গুরুপদ তেমন একবগ্গা মালিক নন। কত রকমভাবে বুঝিয়েছেন, মিষ্টি করে কথা বলেছেন, মাইনেপত্র বাড়িয়েও দিয়েছেন, মায় মাসে পনেরো টাকা করে টিফিন খরচাও ধরে দিয়েছেন রফা করে। তবু মন তুষ্ট করা যায় না। বারো হাত কাঁকুড়ের তেরো হাত বিচির মতন তাঁর কারখানা ছোট—লোক বিস্তর।
শেষে একদিন গুরুপদ বললেন, “নরম মাটি পেয়ে আমায় তোমরা পায়ে চটকাবে? হবে না। আমি আর কারখানায় আসব না; কথাও বলব না। যা খুশি করো তোমরা।”
তেরিয়া না হলে আজকালকার সংসারে কাজ হয় না। গ্রাহ্যি করে না লোকে। গুরুপদর উকিল নীলমণি চাটুজ্যে ঠিকই বলে। বলে, কলকাতা শহরে মানুষ মিনিবাসকে ডরায় কেন গুরুপদবাবু? অ্যাজ বিকজ দে আর অল ডেসপারেটাস। নীলমণি ইংরিজি শব্দের শেষে নাকি ইটালি ভাষা মেশাতে পছন্দ করে।
গুরুপদ কি আর মিনিবাস? মানুষ বলে কথা। আর ব্যবসা তো, আমলা তেল, চালমুগরার সাবান, শাঁখের গুঁড়ো উইথ চন্দন—এ সবের। আর হালে তৈরি করেছিলেন কাপড়কাচা গোল সাবান। দেখতে গেলে কিছুই নয়। তবে ভাল ভাল নাম দিয়েছিলেন জিনিসগুলোর। ‘আদি আমলা শশি কেশ তৈল’ ‘চর্মদশানন চালমুগরা’ ‘মুখশোভা; শঙ্খ চন্দন চূর্ণ’। কাপড়কাচা গোল সাবানের নাম; ‘নব বাংলা সাবান’।
গুরুপদ ব্যবসার মূল কথাটা জানেন; পাবলিকের যা হামেশাই দরকারে লাগে তা নিয়ে ব্যবসা করো, যত তুচ্ছ জিনিসের হোক, লেগে যাবে। পাড়ায় পাড়ায় মুদির দোকান কেন চলে? কেন পানের দোকান ফেল মারে না? তেলেভাজার দোকানে গিয়ে লাইন মারতে হয় কেন?
পঁচিশ বছর আগে গুরুপদ যখন নিতান্তই চাকরি করতেন একটা ফারমাসিউটিক্যাল কম্পানিতে তখন থেকেই মাথায় ব্যবসার পোকা নড়েছিল। বিয়ের পর এক মামা-শ্বশুরের দর্শন পেলেন। গুরুদর্শন। মামাশ্বশুর আলপিন, সেফটিপিন, ক্লিপ তৈরি করে চারতলা বাড়ি হাঁকিয়েছেন। পাতিপুকুরে মামাশ্বশুরমশাই বললেন, খোস-পাঁচড়া-দাদের মলমের কত বিক্রি জানো, বাবাজি। এ দেশ হল গরিবের দেশ; এখানে যত লোক পাউডার মাখে তার পাঁচশ গুণ লোক দাদ চুলকুনি হাজার ওষুধ খুঁজে বেড়ায় বুঝলে? রাইট জিনিস পিক করো, লেগে যাবে।
গুরুপদ পাঁচ রকম ভেবেচিন্তে প্রথমেই ধরলেন, ‘আদি আমলা শশি কেশ তৈল’। বন্ধুরা বলল, ‘আমলার আবার আদি কী রে? গুরুপদ হেসে বললেন, ‘আদির একটা মার্কেট ভ্যালু আছে। আদি কবি বাল্মীকি, ব্রাহ্ম সমাজ, আদি ঢাকেশ্বরী—পুরনো ঘিয়ের গন্ধ ভাই। আর শশি আমার লাক—দেখা যাক বাজারে লাগে কিনা!”
