শচীন হিসেব করে দেখল সাত দিনে সন্ধ্যার পিছনে তার প্রায় শ’ দুয়েক টাকা বেরিয়ে গিয়েছে। এইভাবে চললে কলসির জল তো ফুরিয়ে যাবে।
সেদিন বিকেলে মেট্রো সিনেমার কাছে দেখা হতেই সন্ধ্যা বলল, “আধঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রেখেছেন, ব্যাপার কী?”
“একটু দেরি হয়ে গেল। অফিসের কাজ।”
“আমার খিদে পেয়ে গিয়েছে। টিকিট কেটেছেন কুরবানির?”
“না, পারিনি।”
“জানতাম আপনি পারবেন না। আমি কেটে রেখেছি। নাইট শো।”
“নাইট শো।”
‘আটটা থেকে। আগে চলুন পেট ঠাণ্ডা করি। মার্কেটের রেস্টুরেন্টে যাব। বেড়াব খানিকটা, তারপর কুরবানি।”
শচীন বলল, “আজ আমার শরীরটা ভাল নেই। জ্বর জ্বর লাগছে।”
“ও ঠিক হয়ে যাবে। একটা স্যারিডনই যথেষ্ট। লেট আস গো।”
শচীন হিসেব করে দেখল, আজ তার অন্তত পঁচিশ ত্রিশ টাকা গচ্চা যাবে। উপায় নেই। পরের বউ বা অন্য মহিলা নিয়ে ঘোরাফেরা সত্যি বড় এক্সপেনসিভ। নিজের বউ এর ফিফটি পার্সেন্টও ছিল না। শচীনের দীর্ঘনিশ্বাস পড়ল।
রেস্টুরেন্টে খেতে বসে শচীন বলল, “ওদিকে আমার কতটা কাজ হল?”
“হচ্ছে।”
“হচ্ছে মানে?”
“কথাবার্তার চেষ্টা চলছে, সন্ধ্যা বলল ফাউল কাটলেট চিবুতে চিবুতে। “আপনার স্ত্রী ভীষণ অ্যাডামান্ট।”
“বলছে কী?”
“অনেক কথা। আপনি কোনো ভাবেই স্বামী হবার যোগ্য নয়।”
শচীন মাছ মাংসের দিকে যায়নি। পুডিং চা খাচ্ছিল। সন্ধ্যা আজ সিল্কের শাড়ি পরেছে, চন্দনের রং ব্লাউজটা একেবারেই খাটো, চুলের স্টাইল পালটেছে, দারুণ গন্ধ মেখেছে। শচীন বলল, “যোগ্য নয় বললে আমি আর কী বলব! আচ্ছা আপনিই বলুন—?”
“কী বলব?”
“না, আমার সঙ্গে মেশামেশিতে আপনার কী মনে হচ্ছে?”
সন্ধ্যা মুখ তুলে শচীনকে দেখল। চোখ ভরা হাসি। “আমার তো খুবই পছন্দ আপনাকে। ভীষণ।”
শচীন খুশি হল। “তা হলে? আপনার মতন মহিলা যদি পছন্দ করতে পারেন আমাকে আমার স্ত্রী কেন পারবেন না বলুন?”
সন্ধ্যা কাঁটা চামচ নামিয়ে দু হাত খোঁপার কাছে তুলে চুল ঠিক করল। হাসল। “সকলের পছন্দ এক নয়। আমি আপনাকে যতই দেখছি ততই ইমোশানালি অ্যাটাচড হয়ে পড়ছি। সত্যি! আমাদের যদি আগে দেখা হত…”
শচীন আহ্লাদে গলে গেল যেন। “কপাল! জীবনটা এই রকমই। যাহা চাই তাহা ভুল করে চাই, যাহা পাই তাহা চাহি না…।”
“বাঃ! আপনি কবিতা লেখেন নাকি? কবিরা স্বামী হলে স্ত্রীদের কত আনন্দ—তাই না?”
শচীন সিগারেট ধরাল। “না আমি কবি নই। তবে আপনাকে দেখে মাঝে মাঝে পোয়ট্রি ফিল করি।”
সন্ধ্যা যেন খেলাচ্ছলে বুকের আঁচল সরিয়ে আবার শাড়ির ভাঁজ ঠিক করল। চাপা হাসি মুখে। “আমি জানি। আপনার চোখ বলে আপনি কী ফিল করেন। কিন্তু আমি কী ফিল করি আপনি বোঝেন?”
