[৫৩ পৃষ্ঠার শেষাংশ এবং ৫৪ নং পৃষ্ঠা মিসিং]
কোন্ গল্প? ওরা তো আপনার ক’টা ভালো ভালো গল্পের সর্বনাশ করেছে, ট্র্যাজেডিকে কমেডিতে ঘুরিয়ে দিয়েছে–
ঢোঁক গিলে জবাব দিলাম, ওদের একটা আইডিয়া নিয়ে আলোচনা, পছন্দ হলে লিখে দেব।
বউমা ঊর্মিলার মন্তব্য, সে-ও ভালো, অমন সুন্দর গল্পগুলোকে উল্টেপাল্টে দিলে এতে খারাপ লাগে–
–আপনার প্লেনে আসা যাওয়া হোটলে থাকা খাওয়া সব খরচ এঁদের? শমীর জানার আগ্রহ।
বললাম, এ-সব খরচ ওঁদের কাছে কিছুই না।
–অন্য যে-সব ছবি হয়েছে, আপনাকে যেতে হয়েছে?
–একবার ছেড়ে দু’তিন বারও যেতে হয়েছে।
–বেশ মজা তো…কিন্তু ওদের আইডিয়া মানে তো মারামারি রক্তারক্তি কাণ্ড, আপনি কি সেই গল্প লিখবেন নাকি?
এ প্রসঙ্গ থামলে বাঁচি। বললাম, আমি কোন্ ধাঁচের লেখক ওরা জানে, সে-রকম আইডিয়া হলে আমাকে ডাকত না। কিছু মনে পড়তেই যেন ঘড়ি দেখলাম আর সঙ্গে সঙ্গে উঠে পড়লাম, এক ভদ্রলোকের আসার কথা আছে, চলি–
সঙ্গ দেবার আছিলায় ঘোষ সাহেবও উঠলেন। নিচে নেমে ঠাট্টার সুরে বললেন, আপনি যে ফাস্ট রাউণ্ডেই ঘেমে গেলেন দেখছি, ফাইন্যাল রাউণ্ডে কি করবেন?
হেসে জবাব দিলাম, আপনি যে জার্সিটা গায়ে চড়ানোরও সুযোগ দিলেন না…তা ছাড়া এমন সত্যি কথাগুলো একেবারে পুজোর ঘরের প্রতিমার সামনে বসে!
হাসতে লাগলেন।–আমি কে বলুন, সকলি তোমার ইচ্ছে, ইচ্ছাময়ী তারা তুমি…আঃ, জাস্ট দি রাইট প্লেস ফর এ ভেরি ভেরি অনেস্ট লাই।
জয় হর, মনোরমা জয় শিবরানী
জয় দুর্গা জয় কালী মা ভবানী।
জয় মহাকালী তারা জয় মা ষোড়শী
জয় মা ভুবনেশ্বরী ত্রিতাপ নাশিনী।
ভৈরবী ছিন্নমস্তা ধূমাবতী বগলা
মাতঙ্গী কমলা দুর্গতিনাশিনী
জয় হর মনোরমা জয় শিবরানী।
.
দেয়াল ঘেঁষা বেদীর ওপর কালীর ফোটোখানা বসানো হয়েছে। তারপর এতবড় ঘরে তিন ভাগের এক ভাগ জুড়ে পূজার উপকরণ। ধূপ-ধুনো আর ফুলের গন্ধে বাতাস ভরপুর। পুজারীর আসনে রক্তাম্বর বসনে যে মানুষটি বসে তিনিই কপালী বাবা। নোগা লম্বা, বুক-পিঠ সমান কাঁচা পাকা চুল দাড়ি। বয়েস ষাট হতে পারে আশিও হতে পারে। গলায় রুদ্রাক্ষের মালা, দুই বাহুতে রুদ্রাক্ষের বলয়, কপালে সিঁদুর লেপা। পুজোর আসনে পাথর মূর্তির মতো বসে আছেন। তাঁর বাঁ দিকের আসনে বসে রাধা, স্নান-সারা ভিজে চুল পিঠে ছড়ানো। পরনে গরদের থান, গায়ে শেমিজ। আসনে বসার আগে ঘণ্টাখানেক ধরে তাকে লক্ষ্য করছি। এত কাছ থেকে বয়েস অব সাতাস আঠাশ মনে হয় না, বিয়াল্লিশও মনে হয় না তা’বলে। তেত্রিশ চৌত্রিশ ভাবা যেতে পারে। কাছ থেকে দেখে সব থেকে ভালো লেগেছে তার চোখ দুটো। প্রথম যখন দেখি, স্বচ্ছ টলমলে। ঘোষ সাহেব আলাপ করিয়ে দিতে সোজা যখন মুখের দিকে তাকালো, মনে হল আমারও অজানা অন্তঃপুরে ঘুরে এলো। অথচ বড় স্নিগ্ধ আর ঠাণ্ডা সেই দৃষ্টি। তারপর যত দেখছি মনে হয়েছে সে যেন সকলের মধ্যে থেকেও নেই, ভাবের ঘোরে সকলের কাছ থেকেই দূরে সরে যাচ্ছে।
তার পাশে একটি মেয়ে হারমনিয়াম নিয়ে বসে, ও-পাশে আর একটি মেয়ের হাতে দুটো কাঠের খঞ্জনি। হঠাৎ সকলকে চমকে কপালী বাবা তিন বার রব তুললেন, কালী! কালী! কালী!