কাগজে পাঁজিতে বিজ্ঞাপন। শিয়ালদা হাওড়া স্টেশনে হ্যান্ডবিল। আমলা তেল বাজারে লেগে গেল। বাজারে মানে বাবুবিবিদের বাজারে নয়, ছাপোষা গরিব-গুর্বোদের ঘরে। মফস্বলে মার্কেট হয়ে গেল। আমলার সাফল্যে খুশি হয়ে গুরুপদ ‘চর্মদশানন চালমুগরায়’ নেমে গেলেন। পাঁজিতে পাতাজোড়া বিজ্ঞাপন। বিবিধভারতীতে স্পট। চমর্দশাননও সাকসেস। তারপর মুখশোভা শঙ্খ চন্দন চূর্ণ।
সাত আট বছরের মধ্যে গুরুপদ পায়ের তলায় শক্ত মাটি পেয়ে গেলেন। শোভাবাজারের দিকে একটা ভাঙা পোড়া বাড়ির নীচের তলার একপাশে তাঁর ‘শশিতারা কোং’ চলতে লাগল। চলতে চলতে পুরো নীচের তলাটাই তাঁর কারখানা হয়ে গেল। জনা তিরিশ লোক খাটে কারখানায়।
গুরুপদ টাকার স্বাদ বোঝার পর থেকেই মন প্রাণ ঢেলে দিলেন ব্যবসায়। আজ বিশ বছরে তিনি না করলেন কী! পাইকপাড়ায় তেতলা বাড়ি করেছেন। কারখানার জন্যে একটা ভ্যান রয়েছে। মধ্যমগ্রামের দিকে বাগান কিনে ফেলে রেখেছেন।
ভাগ্য একদিকে গুরুপদকে যথেষ্ট দিয়েছে। অন্যদিকে অবশ্য মেরে রেখেছে। গুরুপদরা সন্তানহীন।
বছর সাত আট অপেক্ষা করার পরও যখন শশিতারার কিছু হল না, ডাক্তার বদ্যি, তাবিজ মাদুলি, পাথর, মায় উত্তরপাড়ার ডাকসাইটে তান্ত্রিক গুরুর যাগযজ্ঞ পর্যন্ত বিফলে গেল—তখন শশিতারা বললেন, দত্তক নেবেন। গুরুপদ আপত্তি করলেন না। করে কী লাভ? স্ত্রী থেকেই তাঁর ভাগ্যে শশির উদয়। স্ত্রীকে ভয়ভক্তি করেন গুরুপদ। ভালও বাসেন।
শশিতারা তাঁর এক সম্পর্কের বিধবা বোনের ছেলেকে হাফ দত্তক নিলেন। মানে লালনপালনের সব দায়দায়িত্ব। কিন্তু আইনগতভাবে নয়। সে বোনও বিগত হল।
গুরুপদর একটা মেয়ে মেয়ে শখ ছিল। বছর কয়েক পরে গুরুপদর ইচ্ছে হল, এক ভাগ্নিকে নিজের কাছে এনে রাখেন। না, দত্তক নয়। গুরুপদর কোষ্ঠীতে নিষেধ বলছে। বিষ্টপুর থেকে ভাগ্নিকে তুলে এনে নিজের ঘরে আশ্রয় দিলেন গুরুপদ। সেই ভাগ্নির বয়েস এখন কুড়ি। নাম, বেলা।
দত্তকরূপী ছেলের নাম ছিল চাঁদু। নাম পালটে শশিতারা তাকে সুশান্ত করে দিয়েছেন। ডাকেন, শানু বলে।
ছেলে একেবারে তৈরি। বছর বাইশ তেইশ বয়েস বড়জোর। এখনই দোল দুর্গোৎসবে দু এক পাত্র টানতে শুরু করে দিয়েছে। দিনে দু তিন প্যাকেট সিগারেট ওড়ায়।
গুরুপদ কিছু বলতে পারেন না। বললেই শশিতারা খরখর করে ওঠেন। ছেলে আমার বলে তোমার চোখ টানছে। আর নিজের মেয়ের বেলায়? তাঁর তো সাবান শ্যাম্পু চুল ছাঁটা গানের ক্লাস ছাড়া করার কিছু দেখি না। নিজের বেলায় চোখ বুজে থাকো, তাই না?
তা বেলার বেলায় গুরুপদ যতটা স্নেহান্ধ, শানুর বেলায় ততটা নয়। আর শশিতারা শানুর বেলায় যতটা লাগামছাড়া বেলার বেলায় ততটা নয়। তবে, একথা স্বীকার করতেই হবে, ছেলে মেয়ে দুটো এমনিতে খারাপ নয়; বয়েসের টানে খানিকটা তরল, চঞ্চল চপল; টাকাপয়সার সাফল্যে কিছুটা বেহিসেবি, বিলাসী। কী আর করা যাবে? গুরুপদ আর শশিতারার টাকা খাবে কে? ওদের জন্যেই সব।
