পরের দিন সকালে প্রেমকিশোর ঘুম থেকে উঠে বাথরুমে গেল। ফিরে এসে চা খেতে বসল বারান্দায়।
টেবিলে চা সাজিয়ে শশিকলা বসে ছিল। বারান্দায় যথেষ্ট আলো রয়েছে; রোদও এসেছে। ছোট টেবিল। আলো আর রোদ যেদিকে বেশি প্রেমকিশোরের বসার চেয়ার সেদিকেই। উল্টো দিকে শশিকলা বসে আছে। তার একপাশে টেবিলের ওপর কিছু সাদা কাগজ ক্লিপ দিয়ে আঁটা। পাশে একটা ফাউন্টেন পেন। টেবিলে চায়ের পট, দুধ, চিনি ; আর তিন চার রকম খাবার। একেবারে কড়কড়ে টোস্ট ; এক প্লেট শক্ত মটর, গোটা চারেক কলা। সকালে কি কি খাবে প্রেমকিশোর শশিকলা ঠিক করে রাখে আগে থেকেই।
প্রেমকিশোর চেয়ারে বসে গোবেচারার মতন মুখ করে হাসল একটু। তারপর দু’ পাটি দাঁত বের করে বসে থাকল।
শশিকলা ডাক্তারের মতন তীক্ষ্ণ চোখ করে দাঁত দেখল। তারপর বলল, “ক’ দাফে করেছ? টু অর থ্রি?”
প্রেমকিশোর আঙুল তুলে দুই দেখাল।
“আই টোল্ড ইউ টু মেক থ্রি। মনে থাকে না?”
প্রেমকিশোর বলল, “নতুন পেস্ট; মাড়ি জ্বলে যাচ্ছিল।”
“জ্বলে যাচ্ছিল! বাচ্চে কি মাফিক বাত মাত্ বোলো জি।”
শশিকলা কলম তুলে নিয়ে কাগজে কি যেন লিখল। শশিকলার মুখের চেয়ে চশমা যেন বড়, মোটা মোটা কাচ, চৌকোনো ফ্রেম, কাচের মধ্যে আবার গোল গোছের অস্পষ্ট দাগ। নাক প্রচণ্ড লম্বা। বব করা চুল। পাঁশুটে রং চুলের। গায়ে হালকা নীল শাড়ি, আঁটসাঁট করে পরা, গায়ের ব্লাউজ ধবধবে সাদা। চোখে-মুখে অবাঙালিয়ানার ছাপ আছে। মুখ দেখতে মন্দ নয়, কিন্তু সারা মুখে কেমন রুক্ষতা রয়েছে। চোখ দুটো ভীষণ তীব্র লাগে।
শশিকলা চা ঢালবার আগে হাত দিয়ে কলার প্লেটটা দেখাল। বলল, “কেলা খাও পহেলে।’’
প্রেমকিশোর বলল, “তুমি আমার কাছে হিন্দি বোলো না। আমি বুঝতে পারি না। আইদার ইউ ম্পিক ইন ইংলিশ অর ইন বেঙ্গলি।’’
শশিকলা স্বামীর দিকে তাকাল। “অল রাইট। কোলা খাও।”
প্রেমকিশোর চটে গেল। বাংলা নিয়ে ঠাট্টা। তুমি কোন মহারানি গো যোধপুরের? কলার প্লেট টেনে নিয়ে বলল, “কোলা নয় কলা। শশিকোলা কিংবা শশিকেলা বললে তোমার শুনতে ভাল লাগবে?”
শশিকলা চোখের চাউনিতে যেন বিস্ময় ফোটাল। বলল, “আচ্ছা! ইউ আর শোয়িং সাম ক্যারেজ।”
প্রেমকিশোর কলার খোসা ছাড়িয়ে মুখে দিল।
শশিকলা চা ঢালতে লাগল। হঠাৎ শশিকলা বলল, “স্টপ।”
প্রেমকিশোর ঠোঁট বন্ধ করল, মুখের মধ্যে কলা।
শশিকলা বলল, “দাঁত দেখাও।”
প্রেমকিশোর দাঁত বের করল। মুখের কলা গলায় আটকে যায় আর কি!
শশিকলা দেখল। তারপর আবার কলম তুলে কি লিখল। লেখা শেষ হয়ে গেল। “ফ্রম সফট টু হার্ড। আজ তুমি প্রেম, নার্ম চিজ খাবে ফাস্ট, উসকি বাদ হার্ড, হার্ডর। আমি তোমায় অবজার্ভ করব। সমজ মে আয়া?”
