প্রসাদ আমার কাছে ক্ষমা চেয়েছে।
সত্যিই!
জার্মানি থেকে চিঠি পেয়েছে, সামনে জুলাইয়ে গাইতে যাবে। বলেছে আমাকে নিয়ে কন্টিনেন্ট ঘুরবে।
ভালোবাসা দেখছি উথলে উঠেছে। স্লিপিং পিল গোটা দশেক পাঠিয়ে দেব নাকি রে!
না বাবা, রক্ষে কর। এখন আমার ঘুম হয়, প্রসাদ বলে নাকও নাকি ডাকে। পুনি, এখন আমি রাখছি, ছেলে-মেয়ে ঝগড়া করছে, না থামালে রক্তারক্তি হয়ে যাবে, রাখছি রে।
টেলিফোন রেখে পূর্ণিমা স্বামীর দিকে তাকিয়ে বলল, লোডশেডিং।
ইনভার্টার থাকায় পাখা, আলোর সঙ্গে টিভিও চালু হয়েছে। হিন্দি সমাচার শুনতে শুনতেই সুরেন বলল, আবার বাচ্চা হবে?
হ্যাঁ, প্রসাদ ক্ষমা চেয়ে নিয়েছে।
তারা আর এই প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলেনি। পূর্ণিমা এক বার বারান্দার গেল। ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে দোকানগুলোয় মোমবাতি জ্বলছে। মিনিবাস স্টপে কয়েক জন দাঁড়িয়ে। একটা পুলিশের জিপ ইন্দ্রনগরে ঢুকল।
বারান্দা থেকে ভিতরে আসতেই কাজের মেয়েটি ফিসফিস করে বলল, বউদি একটা মেয়েছেলে নীচে তোমায় ডাকছে।
কে? চিনিস?
আগে কখনো দেখিনি। বলল বউদিকে ডেকে দাও খুব দরকারি কথা আছে।
একতলায় সিঁড়িতে হারিকেন জ্বলছে। সিঁড়ি আর সদর দরজার মধ্যে ছোটো জায়গাটায় স্ত্রীলোকটি দাঁড়িয়ে। তাকে দেখেই পূর্ণিমার মনে হল, এই হল মলি।
গৌতম পাঠিয়ে দিল, আমি ওর বউ।
বুক কেঁপে উঠল পূর্ণিমার। গৌতমের আর তো কোনো দরকার নেই। মিছিমিছি একটা মেয়ের সর্বনাশ সে করল। প্রসাদ তো ফিরেই এসেছে জ্যোতির কাছে। শুধু খবরটা জ্যোতি যদি আজ সকালেও জানাত তাহলে যেভাবেই হোক সে গৌতমকে জানিয়ে দিত, দরকার নেই। টাকাটাও আর ফেরত চাইত না।
হয়ে গেছে। গৌতম বলল বাকি টাকাটা এক্ষুনি দিতে। মলি কাজের মেয়েটির দিকে তাকাল। পূর্ণিমার পাশে দাঁড়িয়ে সে শুনছে।
তুই এখন ওপরে যা, এর সঙ্গে কথা আছে।
পূর্ণিমা মুখ ফিরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে ওর উপরে ওঠা দেখে, মলির দিকে এগিয়ে এসে ভীত গলায় ফিসফিস করে বলল, মেয়েটিকে কি খুবই… মানে বেশি কিছু তো হয়নি?
