তাড়াতাড়ি বাধা দিলাম, অত দরকার নেই, শুধু ভদ্রলোক ক’জনকে বললেই হবে–
–থামুন তো মশাই, হেসেই দাবড়ানির সুরে বললেন, আপনার প্রেস্টিজ এখন আমার নিজের প্রেস্টিজের থেকেও ঢের বড়, আপনি একটুও ইতস্তত করবেন না।
এভাবে বলা সত্ত্বেও বিব্রত বোধ করছি। যে-যে কারণে এ ব্যাপারে আমার নাক গলানো তা ব্যক্ত করার নয়। বললাম, প্রেস্টিজের কোনো ব্যাপার নয়, এরা আপনাকে একটু দাম্ভিক ভাবেন সেটা আমার পছন্দ নয়।
–আপনার পছন্দ না হলে কি হবে, ঠিকই তো ভাবেন। এত মাস হয়ে গেল রিটার্ন ভিজিট দেবার ভদ্রতাটুকুও স্বীকার করিনি, আমাকে দাম্ভিক ভাববেন না তো কি বিনয়ী বোষ্টম ভাববেন?
হেসে ফেললাম।–তাহলে এমন জ্ঞানপাপীই বা হতে গেলেন কেন?
অসুখ-টসুখের চিন্তা আপাতত উবেই গেছে মনে হয়। হাসছেন।—তাহলে সত্যি কথাটাই আপনাকে বলি, পুলিশের লোক তো, এখানে আসার এক মাসের মধ্যে কে কি লোক আর কোন্ ভাবের লোক ঘরে বসেই সেটা আমার জানা হয়ে গেছে–আর স্বভাবখানাও তেমনি হয়েছে এখন, মন না টানলে লোক-দেখানো গলাগলি আর করতে পারিনে।
কথাগুলো ভালো লাগছে, তাই আমার নাক গলানোটা আরো খারাপ লাগছে। বললাম, তাহলে এখনো বাদ দিন–
–ফের এই কথা! রাগত মুখ।–আমার ভুলটা শুধরেছেন বলে আমি কত খুশি বুঝতে পারছেন না?
.
পরদিন সকালে হাঁক-ডাক করে সাড়া দিয়ে অংশুমান ঘোষ হাজির। আমার স্ত্রীকে ডাকিয়ে বাড়ির সক্কলকে এমন কি কাজের লোকদেরও নেমন্তন্ন করলেন। বললেন, আমি বলে গেলাম, এরপর মেয়ে এলে তাকেও পাঠাব–
জোরালো গাম্ভীর্যে বলে উঠলাম, তাহলে নেমন্তন্ন নট অ্যাকসেপ্টেবল হয়ে যাবে, আপনি আপনার বারান্দায় দাঁড়িয়ে ডেকে নেমন্তন্ন করলেও আমরা দল বেঁধে যাব।
-থ্যাংক ইউ। বউঠান এবার আমাদের চা পাঠান।
স্ত্রী চলে যেতে উনি পকেট থেকে এক গোছা একশ টাকার নোট বার করে বললেন, আমার দ্বারা তো হবে না, আপনি প্লেনের দু’খানা টিকিট কেটে ফেলুন–ডেট ওপেন রেখে রিটার্ন টিকিট করে নেওয়াই ভালো।
বিব্রত মুখে বললাম, বেড়ানো ছাড়া হয়তো সত্যি কিছু কাজও করে আসতে পারব–আপনার টিকিটের টাকাটাই শুধু দিন।
পুলিশের গরম চোখ দেখার সুযোগ কমই হয়েছে। ঠায় চেয়ে রইলেন খানিক। তারপর বেশ ধীর মোটা গলায় বললেন, এসময় আপনাকে খোয়ানো মানে আমার দিক থেকে কতটা খোয়ানো সেটা জেনেও আপনি আমাকে সেই দিকে ঠেলবেন নাকি?…আপনি যাবেন কি যাবেন না সেটাই আগে ভেবে ঠিক করুন তাহলে।
তাড়াতাড়ি হাত বাড়ালাম।–ঠিক আছে দিন, কিন্তু অত খরচ করে প্লেনে যাবার কি দরকার? তাড়া তো কিছু নেই, ট্রেনে ফার্স্ট ক্লাসে গেলেই তো হয়?
