“মহাদেব নাকি? আমি গুরুপদ বলছি।” —গুরুপদ ঘাড় নাড়তে নাড়তে বললেন, “—না না, ভালই আছি।— সুবোধ ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলাম।— বলল, বেটার।— বাড়ি ফিরে এসে দেখি, তোমার জুনিয়ার বসে আছে।—হ্যাঁ গো, তোমার ম্যাগনেট মুরলী।— কী।—তা তুমি অমন জড়িয়ে জড়িয়ে কথা বলছ কেন? মালটাল খেয়েছ নাকি! —যাক গে শোননা। তুমি তো স্কুলে ষাঁড় ঢোকানো ছেলে! তা আমার পেছনে এবার যে ম্যাগনেটটি ঢুকিয়েছ তার কী হবে! —কী বলছে, বুঝতে পারছ না! মহাদেব—আমাকে তুমি বুদ্ধু ভেবেছ। শোনো, তোমার ওই ভাইপো মুরলী, আর আমার ভাগ্নি বেলা—এই ছোঁড়াছুঁড়ি দুটোর আগে থেকেই চেনাজানা হয়েছে।—আরে বাবা, তুমি আমায় কী শেখাবে! আমি শিখে শিখে বুড়ো হয়ে গেলুম।—দাঁড়াও, দাঁড়াও—আমাকে কথা শেষ করতে দাও—কলকাঠি তুমি নাড়োনি জানি। নেড়েছে আমার ভাগ্নি আর শালীর ছেলে। হারামজাদা কেমন প্যাঁচ কষে আমাকে, আমার গিন্নিকে তোমার কাছে নিয়ে গেছে বুঝতে পারছি। তুমিও বাপু, বেশ ম্যাগনেটটি ঢুকিয়ে দিলে। ”
শশিতারা যতই অবাক হচ্ছিলেন ততই স্বামীর গা ঘেঁসে আসছিলেন। যেন পারলে মহাদেবের কথাগুলোও শুনে নেন।
গুরুপদ বললেন, “—শানু—আমার শালীর ছেলেটি অতি ধুরন্ধর। ভাগ্নিটাকে আমি বোকাই ভাবতাম।—দেখছি, এখনকার ছেলেমেয়েগুলো আমাদের কান কাটতে পারে।—তা যাকগে এখন তোমায় সাফসুফ বলি, তোমার ভাইপোকে আমার জামাই করতে পারছি না। ছোকরাকে বলে দিও!” বলে গুরুপদ ফোন নামিয়ে রাখলেন।
শশিতারা অবাক হয়ে স্বামীকে দেখছিলেন। প্রথমে কথা বলতে পারছিলেন না পরে বললেন, “হল কী তোমার?”
“আমার সঙ্গে ভাঁওতা বাজি।”
“করলটা কে?”
“ওরা!—আমি বলব না করে শেষে সুবোধকে বলেই ফেললাম, ম্যাগনেটিক ট্রিটমেন্টের কথা। সুবোধ তো হাসতে হাসতে বিষম খেয়ে মরে। শেষে বলল, আমার মতন ছাগল আর দেখেনি।”
“তোমায় ছাগল বলল! ও নিজে কী?”
“ও কী তা নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই।—সত্যি বলতে কি, আমি ফেরার সময় গাড়িতে ভাবতে ভাবতে এসেছি।—আমার বরাবরই কেমন ধোঁকা লাগছিল। চার ছটা লোহার টুকরো বেঁধে চিকিৎসা! —তা কলকাতা শহরে হাজার লোক হাজার ফিকির করে খায়! তোরাও খা। নো অবজেকশান। আমিও শালা আদি আমলা তেল, চালমুগরা করে খাই।—কিন্তু তোরা আমার ভাগ্নিকে চিট করবি?”
