বিদেশে ভারতের অভাব অথবা সমস্যা সম্পর্কে আলোচনায় তাহার ঘোর আপত্তি ছিল, এবং তাহার উপস্থিতিতে ঐ প্রকার আলোচনায় তিনি নিজেকে অপমানিত বোধ করিতেন। পক্ষান্তরে, সমগ্র জগৎ বিপক্ষে থাকিলেও কোন স্বদেশবাসীকে সাহায্য করিতে তিনি কখনও পশ্চাৎপদ হইতেন না। যদি কোন ভারতীয় কোন বিষয়ে অনুসন্ধান দ্বারা এমন এক সিদ্ধান্তে উপনীত হইয়া থাকেন, যাহা ইউরোপীয়দের সিদ্ধান্তের বিপরীত, তাহা হইলে ঐ বিষয়ে তাহাদের শত যুক্তি তর্কও তাহার নিকট আসিয়া যাইত। বালকের সরলতার সহিত তিনি স্পষ্ট উত্তর দিতেন, “আশা করি, আপনি আরও সূক্ষ্মতর যন্ত্রপাতি আবিষ্কার করবেন, আপনার মাপজোখ আরও নিখুঁত হবে, যাতে আপনার প্রতিপাদ্য বিষয়টি প্রমাণিত হতে পারে।”
এইরূপে, যদিও অপর সকলে তাহাকে লইয়া গর্ব অনুভব করিতেন যে, তিনি সমগ্র বিশ্বেরই অধিবাসী ও তত্ত্বজিজ্ঞাসু ছাত্র, তিনি স্বয়ং কিন্তু ভারতে জন্মগ্রহণ করিয়াছেন বলিয়াই সর্বদা গৌরব বোধ করিতেন। আর রাজোচিত পারিপার্শ্বিক আবেষ্টনী ও নানা সুযোগ-সুবিধার মধ্যে অবস্থান করিলেও তিনি যে সন্ন্যাসী, ইহাই লোকের নিকট দিন দিন স্পষ্টতর ভাবে প্রকাশ পাইত।
———-
(১) ২৯ সেপ্টেম্বর।—অনুঃ
১৭. স্বামীজী-প্রচারিত মতসমূহের সমষ্টিভাবে আলোচনা
খ্রীস্টের জন্মের কয়েক শতাব্দী পূর্বে বুদ্ধের আবির্ভাব দ্বারা দ্বিবিধ প্রয়োজন সাধিত হয়। যে শক্তিপ্রবাহ স্বদেশ হইতে নির্গত হইয়া দূরবর্তী দেশসমূহকে সঞ্জীবিত করিয়াছিল, একদিকে তিনি ছিলেন তাহার উৎসস্বরূপ। ভারতবর্ষ তাহার বাণী সমগ্র প্রাচ্য জগতে বিস্তার করিয়া অবশেষে নিজ সীমার বহুদূরে অবস্থিত বিভিন্ন দেশে নানা জাতি, ধর্মসম্প্রদায়, সাহিত্য, কলা ও বিজ্ঞানচর্চার স্রষ্টারূপে গণ্য হয়। কিন্তু ভারতের নিজসীমার মধ্যে ঐ মহাপুরুষের জীবনই ছিল জাতি সংগঠনের প্রথম উপায়স্বরূপ। উপনিষদ্-নিহিত আর্য সংস্কৃতি আপামর জনসাধারণের মধ্যে প্রচার করিয়া বুদ্ধ সাধারণ ভারতীয় সভ্যতার আদর্শ নির্ণয় করেন, এবং ভাবীকালের জন্য এক অখণ্ড ভারতীয় জাতির সূত্রপাত করেন।
