আমি হেসে বললাম, আপনারই সবার আগে গ্লানি ধুয়ে গেল, মুক্তি হয়ে গেল।
-আপনি ঠাট্টা করছেন…? কাঁদ কাঁদ মুখ।
আমি ঠাট্টা করছি না।
খানিক বাদে কপালী বাবাকে আর দেখলাম না। তার পুজোর কিছু বুঝিওনি মুগ্ধ হইনি। তবু একটু আলাপ করার ইচ্ছে ছিল। শুনলাম, তার ফেরার জন্য ট্যাক্সি মজুত ছিল, চলে গেছেন। আগে নিজের ঘরের জংলী কালীর পুজো সারবেন, তারপর সমস্ত রাত শ্মশান কালীর পুজো।
৩. ঘোষ সাহেবের বাড়ি
ঘোষ সাহেবের বাড়ির এই পুজো দেখে সকলেই অভিভূত, মুগ্ধ। বলা বাহুল্য, এটুকু, শুধু নাম গান আর পরিবেশ গুণে। পুজো কারো মন কাড়েনি, ওই পটের প্রতিমাও না। মন কেড়েছে রাধা, যাকে মায়ের মেয়েই ভাবছে সকলে।
খাওয়া-দাওয়ার পর্ব সেরে ঘরে ফিরতে রাত এগারোটা। ঘোষ সাহেব চুপি চুপি এক ফাঁকে বলে রাখলেন, আপনার কাল দুপুরেও নেমন্তন্ন, অবশ্য আসবেন.. ফাইন্যাল রাউণ্ড এখনো বাকি ভুলে যাবেন না।
এক ঘুমে রাত কেটে গেল। সকাল থেকেই মন টানছিল। তবু সাড়ে এগারোটা পর্যন্ত অপেক্ষা করে গিয়ে হাজির হলাম। সকলেই ওই পুজোর ঘরে জমায়েত তখন। সকলে হাসি মুখে অভ্যর্থনা জানালো। রাধা বেদীর কাছে দেয়ালে ঠেস দিয়ে বসে। কালীর পট এরই মধ্যে আবার দেয়ালে উঠে গেছে। বেদীর ওপর। একটা মঙ্গল ঘট, তাতে বিল্বপত্র। খাট সরানো হয়েছিল, সেটাও আবার যথাস্থানে।
ঘোষ সাহেব জিগ্যেস করলেন, রাধার পুজো কেমন লাগল আগে বলুন।
সঙ্গে সঙ্গে মুখে একটু বিরক্তি ভাব এনে, রাধা বলল, বড়বাবু তুমি বড় দিক্ করো–
ঘোষ সাহেবের পাশে বসে বললাম, আমি তো-পাপী-তাপী মানুষ, তবে ভালোই লাগলো…
রাধার ঠাণ্ডা দু’চোখ সঙ্গে সঙ্গে সোজা আমার মুখের ওপর। মনে হল কিছু দেখে নেবার ছিল দেখে নিল। তারপর মন্তব্যের সুরে বলল, মনে অহংকারের ঠাঁই রেখোনি বাপু।
সকলেরই সজাগ দৃষ্টি। একটু অপ্রস্তুত মুখে ঘোষ সাহেব জিগ্যেস করলেন, এর অহঙ্কারের কি দেখলি?
জবাব, উনি পাপের কি জানেন তাপেরই বা কি জানেন? জগাই মাধাই পাপী ছেল? না তাপী ছেল? জাহির করাটাই অহংকার।
কে কি বুঝল জানি না, আমি অন্তত বুঝলাম না। তার মানে জগাই মাধাই হলেও উদ্ধার পেয়ে যাব বলছেন?
হাঁ হয়ে চেয়ে রইলো একটু।-ও বড়বাবু তোমার বন্ধু যে আমাকে আপুনি আজ্ঞে করে কথা বলছেন গো! আমার দিকে ফিরল। বলি, রাধা কত মানী, না ঘুঁটে-কুড়নি রানী! আপনি-টাপনি করে কাজ বাড়ায়ো না বাবু।
হেসে বললাম, তাই না হয় হল, কিন্তু আমার কথার জবাবটা কি?
-কি আর, পাপ করার খ্যামোতা নেই যাদের তারাই পাপী পাপী বলে ডাই করে।
পিছনে লাগার সুরে ঘোষ সাহেব বললেন, সে ক্ষমতা ছিল বরং আমার–কি বলিস?