শশিতারা হঠাৎ বললেন, “মুরলী ছেলেটি কিন্তু ভাল। দেখতে ভাল ব্যবহার ভাল। লেখাপড়া শিখেছে। সভ্য—”।
“সভ্য! —বেটাকে তুমি সভ্য বলছ! —তুমি কিস্যু জানো না।—শোনো, তোমায় বলিনি আজ আমি যখন ওপরে আসছি, কানে এল বসার ঘরে বসে ওই রাস্কেল হি হি করে হেসে হেসে বেলিকে বলছে, বেলা তোমার কাছে এইভাবে বসে থাকলে আমার মনে হয় ময়রার দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। জিবে জল আসে।”
শশিতারা হেসে ফেললেন। জোরেই। তাঁর মোটা গলার স্বর সরু হয়ে এল।
গুরুপদ বললেন, “হাসছ।”
শশিতারার হাসি আর থামতে চায় না। শেষে বললেন, “সে তুমি বলতে। তুমি ময়রার দোকান বলতে না, বলতে—”।
গুরুপদর মনে পড়ে গেল, কী বলতেন। নানা রকমই বলতেন, মাঝে মাঝে তামাশা করে বলেছেন, শশিসোনার ভ্যারাইটি স্টোর্স—।
হেসে ফেলে গুরুপদ বললেন, “সে তখনকার কথা। বিয়ের পর। বিয়ের আগে অমি তোমায় দেখেছি, না, কিছু বলেছি?”
শশিতারা বললেন, “দেখোনি বলোনি।—এরা দেখাদেখি করছে তাই বলছে।”
এমন সময় বেলার গলা পাওয়া গেল। ঘরে এল। এসে বলল, “গাড়িতে কিছু নেই। “বেলার হাতে বসার ঘরে ফেলে আসা প্লাস্টিকের বাক্স।
গুরুপদ ভাগ্নিকে দেখতে দেখতে বললেন, “নেই জানতে এতক্ষণ লাগল?”
বেলা চুপ। মুখ নিচু করল।
শশিতারা বললেন, “তোর মামার খেয়াল থাকে না কোথায় ফেলে দিয়েছে।”
বেলা নতুন বাক্সটা এগিয়ে দিচ্ছিল, গুরুপদ বললেন, “আমার দরকার নেই। তুমি নিয়ে যাও।”
বেলা হকচকিয়ে গেল। “আমি?”
শশিতারা ইশারা করে বললেন, “তুই নিয়ে যা। যা—!”
বেলা যেন কেমন থতমত খেয়ে ভয় পেয়ে চলে গেল।
গুরুপদ গোঁফ চুলকোতে চুলকোতে বললেন, “শশি? কী করব?”
“আর একবার ফোন করো।”
“কাকে?”
“মহাদেবকে?”
“কী বলব?”
“বলো, যা হয়েছে ; তাই হবে।”
“শুধু এই?”
“হ্যাঁ।—তুমি তো খাঁটি দিশি ছেলে খুঁজছিলে। মুরলী তোমায় ম্যাগনেট দেওয়া চুলের তেলও করে দিতে পারে।”
গুরুপদ আবার ফোন করলেন।
“মহাদেব।—আমি গুরুপদ।—শোনো, আমার বউ বলছে—যা হচ্ছিল, তাই হবে।—কী? শুনে খুশি হলে।—আরে—কী বললে ম্যাগনেট ট্রিটমেন্ট! না আমার দরকার নেই। ওটা যাদের দরকার তারাই করুক।—কী? —কী বলছ? —তা বলতে পার। ছাড়লাম।”
গুরুপদ ফোন নামিয়ে রাখলেন।
শশিতারা বললেন, “কী বলল গো মহাদেব?”
“বলল, বউদিই তোমার বেস্ট ম্যাগনেট! —শালা ধড়িবাজ।” বলে গুরুপদ বেশ হাসিখুশি মেজাজে শশিতারার বুকে খোঁচা মারলেন। “ম্যাগনেট! মন্দ বলেনি, কী বলো? তবে এত বিগ সাইজ—!”
শশিতারা বুক সামলে বললেন, “আঙুল না ছাতার বাঁট! আমার লাগে না?”
গুরুপদ হাসতে লাগলেন।
প্রেমশশী
বিয়ের পর পনেরোটা দিনও কাটেনি প্রেমকিশোর বন্ধুদের কাছে এসে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, ভাই, তোরা আমায় ত্রিশূল পর্বতের একটা টিকিট কেটে দে, আমি পাহাড়ে চলে যাব।
ত্রিশূল পর্বতটা কোথায় বন্ধুদের কারও জানা ছিল না। গুহ জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ায় কাজ করে, ভারতবর্ষের মানচিত্রটা তার মোটামুটি জানা—সেই গুহও বলল, একজ্যাক্ট লোকেশানটা কোথায় ত্রিশূলের?