প্রেমকিশোর মাথা নাড়ল। —না।
“কাহে?”
“হিন্দি আমি বুঝি না। বাংলায় বললা।”
শশিকলা দু মুহূর্ত যেন কি ভাবল, তারপর বলল, “সরি।” বলে বাংলায় বলল “পহেলে কলা খাবে নার্ম চিজ; নেক্সট খাবে টোস্ট, বাদ মে মটর।”
কাল বন্ধুদের কাছ থেকে ঘুরে আসার পর প্রেমকিশোরের মনে খানিকটা সাহস এসেছিল। তা ছাড়া কাল রাত্রে সে স্বপ্ন দেখেছে, প্রেমকিশোর ঝোলাঝুলি কাঁধে করে লাঠি হাতে গেরুয়াশোভিত মুণ্ডিতমস্তক হয়ে সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে হিমালয়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে। খুব সম্ভব ত্রিশূল পর্বতেই ডেরা বাঁধতে যাচ্ছে। স্বপ্নটা তাকে তাড়া দিচ্ছিল, চাগিয়ে দিচ্ছিল। সংসার যদি ছাড়তেই হয় সে বীরের মতন ছাড়বে, ভীরুর মতন নয়। ভেতরের এই বিদ্রোহ প্রেমকিশোরকে সামান্য সাহসী করে তুলছিল।
কলা খেয়ে আরও কলার খোসা ছাড়াতে ছাড়াতে প্রেমকিশোর বলল, “তোমার মুখে বাংলা শুনতে আমার খুব ভাল লাগে, শশী। প্লিজ বাংলাতেই কথা বলো।”
শশিকলা প্রেমকিশোরের দিকে চায়ের কাপ এগিয়ে দিল।
মাখন লাগানো বিস্কিট নিল শশিকলা, মুখে দিল, দিয়ে দাঁতের ডগায় ভাঙল। চমৎকার দাঁত শশিকলার, ঝকঝকে, সুবিন্যস্ত, সাজানো। শশিকলা ধীরে ধীরে খায়, ঠোঁট সামান্য ফাঁক করে।
প্রেমকিশোর সাহস করে বলল, “তুমি আমায় একটু বুঝিয়ে দেবে।”
“কী?”
“এই দাঁতের সাইকোলজিটা?” বলে প্রেমকিশোর স্ত্রীকে সর্বোৎকৃষ্ট তেল দিচ্ছে এ রকম একটা ভাব করে বলল, “তুমি দারুণ লার্নেড, অর্ডিনারি মেয়েদের মতন নও, তোমার সাংঘাতিক অ্যাকাডেমিক কেরিয়ার, রিসার্চের সাবজেক্টটাও ভেরি ডিফিকাল্ট। আমার দারুণ ইন্টারেস্ট লাগছে।”
শশিকলা কথাটা কানে তুলল না। বলল, “নার্ম জিনিস যখন খাও তখন তোমার দাঁতের ফিলিং কেমন হয়?”
প্রেমকিশোর চুপ। জিভটা দাঁতের ওপর বুলিয়ে নিল। তারপর বলল, “নরম জিনিস মানে ডাল ভাত পেঁপে কলার কথা বলছ?”
“জরুর।”
“নাথিং স্পেশ্যাল। কিছুই ফিল করি না। আরও নরম কিছু খেতে পারলে ডিফারেন্সটা বুঝতে পারতাম।”
“আরও নার্ম?”
প্রেমকিশোরের ইচ্ছে হল রহস্যময় দৃষ্টিতে একবার শশিকলার দিকে তাকিয়ে চোখ টেপে। সাহস হল না। সাহসের বাড়াবাড়ি ভাল নয়। প্রেমকিশোর বলল, “আরও নরম কিছু থাকতে পারে।”
“এনি ফুট?”
“ফল!…হ্যাঁ তা ফলও বলা যায়।”
“তো বোলো— ’’
মাথা চুলকে প্রেমকিশোর বলল, “বিম্বোধর!”
“কেয়া?”
“দ্যাটস এ ফুট। ক্ল্যাসিকাল ফুট। ওরই বড়সড় ফল হল পয়োধর।”
“আমার মালুম নেই!”
“যেমন ধর খরমুজ আর তরমুজ। দে আর মোর অর লেস এ সেম কাইন্ড অফ ফ্রুট। বাট দে ডিফার ইন সাইজ অ্যান্ড টেস্ট।”