শচীন বলতে গিয়েও বলল না। তাকিয়ে থাকল।
সন্ধ্যা বলল, “পুরুষরা মেয়েদের কথা বোঝে না। আমরা কিন্তু আপনাদের কথা বুঝি।…নিন, এবার উঠব। আর ভাল লাগছে না। কুরবানিতে আমাদের সিট খুব ভাল।”
খানিকটা ঘোরাফেরা শেষ করে সিনেমা হলে।
সন্ধ্যার বাহাদুরি বলতে হবে। চমৎকার এক জোড়া সিট জোগাড় করেছে। একেবারে পিছনের সারি, ডানপাশের দেয়াল ঘেঁষা।
শচীন হিন্দি সিনেমার ভক্ত নয়। মাঝে মাঝে বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে যায়। রগড় দেখে আর হাসে।
সিনেমায় তার মন ছিল না। সন্ধ্যার সঙ্গে একটু খেলাখেলি করার ইচ্ছেই ছিল আসল। পায়ে পায়ে, কনুইয়ে কনুইয়ে, কাঁধে কাঁধে কিছুক্ষণ খেলাধুলো চলল, তারপর শচীন বলল, “আমার ঘুম পাচ্ছে। একটু ঘুরে আসি।”
‘ঘুম! এই রকম ছবি দেখা ছেড়ে?”
“আমার এই সময়ে একটু ঘুম-ঘুম পায়। বাইরে একটা চক্কর দিলে ঘুম কেটে যাবে। আপনি বরং ছবি দেখুন, আমি শোয়ের শেষে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকব।”
“ঠিক?”
“বিলকুল ঠিক।”
“আসুন তা হলে?”
শচীন বেরিয়ে গেল। বাইরে এসে ঘড়ি দেখল। হাতে ঘণ্টা খানেকেরও বেশি সময়। ব্রিস্টল থেকে দেড়খানা মেরে আসা যায়। আর দাঁড়াল না শচীন। হন হন করে ছোট ব্রিস্টলের দিকে এগুলো।
শচীন তৈরি হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। মুখে পান সিগারেট। চোখ সামান্য লালচে। সন্ধ্যা আসতেই শচীন হাত তুলল। “এই যে!”
কাছে এল সন্ধ্যা। শচীন বলল, “একটু তাড়াতাড়ি করুন। বৃষ্টি আসবে।”
“তাই নাকি? তা হলে ট্যাক্সি ধরতে হয়।”
“ধরা যাবে। আসুন।”
সন্ধ্যাকে নিয়ে ফাঁকায় আসতেই ট্যাক্সি পাওয়া গেল।
সন্ধ্যাকে উঠিয়ে শচীন উঠছে তার কানে এল কে যেন বলল, “শালার হেভি ব্ল্যাক মানি। সুখের পায়রা মাইরি। কেমন জুটিয়েছে।”
শচীন তাকাল। জনাপাঁচেক লোফার টাইপের ছোঁড়া।
ট্যাক্সি চলতে শুরু করলে শচীন বলল, “আমি একটা কথা ভাবছিলাম।”
“জানি” সন্ধ্যা বলল।
“জানেন? কী—?” শচীন গায়ে গায়ে বসল, একটা হাত সন্ধ্যার পিঠের ওপর দিয়ে ছড়িয়ে দিল। “কী জানেন?”
“আপনিই বলুন?”
“না, আপনি। মেয়েরা অনেক কিছু আগে বোঝে বলছিলেন না তখন? দেখি, কী বুঝেছেন আপনি?”
সন্ধ্যা খানিকটা ক্লান্তির ভাব করে আরও ডুবে গেল গদির মধ্যে। তার কাঁধে শচীনের হাত। রাস্তার দিকে তাকিয়ে সন্ধ্যা বলল, “ভাবছিলেন ডিভোর্সটা হয়ে যাওয়াই ভাল। তাই না?”
শচীন হাঁ হয়ে গেল। বলল, “একজ্যাক্টলি। আপনি কি থট রিডিং জানেন?”
“তা জানি। কিন্তু একতরফা যদি ডিভোর্স হয় লাভ কী? আমার তো মুক্তি নেই।”
“আপনিও করে নিন।”
“তার পর?”
“তারপর তো সবই সম্ভব। আমরা দুজনেই তখন মুক্ত।”