যে মহান জীবনের পরিচয় আমি লাভ করি, আমার স্থির বিশ্বাস, সেই জীবনেও অনুরূপভাবে দ্বিবিধ প্রয়োজন সাধিত হইয়াছেঃ প্রথম-সমগ্র জগতে এক আলোড়ন সৃষ্টি করা; দ্বিতীয়—এক মহাজাতি সংগঠন। বিদেশের কথা বলিতে গেলে, স্বামী বিবেকানন্দই পাশ্চাত্য জাতিসমূহের নিকট বেদ ও উপনিষদের ভাবাদর্শের প্রথম প্রামাণিক ব্যাখ্যাকার। তাহার নিজস্ব কোন ধর্মমত প্রচার করিবার ছিল না। তিনি বলিয়াছিলেন, “বেদ ও উপনিষদ্ ব্যতীত আমি অন্য কোন গ্রন্থ থেকে কখনো কিছু উদ্ধৃত করিনি, এবং তাদের মধ্য থেকেও কেবল শক্তির কথাই বলেছি।” স্বর্গের পরিবর্তে তিনি প্রচার করেন মুক্তি, পরিত্রাণের পরিবর্তে ‘জ্ঞানলাভ’; ঈশ্বরের পরিবর্তে সর্বব্যাপী বা সর্বভূতে অবস্থিত অখণ্ড ব্রহ্মের সাক্ষাৎকার ছিল তাহার উপদেশ, এবং কোন বিশেষ ধর্মের মাহাত্ম ঘোষণার পরিবর্তে তিনি ঘোষণা করিতেন সকল ধর্মের সত্যতা।
পাশ্চাত্য পণ্ডিতগণ সময়ে সময়ে বিস্মিত এবং অস্বাচ্ছন্দ্য বোধ করিতেন যে, ধৈর্যসহকারে বহু গবেষণার দ্বারা তাহারা যে-সকল সিদ্ধান্তে উপনীত হইয়াছেন, এই প্রচারক ধর্মব্যাখ্যাতার স্বভাবসিদ্ধ ওজস্বিতার সহিত সেই সব কথা জীবন্ত সত্যের ন্যায় অনর্গল বলিয়া যাইতেছেন। কিন্তু তাহারা যত প্রকার পরীক্ষাই উপস্থিত করুন না, এই প্রচারকের পাণ্ডিত্য অনায়াসে তাহাদের বহু ঊর্ধ্বে অবস্থিত বলিয়া প্রমাণিত হইত। তাঁহার প্রচারিত মতবাদ কেবল বিদ্যালয়ে অধিগত দর্শনচর্চামাত্র ছিল না, যাহা ঐতিহাসিক ও প্রাচীন ভাষাবিদ্যাগত—অতএব লোকের চিত্তাকর্ষক হইবে, উহা ছিল এক জীবন্ত জাতির হৃদয়েব চিরপোষিত বিশ্বাস, যে জাতি পঞ্চবিংশ শতাব্দী ধরিয়া জীবনে-মরণে ঐ সত্য উপলব্ধি করিবার জন্য ক্রমাগত সংগ্রাম করিয়া আসিয়াছে। ধর্মগ্রন্থসকল তাঁহার নিকট জ্ঞানভাণ্ডারের দ্বার উন্মুক্ত করিয়া দেয় নাই; পরন্তু এক মহান জীবনের টীকা ও ব্যাখ্যাস্বরূপ ছিল, যে জীবনের অত্যুজ্জ্বল আলোকচ্ছটা ঐ সকল গ্রন্থের কোনরূপ সহায়তা ব্যতীত তাঁহার চক্ষুকে প্রতিহত করিত, এবং যাহার বিশ্লেষণে তিনি একান্ত অপারগ ছিলেন। ভগবান রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের জীবনই তাহার মনে এই ধারণা দৃঢ়বদ্ধ করিয়া দেয় যে, শঙ্করাচার্য প্রচারিত অদ্বৈতবাদই শেষ পর্যন্ত একমাত্র সত্য। পরমহংসদেবের জীবনই তাহার নিজস্ব অনুভূতির দ্বারা দৃঢ় হইয়া তাহাকে হৃদয়ঙ্গম করাইয়া দেয় যে, বিশিষ্টাদ্বৈতবাদ, দ্বৈতবাদ প্রভৃতি যে-সকল বিভিন্ন মতবাদ সেই ‘একমেবাদ্বিতীয় অবস্থায় উপনীত হইতে না পারিলেও প্রায় উহার সমীপবর্তী হইয়াছে, তাহারাও অবশেষে অদ্বৈতাবস্থারূপ সর্বশ্রেষ্ঠ অনুভূতিরই নিম্নতর বিভিন্ন অবস্থা বলিয়া প্রমাণিত হইবে।