–না মশাই, এখন পুজোর মেজাজে আছি, তারপর আর সইবে না, তাছাড়া আপনার প্ল্যানেও ফাঁক থেকে যাবে..আপনার ফিল্ম প্রোডিউসাররা আপনার জন্য প্লেনের ভাড়া গোনে না ট্রেনের? হাসতে লাগলেন, আর একটা ব্যাপার কি জানেন, আমার লেট ফাদার তাঁর একমাত্র ছেলের জন্য এতই জমিয়ে রেখে গেছেন যে পরের দু’পুরুষ কিছু না করেও পায়ের উপর পা তুলে কাটিয়ে দিতে পারত…কিন্তু ভদ্রলোক যত বড় চাকরিই করুন সাদা রাস্তায় অত টাকা হয় না, আমরা দু’দশ বার প্লেনে সমস্ত ভারতবর্ষ ঘুরলেও সেই বিত্ত খুব বেশি হালকা হবে না…তবু যতটুকু হয় ততটুকুই হালকা বোধ করব।
দ্বিরুক্তি না করে টাকাগুলো নিলাম। হেসে বললাম, বাপ না পারুক ছেলে তো এ ব্যাপারে পুলিশের মুখ কিছুটা উজ্জ্বল করেছেন–
চা আসতে পর-পর কয়েকটা চুমুক দিলেন, কৌতুকে টুপুটুপু দুই চোখ আমার মুখের ওপর। যেন ভারি একটা মজার কথা শুনলেন। পেয়ালা রেখে জিগ্যেস করলেন, লেখকদের মতে অপ্রাপ্য প্রশংসা হজম করে গেলে কতটা অপরাধ হয়?
আমি অপ্রস্তুত একটু।
বাকি চাটুকু শেষ করে হৃষ্ট মুখেই বললেন, আমি যতটুকু সাধু এখন তার সবটাই গুঁতোর চোটে।…বাবার থেকে টাকার খাঁই আমার একটুও কম ছিল না, সুযোগ পেলে দু’হাতে টাকা খেয়েছি। তারপর কি যে হয়ে গেল, এই বিজ্ঞানের যুগে আপনি সেটা বিশ্বাস করবেন কি করে? টাকা চাইতে গেলে বা নিতে গেলে কোথা থেকে যে বাতাসে স্পষ্ট নিষেধ ভেসে আসত আপনি ভাবতে পারবেন না। বড়বাবু এটি কোরো না। বড়বাবু এটি ভালো হচ্ছে না। বড়বাবু লোভের আস্কারা দিও না, বিদেয় করো বিদেয় করো। এ এক আশ্চর্য নিষেধ মশাই! তা সত্ত্বেও দুই একবার নিইনি এমন নয়, আর তারপরেই যেন দম-বন্ধ করা এক বিষাদের খুপরির মধ্যে ঢুকে গেছি, কাঁধ থেকে আঙুলের হাড় পর্যন্ত যন্ত্রণা–সবই সাইকোলজিকাল ব্যাপার এ আমিও জানি, কিন্তু আমার তো এমন হবার কথা নয়। শেষে আমার স্ত্রীর কাছে প্রতিজ্ঞা করতে হয়েছে এমন টাকা আর ছোঁব না।…সেই মহিলা এই মেয়েটাকে কি চোখে যে দেখত, বদলি হয়ে অন্যত্র চলে আসার পরেও ছুটে ছুটে ওর কাছে চলে যেত, একবার ধরে আনতে পারলে সহজে ছাড়তে চাইতেন না। মৃত্যুর আগে আমাকে নয়, ওই হাত ধরে বলে গেছল, সব রইলো, দেখিস–
এই মানুষ আমার চোখে আর জাঁদরেল পুলিশ অফিসার নন। ভাবের আবেগে মনের গ্লানি ধুয়ে ফেলতে পেরেছেন এমন একজন স্বচ্ছ পরিচ্ছন্ন মানুষ।
পরের দু’দিন কেবল হীরু দাসের ছোটাছুটি আর ব্যস্ততা লক্ষ্য কলাম। বাঁশ এলো, ত্রিপল এলো, ছাদে রান্না খাওয়ার ব্যবস্থা। কেটারার নয়, ঠাকুর এসে রান্না করবে। বাজার করার দায়িত্ব দেবব্রত অর্থাৎ জামাইয়ের ওপর, সঙ্গে হীরু থাকবে। পাড়ার ইলেকট্রিসিয়ানের সঙ্গে আমিই যোগাযোগ করে দিলাম। দীপাবলীর রাত, দোতলার ছাদ পর্যন্ত আলো দিয়ে সাজানো হবে। বিকেলে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ঘোষ সাহেবের মেয়ে শমী আর ঊর্মিলাকে প্রতিবেশীদের বাড়ি বাড়ি ঢুকতে আর বেরুতে দেখেছে। তার আগে ভদ্রলোকদের নেমন্তন ঘোষ সাহেব সেরে এসেছেন নিশ্চয়। তাঁরা কতটা অবাক হয়েছেন বা কি ভাবছেন তা