মলিও চাপা স্বরে বলল, আমাকে তো ও বলল, যা অন্ধকার ছিল তাতে কিছুই প্রায় দেখা যাচ্ছিল না। এতে অবশ্য সুবিধেই হয়েছে, কেউ ওকে দেখতে পায়নি। আপনাকে নিশ্চিন্তি থাকতে বলেছে আর কারুর কাছে কখনো গল্প করবেন না। তাতে আপনিই বিপদে পড়বেন।
জানি, কিন্তু মেয়েটির অবস্থাটা জানতে পারলে…। পূর্ণিমার উৎকণ্ঠার সঙ্গে সহানুভূতি মিশে আছে।
মলি ঝুঁকে পূর্ণিমার মুখের কাছে মুখ এনে সান্ত্বনা দেবার মতো স্বরে বলল, মেয়েটার বোধ হয় কিছু হয়নি, হলেও খুব অল্পই হবে। ও বলল পাশের লোকটা মেয়েটাকে দু-হাতে জড়িয়ে চুমু খাচ্ছিল। অন্ধকারে ও প্রথমে সেটা টের পায়নি। অ্যাসিড মারার পর লোকটাই প্রথম চেঁচিয়ে ওঠায় ও বুঝতে পারল মালটা কোথায় গিয়ে পড়েছে। কী বজ্জাত পোক বাবা!…বউদি একটু তাড়াতাড়ি এনে দিন।
গুণ্ডাদ্বয়
ভোররাতে সুমিত্রার গর্ভপাত ঘটল।
পান-বসন্তে ছ-দিন ধরে ভুগছে। জ্বর উঠল একশো তিন। নিখিল শুয়েছিল মেঝেয়। সুমিত্রার চিৎকারে ঘুম ভেঙে দেখল বিছানায় বসে চাপা আতঙ্কে ও তখন চ্যাঁচাচ্ছে, বেরিয়ে গেল, বেরিয়ে গেল।
আলো জ্বেলে নিখিল দেখে সুমিত্রার দুই ঊরুর মাঝে কাপড়টা ফুলে রয়েছে। একটু নড়তেই দলমল করে উঠল সেই স্ফীতি। সুমিত্রা সাত মাসের পোয়াতি। ফ্যালফ্যাল করে নিখিলের দিকে তাকিয়েছিল। চোখ সরিয়ে নিল নিখিল। বসন্তের ক্ষতে মুখটা খোদলানো। পাশের ঘরে মা ঘুমোচ্ছে, তাকে ডেকে তুলল।
বাড়িওয়ালার বউ উপর থেকে নেমে এসে পরামর্শ দিল ডাক্তার ঢাকতে। পাড়ার ডাক্তারকে ঘুম থেকে তুলে আনল নিখিল। তিনি সুমিত্রার নাড়ি কেটে পনেরোটি টাকা নিয়ে যাওয়ার সময় বলে গেলেন ভয়ের কিছু নেই অর্থাৎ টাকা খরচ হবে না। বিছানার চাদর তোশক রক্তে জবজব করছে। সুমিত্রার শায়ার রং বদলে গেছে, শাড়ির কিছু অংশে রক্ত। এসব ফেলে দেওয়া ছাড়া উপায় নেই। ওকে কাপড় বদলিয়ে মা সেই চাদর, শায়া ও শাড়ি ঘরের এক কোণে জড়ো করে রেখেছেন, সেইসঙ্গে সুমিত্রার পেট থেকে যে-জিনিসটা বেরিয়েছে সেটাও।
বাড়িতে ধাঙড় আসতেই বাড়িওয়ালার বউ তাকে এই জিনিসগুলো ফেলে দিতে বলল। দেখেই সে মাথা নাড়ল। এ কাজ তার দ্বারা হবে না, পুলিশে ধরলে ফাটকে পুরে দেবে। দশ টাকা বকশিশ কবুল করেও তাকে রাজি করানো গেল না। তখন বাড়িওয়ালার বউ বাড়িওয়ালার সঙ্গে পরামর্শ করে এসে বলল, ডাক্তারের কাছ থেকে সার্টিফিকেট আনো। সেটা দেখালে পুলিশ কিছু বলবে না। উনি বললেন, এ তো আর আইবুড়ো বা রাঁড়ির পেট-খসানো মাল নয়। ভদ্রঘরের বউয়ের অ্যাকসিডেন্ট। তুমি বাপু ডাক্তারের কাছেই যাও।
তাই শুনে নিখিল ডাক্তারের কাছে ছুটল। তখন ডাক্তার বাড়ি ছিল না, কখন আসবে তারও ঠিক নেই। বাড়ি ফিরে সাত মাসের সন্তানটিকে বিছানার চাদর, শাড়ি ও শায়ার উপর রেখে নিখিল পরিপাটি করে ভাঁজ করল। শাড়ির পাড় ছিঁড়ে নিয়ে বেশ শক্ত করে বাঁধল যাতে জিনিসটার আকৃতি ছোটো হয়। তার উপর খবরের কাগজ মুড়ল। তাতে হুবহু মনে হতে লাগল একটা কাপড়ের প্যাকেট। কিছুদিন আগেই হ্যাণ্ডলুম হাউস থেকে পর্দার কাপড় ও ব্লাউজের ছিট কেনা হয়েছে। দোকানের নাম লেখা ছাপা কাগজের থলিতে জিনিসটা এখন রেখে দেওয়া আছে। তাইতে নিখিল প্যাকেটটা ভরে খাটের নীচে রেখে দিল। সুমিত্রা শুয়ে শুয়ে দেখছিল, কাতরস্বরে সে বলল, শাড়িটা তো কাচিয়ে নিয়ে পরা যায়। একটুখানি জায়গায় তো মোটে লেগেছে।
