আনন্দ শোনো।
ফটক ঘেঁষে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে। আনন্দ প্রথমে ভয় পেয়ে গেছল আচমকা ডাক শুনে।
কী বলল ডগুদা আমার সম্পর্কে?
তোমার সম্পর্কে কোনও কথা তো হয়নি।
হয়েছে, আমি জানি। সবাই কৌতূহলী হয়। আমার পা, আমার হাঁটা দেখে হয়। তুমিও হয়েছ।
আনন্দ চুপ করে রইল। বাড়ির মধ্য থেকে হাঁকডাক আসছে না। বিপিনদা এখনও হয়তো ফেরেনি।
না, ওসবে আমার কৌতূহল নেই। তবে যতবারই দেখেছি, তুমি একটা না একটা কিছু দিচ্ছ—হয় বল ফিরিয়ে দিচ্ছ, মাঠ থেকে ইট তুলে ফেলে দিচ্ছ, বই এনে দিচ্ছ, কেন?
ভাল লাগে।
ব্যস, এই!
হ্যাঁ। আমার পক্ষে এর বেশি কিছু করা কি সম্ভব?
কেন, সেদিন যে বললে, খেলি! কী খেল, কোথায় খেল? এসো না আমার ঘরে, গল্প করব। একতলার একদম পিছন দিকে নিরিবিলি ঘরটা।
আনন্দ হাত ধরল অমলের। আস্তে হাতটা ছাড়িয়ে নিল ও।
আমি কারুর বাড়ি যাই না।
এলে কিন্তু ভাল লাগত। দিনরাত একা একটা ঘরে বন্দির মতো বাস করছি। হার্টের অসুখ, আমার হাঁটা পর্যন্ত বারণ। এখন লুকিয়ে বেরিয়েছি, জানতে পারলে ভীষণ বকুনি খেতে হবে।
কে বকবে, মা?
আনন্দ হেসে উঠল।
মা নেই।
ওহ। আমারও নিজেরও মা নেই। তার জন্য আমার অবশ্য কোনও দুঃখ নেই। এই মা আমাকে ছোট থেকে নিজের ছেলের মতো ভালবেসেছে। আমার জন্য আজও কষ্ট করছে।
শুনলুম ডগুদার কাছে।
তা হলে আমাকে নিয়ে কথা হয়েছে।
শুধু এইটুকুই।
আমার খুব অস্বস্তি হয় যখন কেউ আড়ালে আমার সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞাসা করে। কেন যে হয় জানি না। লোকে আমাকে দেখে আড়ালে হাসে। একা থাকতেই ভালবাসি।
আর আমি সঙ্গ পাবার জন্য ছটফট করছি।
দুজনের ব্যাপারটা দুরকম। আমার চেহারা, এই খোঁড়া পা, আর তোমার হার্ট। তুমি বল করো, আর আমি কুড়োই।
আমার খেলা চিরতরে বারণ হয়ে গেছে। আমার যা অসুখ তা সেরে ওঠার নয়। কিন্তু তুমি তো খেল। কী খেলা বললে না তো।
উত্তর শোনার আগেই আনন্দ দেখল বীরা দত্ত রোড থেকে বিপিনদা মাঠের দিকে এগোচ্ছে। হাতে ইস্ত্রি করানো কাপড়ের পাঁজা।
আমি পালাই।
আনন্দ ছুটে বাড়ির মধ্যে ঢুকে পড়ল।
.
