাচ্ছে না। তাদের মতে যথাযথ চিকিৎসা করে মাস তিন চার বাদে আবার এই টেস্ট করা উচিত, তবে এর মধ্যে যদি গলার ট্রাবল বাড়ে তাহলে আমরা আগেই আবার এ টেস্ট করা উচিত।
আমার প্রশ্ন, একশ পঞ্চান্নয় কত দিন থেমে থাকতে পারে?
তাঁদের জবাব, পাঁচ সাত দশ বছরও একই ভাবে থাকতে পারে আবার পাঁচ সাত মাসও না থাকতে পারে। এ কাউন্ট কমতেও পারে না এমন নয়, তবে যাতে না বাড়ে সে চেষ্টাটাই একমাত্র চিকিৎসা এখন। কি করা উচিত কলকাতার ডাক্তার এই রিপোর্ট দেখে তিনিই স্থির করবেন।
আমার ইচ্ছে করছিল সেই বিকেলের ফ্লাইটেই কলকাতা ফিরে আসি। মন সত্যি বিগড়ে গেছে। কিন্তু ঘোষ সাহেবের অন্য মেজাজ। তিনি আরো দিন তিনেক থেকে যাওয়ার জন্য জোর করলেন। রাতে রসিকতার সুরে বললেন, এখন ফিরে গেলে আপনার মুখ দেখলেই লোকে কিছু একটা বিপদ আঁচ করবে। তারপর একটা বালিশ কোলের ওপর টেনে নিয়ে হাসি হাসি মুখে বলেছেন, আমার মনের কথা শুনলে আপনার বিশ্বাস হবে?
চেয়ে আছি।
কালীপুজোর রাতে রাধার সেই পায়ে মাথা রেখে কামা দেখে আমি ধরেই নিয়েছিলাম এখানকার রিপোর্ট অবধারিত একশ ষাট দেখব। ভেবেছিলাম সে সমূহ কোনো বিপদ দেখছে।
চুপ করে আছি। সমূহ বিপদ নেই সেটা এখনো তো ভাবার মতো কোনো আশ্বাসই নেই। আমার মুখের দিকে চেয়ে ঘোষ সাহেব এটুকু বুঝে নিলেন বোধহয়। আস্তে আস্তে বললেন, সেই রাতে আমার মনের দিক থেকে আরো কিছু ব্যাপার ঘটেছে যার কোনো কারণ নেই যুক্তি নেই ব্যাখ্যা নেই–এমন কি হেসে ওঠার ভয়ে কাউকে সেটা বলার কথাও নয়…মনের এই হঠাৎ ব্যাপারটা যে ঘটছে, ঘটেছে, সেটা অস্বীকার করি কি করে?
আমি আগ্রহ নিয়েই চেয়ে আছি। নিজে বিশ্বাস করি বা না করি, আমার জানার বাইরে, জ্ঞান বুদ্ধির বাইরে, বিশ্বাসের বাইরে পৃথিবীতে কত কি যে ঘটে যাচ্ছে সে-তে অস্বীকার করার নয়।