ঘরের সকলেই মজা পাচ্ছে, হাসছে। শমী বলল, বাবা তুমি কেন রাধা মাসিকে রাগাচ্ছ
কালো মুখের এটুকু বড় সুন্দর, তার থেকেও সুন্দর টানা চোখের সরল চাওনি। কাল এই দু’চোখই ভাবে একেবারে অন্যরকম দেখেছি। এখন কৌতুকের ছোঁয়া দেখছি। শমীর দিকে ফিরল, রাগব কেন, মিথ্যে তো নয়, তোর বাপের ছেল ক্ষ্যামতা বিসর্জন দেবার লড়াই, সে-লড়াইয়ে জিতেছে, ক্ষ্যামতা নাশের ক্ষ্যামতা কম কথা নাকি।
ঘোষ সাহেবের তৎক্ষণাৎ রণে ভঙ্গ দেবার মুখ। দোর গোড়ায় হীরুও সেই থেকে দাঁড়িয়ে। তাকেই তড়পে উঠলেন, গদগদ হয়ে কেবল তোর মা-কেই দেখবি না আমাদের খেতে-টেতে দের কথা ভাববি? সে ছুট লাগাতেই কিছু যেন মনে পড়ল, আমার দিকে ফিরলেন, ভালো কথা আপনি বোম্বাই উড়ছেন কবে?
দিন বললাম। মাঝে চার দিন বাকি।
–টিকিট করা হয়ে গেছে?
হয়ে গেছে তিনিও জানেন। বললাম, আজ বিকেলের মধ্যে করে নেব-পেয়ে যাব।
ঘোষ সাহেব ছেলেমেয়ে জামাইদের দিকে ফিরলেন। বললেন, উনি যাচ্ছেন বলেই বোধ হয়…আজ সকালেই মনে হচ্ছিল বছরে পর বছর একই জায়গায় পড়ে আছি, এই মওকায় ওঁর সঙ্গে একটু ঘুরে এলে কি হয়?
সকলেই ভেবাচাকা খেল, এমন প্রস্তাবের জন্য কেউ প্রস্তুত নয়। কি বলবে ভেবে না পেয়ে শমী তার রাধা মাসির দিকে তাকালো। সঙ্গে সঙ্গে ঘোষ সাহেব রাধাকেই জিগ্যেস করলেন, তুই কি বলিস…ইচ্ছে যখন হচ্ছে একবার ঘুরেই আসি? তারও জবাব পাবার আগে আমার দিকে ফিরলেন, আপনার অসুবিধে হবে না তো মশাই?
ঘাবড়ে যাওয়া মুখ করে বললাম, ইচ্ছেটা আপনার নিজের খরচে ত?… আমার যাতায়াতের ব্যাপারটা অন্যের ঘাড়ে…
ঘোষ সাহেব হাসিমুখে দাবড়ানি দিয়ে উঠলেন, আপনার ঘাড়ে যেতে আমার বয়ে গেছে–রাধা কিছু বলছিস না যে, মত নেই নাকি?
রাধার শান্ত মুখ। তাঁকেই জিগ্যেস করলেন, বাবুটি কি কাজে যাচ্ছেন?
আমি নিষ্কৃতি পেলাম, শমীই সোৎসাহে তাকে বম্বে যাবার হেতু বোঝালো। শোনার পরেও নির্লিপ্ত। ঠাণ্ডা দু’চোখ এবারে আমার দিকে।–কত দিনের জন্য যাওয়া?
বললাম, কাজ এক দু’দিনেই হয়ে যেতে পারে, যাচ্ছি যখন পাঁচ সাত দিন কাটিয়ে আসার ইচ্ছে…তবে এর জন্য দুশ্চিন্তা করে যদি আগেও ফিরতে পারি
আস্তে আস্তে মাথা নাড়ল। একটুও দুশ্চিন্তা নেই, এখেনে একঘেয়ে লাগারই কথা, যাচ্ছ যখন ভালো করে দেখিয়ে শুনিয়ে নিয়ে এসো, ফেরার তাড়া কোরো না
আমি মনে মনে হাঁপ ফেলে বাচলাম। এরপর মেয়ে-জামাই ছেলে-বউ সকলেই খুশি। তাদের প্রিয়জন অনেক কাল বাদে একটু বাইরে ঘুরে আসতে যাচ্ছেন। খেতে বসে শমী তত তার বাবার অভ্যেস টভ্যেস সম্বন্ধে অনেক কথাই আমাকে সমঝে দিতে চেষ্টা করল।