কিন্তু এই চরম আদর্শের প্রকাশ হিসাবে প্রত্যেক ব্যক্তির আন্তরিক বিশ্বাসই সত্য। শ্রীরামকৃষ্ণ বলিয়াছিলেন, “যেখানে অন্যান্য লোকে উপাসনা করে, সে স্থানকে প্রণাম ও পূজা করবে, কারণ লোকে যে রূপে তাকে আরাধনা করে, তিনি সেইরূপেই তাকে দেখা দেবেন–এটা ধ্রুব সত্য।” স্বামীজী বলিলেন, “পৃথিবী ও সূর্যের মধ্যে যে ব্যবধান, তার প্রতি পদক্ষেপে যদি আমরা কল্পনার সাহায্যে সূর্যের এক-একটি ফটো তুলি তাহলে তার কোন দুইটিই পরস্পরের অবিকল অনুরূপ হবে না, তবু ঐ ফটোগুলির মধ্যে কোটিকে তুমি অসত্য বলতে পার?” এই সকল উক্তির তাৎপর্য এই যে, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের বিভিন্ন ধর্মমতের মধ্যে যে বিরোধ, তাহাদের সমন্বয় সম্ভব। কিন্তু দক্ষিণেশ্বরের সেই আচার্যশ্রেষ্ঠ যখন সাধনা দ্বারা আবিষ্কার করিলেন যে, নারীগণের জীবনেও উচ্চতম জ্ঞানলাভ সম্ভব, তখন হয়তো আমাদের এইরূপ ধারণা সঙ্গত বলিয়া মনে হইতে পারে যে, সাধারণতঃ যে-সকল ব্যবহারকে সামাজিক ও সাংসারিক বলিয়া হেয় করা হয়, তাহাদেরও পবিত্ৰজ্ঞানে যথোচিত সমাদর করিতে হইবে। যে জগতে রূপকের এত আধিক্য, যেখানে শত শত বস্তু প্রতীকরূপে ব্যবহৃত হইয়া ঈশ্বরের উদ্দীপনা সৃষ্টি করে, সেই জগতে তিনি নিঃসন্দেহে প্রমাণ করিয়া দিলেন যে, মন্দিরে পূজা-অর্চনার ন্যায় গৃহকর্মের সম্যক অনুষ্ঠান ভগবানলাভের সহায়ক হয়; মন্দিরে পুরোহিত দেবতার উদ্দেশে ভোগ নিবেদন করিয়া যে আশীর্বাদ লাভ করেন, গৃহে জননী বা পত্নী অন্নব্যঞ্জন প্রস্তুত করিয়া পরিবারের সকলকে পরিবেশনপূর্বক তাহা অপেক্ষা কম ভগবৎকৃপা লাভ করেন না। শ্রীরামকৃষ্ণ বলিয়াছিলেন, “যা কিছু সবই মায়ার ভেতরে ঈশ্বরের নাম পর্যন্ত। কিন্তু এই মায়ার কতক অংশ জীবকে মুক্তির পথে সাহায্য করে; বাকি অংশ শুধু অধিকতর বন্ধনের মধ্যে টেনে নিয়ে যায়। আমার মনে হয়, সাধ্বী নারীর প্রাত্যহিক জীবনও যে এইরূপে ঈশ্বরের আশীর্বাদলাভে ধন্য হইয়া থাকে, গৃহ যে মন্দিরস্বরূপ, এবং শিষ্টাচার, অতিথির সেবা ও সাংসারিক ব্যপালন প্রভৃতি যে এক দীর্ঘকালব্যাপী পূজার অঙ্গরূপে পরিণত হইতে পারে—ইহা প্রদর্শন করিয়া শ্রীরামকৃষ্ণ উত্তরকালে তাঁহার মহান শিষ্যের জীবনে এক মুখ্য চিন্তাধারার ভিত্তি স্থাপন ও অনুমোদন করিয়া গিয়াছিলেন।