গভীর রাতে একবার তার ঘুম ভেঙেছিল। তখন হঠাৎ আপনা থেকেই তার মনে হয়, পাখিটা এইবার হয়তো ডাকবে। সে অপেক্ষা করে। দোতলা থেকে ক্ষীণভাবে সেতারে আলাপের শব্দ আসছে। মেজদা টেপরেকর্ডার চালাচ্ছে। নিখিল ব্যানার্জির বেহাগ। বড়দা কানাডা থেকে পাঠিয়েছে রেকর্ডারটা। নিজের নিশ্বাস ছাড়া আনন্দ আর কিছু এখন শুনতে চায় না। হৃৎপিণ্ডটা ধকধক করে যাচ্ছে আর ক্রমশ একটা ভয় তাকে আচ্ছন্ন করে দিচ্ছে। এই ধকধকানিটা বন্ধ হয়ে গেলেই সে মরে যাবে। ওটা বন্ধ হবার নোটিশ জারি হয়ে গেছে। কেউ না বললেও সে সকলের হাবভাব থেকে বুঝতে পারছে, গুরুতর কিছু একটা হয়েছে। এই শব্দটা সচল রাখার জন্য তাকে সাবধানে, কম নড়াচড়া করে বন্দি জীবন কাটাতে হচ্ছে। কী দারুণ, ভয়ঙ্কর আর মিষ্টি এই হার্টের শব্দ। প্রাণভরে এমন করে সে আগে কখনও শোনেনি। মেঝেয় শোয়া হাবুর মার নাকডাকার শব্দ শুনতে শুনতে তারপর কখন যেন সে আবার ঘুমিয়ে পড়ে।
সকালে জানলা থেকেই আনন্দ দেখল মেয়েদের দৌড় শেখা। ওদের সঙ্গে হাফপ্যান্ট পরে লেডি সোবার্সও দৌড়চ্ছে। শট ছোড়া দেখতে পেল না। সেজন্য বাইরের রকে যাওয়া দরকার।
অরুণ প্রতিদিনের মতো দেখতে এল আনন্দকে।
মেজদা, আর এভাবে থাকতে পারব না। আমি ভাল হয়ে গেছি।
কী করে বুঝলি?
কেন, এই তো দিব্যি চলাফেরা করছি, বুকে কোনও কষ্ট হচ্ছে না।
দিব্যি আছিস বিশ্রাম নেওয়ার জন্য। ঘোরাঘুরি করলে দিব্যি থাকতিস না। আচ্ছা, দিনে একবার ফটকের কাছে যাবার পারমিশান দিলাম।
আনন্দর সন্দেহ হল এত সহজে চট করে মেজদার উদার হয়ে যাওয়ায়। ডাক্তারবাবু নিশ্চয় আরও বেশি অনুমতি দিয়েছে, অনেক আগেই। মেজদা সাবধান হবার জন্য চেপে রেখেছিল, এখন টিপে টিপে ছাড়ছে।
ফটক নয়, লাইব্রেরি পর্যন্ত, আর একবার মন্দিরেও।
ওরে বাবা, মন্দির! রাস্তা পার হওয়া চলবে না। গাড়ি এসে পড়লেই তো ছুটবি। না, না, শুধু লাইব্রেরি পর্যন্ত।
দিনে দুবার, সকালে আর বিকেলে।
উহু, একবার।
তা হলে, ঘরে কিন্তু স্কিপিং শুরু করব।
আনন্দ মিছিমিছি ভয় দেখাচ্ছে না। এটা অরুণ বুঝতে পারল ওর চোখের দিকে তাকিয়ে। অনুমতি দিয়ে ঘর থেকে বেরোচ্ছে, আনন্দ ডাকল। তোমার টেপরেকর্ডারটা আমাকে দাও না, দেবে?
কী করবি? ট্রানজিস্টার তো রয়েছে।
ভাল লাগে না রেডিয়ো। আমি তোমার টেপগুলো চাই না, শুধু রেকর্ডার আর নতুন একটা ক্যাসেট। টেপ করব আমি।
নিজের গান?
গান কি জানি। যখন যা আমার মনে আসবে বলব, অন্যের কথা, হাবুর মা বিপিনদার ঝগড়া, ডগুদার গলা, গাছের পাতার শব্দ আর একটা পাখির ডাক। খুব মিষ্টি সুন্দর ডাক।
নষ্ট করবি না, ভাঙবি না?
আনন্দ জোরে মাথা নাড়ল।
আচ্ছা, কাল কি পরশু টেপ কিনে এনে দেব।
বিকেলে শিবা দত্তর কারখানার দুটি লরি মাঠের প্রায় মাঝখানে দাঁড়িয়ে মাল খালাস করছে। মাঠের উপর লোহার চাদর স্তৃপ করে রেখে একটা লরি চলে গেল। মেয়েরা দৌড়তে এসেছে। অপেক্ষা করে করে ওরা চলে যাচ্ছিল। আনন্দ রক থেকে লক্ষ করছিল, এবার এগিয়ে এল।
তোমরা চলে যাচ্ছ কেন, দাঁড়াও।
মেয়েরা দাঁড়িয়ে গেল। আনন্দ লরি সরিয়ে নেবার জন্য ড্রাইভারকে বলল। কর্ণপাত করল না লোকটি।
