সুবীর বলল, “তোর দাঁত কিন্তু যা বাঁধিয়ে দেব দেখবি।”
“নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ! সরি, আমি নাক কাটতে পারব না।”
সুবীর বলল, “ভালো করে ভেবে দেখ। যদি রাজি থাকিস, তোর ওই ভাঙা দাঁত দিয়েই নেক্সট উইক থেকে শুরু হতে পারে।”
প্রেমকিশোর জোরে জোরে মাথা নাড়ল।
গুহ বলল, “ব্যাপারটা পেইনফুল ; কিন্তু সুবীরের থিয়োরিটা কারেক্ট। ফলস দাঁত থাকলে শশিকলা তোর দাঁত দেখে একটি বর্ণও তোর রিঅ্যাকশন বুঝবে না। ঠাণ্ডা মেরে যাবে। আমার বউয়ের একবার ফলস হয়ে হয়েছিল।…”
হঠাৎ প্রেমকিশোর লাফ মেরে উঠে দাঁড়াল। দাঁড়িয়েই খেপার মতন বলল, “হয়েছে, হয়েছে! শালা হয়েছে! ইউরেকা! ইউরেকা!” বলে প্রেমকিশোর ঘরের মধ্যে চরকিপাক খেয়ে মাথার ওপর হাত তুলে নাচতে লাগল।
বন্ধুরা থ’ মেরে বসে রইল। হাঁ করে, অবাক হয়ে।
নাচতে নাচতে প্রেমকিশোর হাসতে লাগল, হাসতে হাসতে সুবীরের গলা জড়িয়ে পটাস করে দুটো চুমু খেয়ে ফেলল। বলল, “মার দিয়া! সাবাস সুবীর। শালা তুই গুরু লোক। আয়, তোকে একটা প্রণাম করি।”
প্রেমকিশোর আর দাঁড়াল না। হাত তুলে বন্ধুদের বলল, “চলি ভাই, কর্ম ফতে করে তবে ফিরব।”
“তোর হল কী? হঠাৎ খেপে গেলি কেন?”
“সে পরে শুনবি। আমি চললাম।”
“ব্যাপারটা বলে যা—।”
“এখন নয়। পরে। বাই বাই। “ নাচতে নাচতে প্রেমকিশোর চলে গেল। বন্ধুরা বোবা হয়ে বসে থাকল।
গুহ বলল, “বেটা কী দাঁত তোলাতে গেল নাকি?”
“মনে তো হয় না।”
“তবে?”
সুবীর, মন্মথ, গুহ কেউ কোন কিছু বুঝল না। অনুমান করতেও পারল না। চুপ করে বসে থাকল।
পাঁচ
বাড়িতে ঢোকার আগে প্রেমকিশোর কাছাকাছি বার-এ গিয়ে অল্প হুইস্কি খেয়ে নিল। তার সঙ্গে স্যারিডন। হুইস্কি তাকে মেজাজ দেবে ; আর স্যারিডন দাঁতের ব্যথা মারবে।
অন্যদিন প্রেমকিশোর চোরের মতন বাড়ি ঢোকে ; আজ বড় বড় পা ফেলে শব্দ করতে করতে ঘরে ঢুকল। শশিকলা ঘরে বসে বই পড়ছিল, প্রেমকিশোরকে হাসতে হাসতে ঘরে ঢুকতে দেখে চোখ তুলে অবাক হয়ে তাকাল। তার পরনে মেয়ে প্যান্ট, গায়ে কামিজ।
প্রেমকিশোর বউয়ের দিকে তাকিয়ে মিটমিট করে হাসল।
শশিকলা বলল, “কী হয়েছে? উতনা হাসছ কেন?”
প্রেমকিশোর বলল, “রাস্তায় একটা লোক বাংলা খেয়ে খেমটা নাচছে।”
“খেমটা কী?”
প্রেমকিশোর অক্লেশে কোমরে হাত দিয়ে খেমটা নাচ দেখাল।
শশিকলা নাক মুখ কুঁচকে ধমক দিয়ে বলল, “স্টপ। ইয়ে ভালগার হ্যায়।”
প্রেমকিশোর কোমর থেকে হাত নামিয়ে বলল, “তোমাদের ইয়ে ঘুরিয়ে নাচ আরও ভালগার।”
“কোথায় গিয়েছিলে জি?”
“ডেন্টিস্টের কাছে।”
“কাল ভি গিয়েছিলে!”
