মনোবীণা কিন্তু স্বামীকে যে নজর করছিলেন না—তাও নয়। আড়ে আড়ে করছিলেন। স্বামীর চোখ মুখ তাঁর তো কম জানা নয়। ওই চোখের মধ্যে যে পাতলা ঢুলুঢুলু ভাব ছিল তাও তিনি নজর করেছেন। লক্ষ করেছেন, কথা বলার সময় ভদ্রলোকের দু’চারটে কথা এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিল, শব্দ পিছলে যাচ্ছিল জিবের ডগা থেকে।
ফণীশ্বর পাকা লোক। তিনি বুঝতে পারছিলেন, বাঘ বা বাঘিনী এখন আশপাশে নিজেকে আড়াল করে রেখে শিকারটিকে দেখছে। যথাসময়ে লাফ মারবে।
ফণীশ্বর অনুমান করার চেষ্টা করতে লাগলেন, কখন কোন দিক থেকে কী ধরনের আক্রমণ ঘটলে তিনি বাঘিনীকে জব্দ করতে পারবেন।
খাওয়া সেরে ফণীশ্বর শুয়ে পড়লেন।
মনোবীণা খানিকটা পরে ঘরে এলেন।
ফণীশ্বর ভাব করলেন যেন ঘুমিয়ে পড়েছেন। মনোবীণা নিত্যকার মতন ঘরের মধ্যে ঘুরলেন ফিরলেন, ছোটখাটো কাজ সারলেন। দরজা বন্ধ করে বাতি নিভিয়ে শুয়ে পড়লেন। কোনও কথাই বললেন না।
ফণীশ্বর অনুমান করেছিলেন, নিভৃতে শয্যায় তাঁর ওপর আক্রমণটা ঘটতে পারে। তিনি মনে মনে নিজেকে তৈরি করে রেখেছিলেন। হায় রে, কিছুই যে ঘটছে না।’
রাত বাড়তে বাড়তে বুঝি মাঝরাত পেরিয়ে যাচ্ছিল, ফণীশ্বর বাস্তবিকই ঘুমিয়ে পড়েছিলেন, হঠাৎ পেটের কাছে খোঁচা খেয়ে ঘুম জড়ানো গলায় বললেন, “আঃ!”
আবার খোঁচা। বার দুই তিন।
ঘুম ভাঙল ফণীশ্বরের। কী হল?”
“আমার বুকটা কেমন করছে। উঠতে পারছি না। জল দাও!”
ফণীশ্বরকে উঠতে হল। “অম্বলের ব্যথা?”
“উঃ! মাগো—”
“কী খেয়েছিলে রাত্তিরে?” বলতে বলতে ফণীশ্বর উঠে পড়ে ঘরের বাতি জ্বাললেন। জল গড়িয়ে দিলেন স্ত্রীকে।
মনোবীণা উঠে বসলেন। বিছানায় পা ছড়িয়ে বসে আছেন।
“নাও। …ইয়ে একটু জোয়ানের আরক খাবে নাকি? বুকের তলায় ব্যথা তো! অম্বল! গ্যাস আটকে গেছে। “
জলের গ্লাসটা নিলেন মনোবীণা, তারপর আচমকা, একেবারে আচমকাই বললেন, “মনসা তোমায় যে ওষুধটা খেতে দেয়—সেটা দাও!”
ফণীশ্বর থতমত খেয়ে গেলেন।
“মনসা—মানে সরোজের ওষুধ?”
“হ্যাঁ।”
“সেটা তো হার্টের…।”
“আমারও হার্ট।”
ফণীশ্বর বললেন, “কে বলল! তোমার অম্বল। গ্যাসট্রিক। গ্যাস—।”
“হার্ট। আমার শরীর আমি ভাল বুঝব না, তুমি বুঝবে?”
“তুমিই বোঝে। কিন্তু কথা নেই, বার্তা নেই, হুট করে হার্টের ওষুধ খেয়ে বসবে।”
“খাব।”
“তারপর যদি কিছু হয়!”
“হলে পাপ চুকবে।…দাও ওষুধটা দাও।”
ফণীশ্বর বড় বিপদে পড়লেন। হার্টের ওষুধ তাঁর কাছে কিছু নেই। সরোজ তাঁকে কোনও ওষুধ দেয়নি খেতে। কেননা, এই বয়েসেও হার্টের এমন কোনো গণ্ডগোল নেই যে নিত্য কোনও ওষুধ খেতে হবে। ওষুধের ব্যাপারে সরোজ বড় কড়া। হুটহাট ওষুধ খাওয়া সে পছন্দ করে না। একটা ভিটামিন ট্যাবলেট খেতে চান খাবেন। পেটে বুকে চাপ বুঝলে—সোডামিন্ট। আপনার তো সোডার অভ্যেস ভালই আছে। কোনও ক্ষতি হবে না।’…ফণীশ্বরের কাছে সেই সোডামিন্ট ট্যাবলেট পড়ে ছিল। মাঝে মাঝে স্ত্রীকে দেখিয়ে সেটাই খেতেন। কিন্তু আজ এই সময়—!
