কপালী বাবার আবার সেই নিঃশব্দ মন্ত্রহীন হাত আর কর-মুদ্রার পূজা। ত্রিশূল হাতে হঠাৎ একবার আসনে উঠে দাঁড়ালেন, প্রতিমা পটকেই বিদ্ধ করবেন এমন ভাব আর মূর্তি। তার পরেই ত্রিশূল ফেলে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে আত্মসমর্পণ। উঠে বসতে সময় লাগল।
হারমোনিয়ামে সুর উঠল। খঞ্জনির মৃদু ঝুম ঝুনা রাধা দুলছে।
চিন্তামনি তারা তুমি, আমার চিন্তা করেছ কি?
নামে জগৎ-চিন্তাময়ী, ব্যাভারে কই তেমন দেখি।
প্রভাতে দাও বিষয় চিন্তে, মধ্যাহ্নে দাও জঠর চিন্তে
ও মা শয়নে দাও সর্ব চিন্তে, বল মা তোরে কখন ডাকি।
পুজো সাঙ্গ কিনা বুঝলাম না, কারণ কপালী বাবা তার আসনে স্থির বসে। রাধা থামছে, ভাবের ঘোরে দুলছে, আবার গান ধরছে। কোনোটা দু’লাইন কোনোটা চার লাইন, ভাবের আবেগেই আত্মবিস্মৃত হয়ে থেমে যাচ্ছে মনে হয়, ঘোর ভাঙতে নতুন গান ধরছে।
জানোরে মন, পরম কারণ, শ্যামা তো শুধু মেয়ে নয়
মেঘের বরণ করিয়ে ধারণ, কখনো কখনো পুরুষ হয়।
কভু বাঁধে ধরা কভু বাধে চূড়া ময়ুরপুচ্ছ শোভিত তায়
কখনো পার্বতী কখনো শ্ৰীমতী, কখনো রামের জানকী হয়।
হয়ে এলোকেশী করে লয়ে অসি দনুজদলে করে সভয়।
জগৎ জুড়ে জাল ফেলেছিস, শ্যামা কি তুই জেলের মেয়ে
তোর মায়ার জালে, মহামায়’, বিশ্বভুবন আছে ছেয়ে।
‘দয়াময়ী মা যদি হইতে তুমি;
শিব কেন নিলেন শ্মশান ভূমি।
কত যন্ত্রণা জ্বালা দাও তুমি মা
শ্মশানবাসিনী মা দিন তারিণী।
‘মাতিয়ে দে মা আনন্দময়ী, একেবারে মেতে যাই,
তেমন করে মাতিয়ে দে মা, যেমন মেতেছিল রাই।
দেশে দেশে গ্রামে গ্রামে, তব নাম সুধা পানে,
ও মা মাতৃক যত নরনারী দেখে শুনে প্রাণ জুড়াই।
‘যে ভালো করেছ কালী, আর ভালতে কাজ নাই,
ভালয় ভালয় বিদায় দে মা আলোয় আলোয় চলে যাই।
শেষ হল না, আর্ত রব তুলে পটের সামনে লুটিয়ে পড়ল। পড়েই থাকল। মেয়েরা কেউ কেউ ফুঁপিয়ে কাঁদছে। আমার মনে হল বড় শান্তি আর বড় আনন্দের কান্না। লক্ষ্য করলাম ভটচায মশাই আর রায় মশাইরও চোখ ঝাপসা।
কপালী বাবা রাধার মাথায় পিঠে কমণ্ডলুর জল ছিটোতে লাগলেন। খানিক বাদে রাধা আস্তে আস্তে আবার উঠে বসল। আর দুলছে না। স্থির নিশ্চল। .