হলঘর সামনের ঘর আর বারান্দা মেয়ে পুরুষে ঠাসা। কপালী বাবার ডান পাশের দুটি মেয়ের হাতে শখ আর ঘণ্টা বেজে উঠল। তারা থামতেই দেখা গেল আসনে বসে রাধা অল্প অল্প ডাইনে বাঁয়ে দুলছে। পাশের মেয়ে হারমোনিয়ামের বিড চেপে একটা টানা সুর ধরে রাখল, খঞ্জনির মৃদু ধ্বনি উঠল।
তারপর রাধার ওই গান, জয় হর-মনোরমা জয় শিবানী, জয় দুর্গা জয় কালী জয় মা ভবানী..
গানও নয়, টানা সুরের স্তবও নয়, কিন্তু এমন কিছু যা দেহের কণায় কণায় রোমাঞ্চ তুলে মনের গভীরে এসে স্থির হয়। নিটোল মিষ্টি গলা, সুরের কুশলী বিন্যাস নেই, আছে কেবল আবেগ-বিহ্বল বিশ্বাসের জয়ধ্বনি তুলে ঘরে বাইরে বারান্দায় যে-যেখানে আছে তাদের মনগুলোকে জড়ো করে এই ষড়ৈশ্বর্যের বেদীমূলে আকর্ষণ করার সহজ মহিমা।
এবারে রাধা নিশ্চল। কপালী বাবার দেবী-পূজা শুরু। তাঁর পূজায় কণ্ঠস্বর নেই, বাণী নেই, মন্ত্র নেই। থাকলেও সেটা দর্শকের কানে অশ্রুত। এক একরকমের হাতের মুদ্রা আঙুলের মুদ্রা, পটের পায়ে ফুল-চন্দন ছোঁড়া, কখনো ক্রুদ্ধ, কখনো সমর্পণে আনত। তারপর আবার স্থির নিশ্চল।
হারমোনিয়ামে সুর উঠল। খঞ্জনির মৃদুধ্বনি। রাধা অল্প অল্প দুলছে। সকলে আগ্রহে উন্মুখ আবার। এবারের গানে আর এক সুর, আর এক ভাব আর এক রস।
শ্মশান তো ভালবাসিস মাগো,
তবে কেন ছেড়ে গেলি?
এত বড় বিকট শ্মশান আর তুই কোথা
পেলি?
দেখ সে হেথা কি হয়েছে,
কোটি কোটি শব পড়ে আছে
কত ভূত বেতাল নাচে, রঙ্গে ভঙ্গ করে
কেলি।
ভূত পিশাচ তাল বেতাল,
নাচে আর বাজায় গাল,
সঙ্গে ধায় ফেরুপাল, এটা ধরি ওটা ফেলি।
আয়না হেথা নাচবি শ্যামা
শব হবে শিব পা ছুঁয়ে মা,
জগৎ জুড়ে বাজাবে দামা।
দেখবে জগৎ নয়ন মেলি।
(এমন শ্মশান কেন মা ছেড়ে গেলি।)
অনুযোগের সঙ্গে করুণ বিদ্রুপের মিশেল, কিন্তু প্রাণের আকৃতি আবেগে ভরপুর। আমার এপাশ ও-পাশে অমর গাঙ্গুলী, ভটচায মশাই রায় মশাই আর কন্টাকটর দত্ত সাহেব বসে। লক্ষ্য করছি তাঁরাও নির্বাক, অপলক।