ফণীশ্বর তবু ওষুধ খোঁজার ছুতো করে একটা কী এনে দিলেন।
মনোবীণা দেখলেন ওষুধটা। বললেন, “এটা তো তোমার ত্রিফলার কবিরাজি বড়ি।”।
“আরে না না।”
“না না মানে! আমি জানি না। গুণ্ডু কম্পানির ত্রিফলা বড়ি। নিজের হাতে উষ্ণ জলের সঙ্গে মিশিয়ে আমি তোমাকে খেতে দিই।”
ফণীশ্বর বিপাকে পড়ে গেলেন। “ও! তা হলে ভুল হয়ে গেছে। ঘুম চোখে মাঝরাত্তিরে—দাও তবে?”
“তোমার আজকাল খুব ভুল হচ্ছে, না?” মনোবীণা এবার পা গুটোলেন।
“ভুল! কই না!”
“খুব হচ্ছে, রোজই হচ্ছে। উত্তরে যাব বললে দক্ষিণে যাও, চেটোর বাড়ি যাচ্ছি বলে মনসার বাড়ি যাও।”
ফণীশ্বর বুঝতে পারলেন, বাঘিনী সময় মতন ঝাঁপ দিয়েছেন। প্রবল বেগে মাথা নেড়ে বললেন, “সরোজের বাড়ি যাই! কী আশ্চর্য! কে বলল? কোথায় সরোজ! কোথায় আমি!”
“যাও না?”
ফণীশ্বর ভয় পেয়ে গেলেন কিনা কে জানে, বললেন, “দরকার না-পড়লে যাব কেন? এই হার্টের কোনও…”
“আজ যাওনি?”
ফণীশ্বর বললেন, “খেঁদা বলেছে?”
“খেঁদাকে তুমি উচ্ছন্নে পাঠিয়ে দিলে! ছিছি! ওই হারামজাদাকে তুমি টাকা খাইয়ে বশ করে নিয়েছ! ওকে পয়সা দাও সিনেমা দেখার, বিড়ি-সিগারেট ফোঁকার। ওকে বলো, যা খেঁদা পিকচার দেখে আয়। আর নিজে গিয়ে ওঠো মনসার বাড়ি। লজ্জা করে না তোমার! বুড়ো হাবড়া। এই বয়সে কোথায় ধম্ম কম্ম করবে, ঠাকুরুদেবতার কথা ভাববে, তা নয়—কোথাকার একটা মদ্দাটে মেয়েছেলের বাড়িতে গিয়ে বসে বসে ফস্টিনস্টি করো। ছি ছি! আমার মরতে ইচ্ছে করছে।”
ফণীশ্বর স্ত্রীকে দেখলেন। বললেন, “ফস্টিনস্টি করি না। ভগবানের দিব্যি। তোমার দিব্যি।.. মিথ্যে বলব না, সরোজের কাছে যাই। গল্প গুজব করি। আর ইয়ে একটু জিন খাই। ব্লু রিবন উইথ লাইম।”
“কী খাও?”
“জিন!…মেয়েরাই বেশি খায় ওটা। আমাদের কাছে কিস্যু নয়। জল। লেবু জল!”
“ওই মদ্দা মাগিটাও বুঝি খায় তোমার সঙ্গে?”
“এক আধ দিন। বেশির ভাগ দিন সরোজ সফট ড্রিঙ্ক খায়….”
“আর তুমি মদ গেলো!”
“ধুত, ও আবার মদ নাকি? আমাদের পেটে বার্লি…সেরেফ বার্লি….।”
স্বামীকে দেখতে দেখতে মনোবীণা বললেন, “তোমার যত দোষই থাক—এই মনসা-দোষ তো ছিল না। কী কুক্ষণে তোমার পা ভাঙল, আমি ছিলাম না বাড়িতে, আর ওই মনসামাগি এসে জুটল! আমার কী কপাল! কোথায় আমি কোন পাহাড়ে গিয়ে মায়ের পায়ে মাথা ঠুকে তোমার জন্যে মাদুলি নিয়ে এলাম মদের নেশা ছাড়াব বলে, তা ওটা যদি বা কমল একটু এটা একেবারে চড়চড়িয়ে বেড়ে গেল।”