কপালী বাবা প্রদীপ আর চামর দুলিয়ে সংক্ষেপে আরতি পারলেন। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে শান্তি জল ছিটালেন। হল-এর পাশের ঘরে আর বারান্দায় যারা তারাও তাঁকে ডেকে ডেকে শান্তি জল মাথায় নিল। উনি আবার আসনে ফিরে আসতে রাধা আস্তে আস্তে উঠে ঘুরে দাঁড়ালো। তারপর সকলকে সচকিত করে ডাকল, বড়বাবু এখানে এসো।
ঘোষ সাহেব উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর পরনে গরদের ধুতি, গায়ে হাফ-হাতা পশমী গেঞ্জি। গরদের ধুতির কোঁচা চাদরের মতো গায়ে জড়ানো। পটের সামনে গিয়ে জামু আসনে বসলেন। কপালী বাবা তাঁর কপালে লম্বা করে সিঁদুর টেনে দিলেন। কালীর পটের পা থেকে ফুল তুলে নিয়ে মাথায় রেখে কিছু মন্ত্র পড়লেন হয়তো। তারপর ওই ফুল গেঞ্জির গলার দিক টেনে বুকে রাখলেন। রাধা এবারে মঙ্গল প্রদীপ তুলে নিল। অন্য হাতের তালু প্রদীপের শিখার ওপর রেখে সেই তপ্ত হাত তার মাথায় বোলালো। এ-রকম করে আগুনের তাপ নিয়ে নিয়ে তিন বার মাথায় কপালে, তিন বার বুকে আর তিন বার পিঠে বোলালো।
ঘোষ সাহেব উঠ আস্তে আস্তে ফিরে এলেন। ঘরের সকলের সেই মঙ্গল শিখার স্পর্শ মাথায় নেবার হিড়িক পড়ে গেল। রাধা প্রতিবার শিখার ওপর হাতের তালু রাখছে আর একজনের মাথায় সেই হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। দেখলাম, নিঃশব্দে অমর গাঙ্গুলীও মাথা পেতে দিলেন। ঘরের সকলের শেষ হতে বারান্দায় ডাক পড়ল। সেখানে আশিস-তাপ নেওয়া শেষ হতে সামনের ঘরে। শেষে সামনের ঘর থেকে হলঘরে। সক্কলের মাথায় প্রদীপ শিখার তাপ বোলানো হতে হাসি-ছোঁয়া গম্ভীর মুখে অংশুমান ঘোষ তার সামনে এসে দাঁড়াল।-আগে তোর হাতখানা দেখা, কতটা পুড়ল দেখে নি।
রাধা হাত দেখালো না, মুখের দিকে একটু চেয়ে থেকে পুজোর ঘরের দিকে এগোতে গেল।
দাঁড়ারে মা, আগে, আমারটুকু সেরে নিই।
ঘোষ সাহেবের মুখে এই মা-ডাক আর ‘তুই বলে কথা আমিও এই প্রথম শুনলাম। রাধা দাঁড়িয়ে গিয়ে আবার তার দিকে তাকালো। স্থির হয়ে দাঁড়ালো। হাত দুই তফাতে এসে ঘোষ সাহেব আবার মাটিতে জামু আসনে বসলেন, তারপর উপুড় হয়ে মাটিতে মাথা রেখে প্রণাম করলেন পনেরো বিশ সেকেণ্ড ধরে।
রাধা হাতের প্রদীপ পাশের একজনের হাতে দিল। ঘোষ সাহেব উঠে দাঁড়াতে শাড়ির আঁচল গলায় জড়িয়ে নিল। ঘোষ। সাহেব মাটিতে মাথা রেখেছিলেন, কিন্তু রাধা এগিয়ে এসে হাঁটু মুড়ে বসে তার দু’পায়ের ওপর মাথা রাখল, দু’হাতে পা দুটি জড়িয়ে ধরে থাকল। ঘোষ সাহেব বিড়বিড় করে বললেন, ওঠরে মা ওঠ,
উঠতে দেখলাম তার দু’পাই চোখের জলে ভেজা।
আমি ভক্ত নই, বিশ্বাসের গর্বও নেই, কিন্তু অভিভূত হবার ব্যাপারে কোনো ইচ্ছে বা যুক্তির ব্যাপার নেই এটুকু অনুভব করতে হল। এরপর প্রণামের ঘটা। কোথা থেকে প্রথমেই হীরু এসে রাধার পায়ে পড়ল। তার পিছনে ঘোষ সাহেবের ছেলেমেয়ে ছেলের বউ নাতিনাতনিরা আর প্রতিবেশিনীদেরও অনেকে দাঁড়িয়ে।রাধা নিচু জাতের মেয়ে শুনেছিলাম। এখানে জাতের বিচার কেউ করছে না।
পায়ে পায়ে সামনের বারান্দায় চলে এলাম। কোণ ঘেঁষে চুপচাপ অমর গাঙ্গুলী ঘুরে দাঁড়িয়ে। আমার হাত দুটো চেপে ধরলেন। ধরা গলায় ফিসফিস করে বলে উঠলেন, আমার কি হবে মুখুজ্জে মশাই –ওদের দুজনকে নিয়ে আমরা কি না বলেছি।