“আজও গিয়েছিলাম। দাঁত ব্যথা করছিল। ওষুধ খেয়েছি।” প্রেমকিশোর হুইস্কি খাওয়াটা মেরে রাখল।
শশিকলা হাতের বই নামিয়ে রাখল। —“খানা খাবে?”
“খাব! রুটি, তরকারি, মাছ—সব খাব।”
“মাগর তোমার দাঁতে পেইন আছে।”
“গোলি মারো।”
শশিকলা ব্যাপারটা বুঝতে পারল না। সন্দেহের চোখে স্বামীকে দেখল।
প্রেমকিশোর গ্রাহ্য করল না। আপন মনে প্যান্ট জামা খুলতে খুলতে হঠাৎ গান গাইতে লাগল : আমি ভয় করব না।
শশিকলা চমকে গিয়ে বলল, “সিঙ্গিং?”
“ও ইয়েস।”
“কেয়া হুয়া তোমারা জি?”
“ফিলিং ফাইন আফটার দি মেডিসিন।”
শশিকলা তাকিয়ে থাকল। প্রেমকিশোর গান গাইতে গাইতে বীরবিক্রমে বাথরুমে চলে গেল।
খেতে খেতে প্রেমকিশোর বলল, “দাঁত দেখাব?”
“নট নাউ।”
“ও-কে।…দাও রুটি দাও ; তরকারি দাও। কি মাছ, চিংড়ি? লাগাও, শালা সব খাব আজ।”
শশিকলা এবার ভয়ে ভয়ে প্রেমকিশোরকে দেখল। —“তোমার দেমাক খারাপ হয়ে গেছে জি।”
‘কুছ পরোয়া নেই। তুমি যখন আছ মাথা নিয়ে ভাবি না, ঠিক করে দেবে। সাইকোলজিস্ট বউ, হোয়াই শুড আই ফিয়ার!”
শশিকলার জন্যে অপেক্ষা করল না প্রেমকিশোরকে, নিজেই টেনে টেনে খাবার নিতে লাগল। শশিকলা বলল, “ডক্টর তোমায় কী ওষুধ দিয়েছে?”
“জানি না। ব্রান্ডি টাইপের গন্ধ ছিল।”
“হোয়াই ব্রান্ডি?”
“ডাক্তার জানে। আমি ডাক্তার নই।”
“ওহি বাস্তে তোমারা এতনা ফুর্তি…।”
“তোমায় বড় ভাল লাগছে। এই ড্রেসটা পরে থাকবে না ছাড়বে?”
“তুমি লুজ টক করছ।”
“তোমাকে লুজ করব।”
শশিকলা রেগে মেগে আর কথা বলল না।
শুতে এসে প্রেমকিশোর বেশ মেজাজের মাথায় সিগারেট খাচ্ছিল।
শশিকলা এল বেশ কিছুটা পরে। শাড়ি পরে শুতে পারে না শশিকলা। সিলোনিজ সায়ার মতন একটা বড়-সড় মাপের পেটিকোট পরে, সেটা অনেকটা ঘাঘরার মতন। গায়ে ঢিলেঢালা ব্লাউজ।
বিছানায় শুয়ে শশিকলা বলল, “বাত্তি বুজাও।”
প্রেমকিশোর বলল, “তুমি হিন্দি ছাড়বে না ছাড়বে না? বাঙালি মেয়ে তুমি। হিন্দি যতই বল, ভাল লাগে না।”
শশিকলা বলল, “বেশ।”
“বেশ মানে?”
“বেশ মানে বেশ, হিন্দি বলব না।”
“খুশি হলাম।”
শশিকলা গা-হাত ঝেড়ে গুছিয়ে শুল।
প্রেমকিশোর শশীর দিকে ফিরল। বলল, “তুমি চুলে কি মাখো?”
“কুছ না।”
“ফাইন গন্ধ দিচ্ছে।”
“শ্যাম্পুর গন্ধ।”
“বিউটিফুল। তোমার বডি পাউডারটা মার্ভেলাস।”
“তোমার আজ কী হয়েছে কী? এতনা বকবক করছ? কিতনা ব্র্যান্ডি খেয়েছ?” মনে মনে প্রেমকিশোর হাসল। শালা এক পেগ বড় হুইস্কিতেই এই কর্ম।
বলল, “বেশি নয়।”
“বাত্তি নেভাও।”
“বাত্তি নয়, বাতি—” বলে প্রেমকিশোর সোজা তার ডান হাত বউয়ের গায়ে চাপিয়ে দিল। ফুলশয্যার দিন হাত বাড়ানোর চেষ্টাও করতে পারেনি, ধমক খেয়ে ঠাণ্ডা হয়ে গিয়েছিল।
