পরবর্তী বত্সরগুলিতে তাহার ভারত-ভ্রমণকালে স্বামীজী উহার পৃথক পৃথক ধর্মমতবিশিষ্ট অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সম্প্রদায়গুলিকে বিশেষভাবে পর্যবেক্ষণ করেন এবং উহার প্রত্যেকটির মধ্যে তিনি সেই ধর্মজ্যোতির সামান্য একটু আধটু প্রকাশ দেখিতে পান, যাহার পূর্ণ বিকাশ তাহার গুরুদেবের চরিত্রেই দেখিয়াছিলেন। কিন্তু ১৮৯৩ খ্রীস্টাব্দে যখন ভারতের বাহিরে পৃথিবীর অন্যান্য দেশগুলি দেখিতে আরম্ভ করেন, তখনই তিনি জাতীয়তা ও দেশাত্মবোধ দ্বারা একতাবদ্ধ জনসঙঘসমূহের সম্মুখীন হইলেন। আর স্বভাবতই স্বদেশের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মতো এই সকল জনসমষ্টির মধ্যেও তিনি মানবের অন্তর্নিহিত সেই ব্ৰহ্মভাবের লীলাবিলাস অনুভব করিতে লাগিলেন। বহু বৎসর ধরিয়া ইহা তাহার সম্পূর্ণ অজ্ঞাতসারেই ঘটিতেছিল; তথাপি বিভিন্ন জাতির মধ্যে তাহাদের বিশেষ গুণগুলি অনুধাবন করিবার যে আন্তরিক চেষ্টা তিনি করিতেন, অন্তরঙ্গ ভক্ত মাত্রকেই তাহা আকৃষ্ট করিয়াছিল।
একদিন ইংলণ্ডযাত্রার পথে তিনি অত্যন্ত আনন্দসহকারে আমাকে তুর্কী নাবিকের দক্ষতা ও অপূর্ব সৌজন্যের বিষয় বলিতেছিলেন, তখন আমি তাহার চরিত্রের ঐ বিস্ময়কর উৎসাহ প্রদর্শনের প্রতি তাহার দৃষ্টি আকর্ষণ করি। সম্ভবতঃ তিনি জাহাজের খালাসীদের কথা ভাবিতেছিলেন; তাহার প্রতি তাহাদের বালকের ন্যায় প্রীতিপূর্ণ ব্যবহার তাহাকে বিশেষভাবে মুগ্ধ করিয়াছিল। যেন আমি তাহাকে কোন দোষে অভিযুক্ত করিয়াছি, এইভাবে তিনি শুধু বলিলেন, “কি জান, আমার মুসলমানদের আমি ভালবাসি।” উত্তরে আমি বলি, “তা বুঝলাম, কিন্তু আমি জানতে চাই, এই যে প্রত্যেক জাতিকে তাদের শ্রেষ্ঠ গুণগুলির দিক থেকে বুঝতে চেষ্টা করার অভ্যাস, এ আপনি কোথা থেকে পেলেন? কোন ইতিহাসপ্রসিদ্ধ ব্যক্তির চরিত্রে কি আপনি এটা দেখতে পেয়েছেন? অথবা কোন সূত্রে শ্রীরামকৃষ্ণের কাছ থেকেই লাভ করেছেন”
ধীরে ধীরে তাহার মুখের বিস্মিত, কিংকর্তব্যবিমূঢ়ভাব অপনীত হইল। তিনি উত্তর দিলেন, “খুব সম্ভব এ শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের শিক্ষারই ফল। আমরা সকলেই কতকটা তারই পথে চলেছিলাম। অবশ্য, তিনি নিজে যে কঠোর সাধনার মধ্য দিয়ে গিয়েছিলেন, আমাদের ততদূর করতে হয়নি। তিনি যে-সব ব্যক্তির ভাব আয়ত্ত করতে চাইতেন, তাদের মতো আহার করতেন, তাদের পরিচ্ছদ ধারণ কবতেন; তাদের দীক্ষা গ্রহণ করতেন এবং তাদের ভাষাতেই কথা বলতেন। তিনি বলতেন, ‘আমাদের যেন অপরের সত্তার মধ্যে নিজেকে প্রবিষ্ট করাতে হবে। এই যে প্রণালী, এ তার নিজস্ব। ভারতবর্ষে এর পূর্বে কেউ এমনভাবে পর পর বৈষ্ণব, মুসলমান ও খ্রীস্টানধর্ম গ্রহণ করেননি।”
এইরূপে, স্বামীজীর দৃষ্টিতে প্রত্যেক জাতির জাতীয়ত্ব বিশেষ বিশেষ ধর্মমতের ন্যায় পবিত্রতাস্বরূপ বলিয়া গণ্য হইত। তাঁহার মতে, প্রত্যেকেই যেন আদর্শ মানবত্ব সম্পর্কে নিজের ধারণা প্রকাশ করিবার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করিতেছে। একবার তিনি সহসা বলিয়া ওঠেন, “যত বয়স হচ্ছে, ততই আমার মনে হচ্ছে, মনুষ্যত্ব বা ‘পৌরুষের মধ্যেই সব তত্ত্ব নিহিত রয়েছে।”
মনের এক স্বাভাবিক নিয়মানুসারে, যতই তিনি অন্যান্য জাতির শক্তির পরিমাণ ও প্রীতিকর গুণগুলির সহিত পরিচিত হইতে লাগিলেন, ততই ভারতবর্ষে জন্মগ্রহণের জন্য তিনি নিজেকে অধিকতর গৌরবান্বিত বোধ করিতেন; কারণ, যে-সকল গুণে তাহার জন্মভূমি সকলের উর্ধ্বে বিরাজ করিতেছিল, সেগুলি সম্বন্ধে প্রতিদিন তিনি অধিকতর সচেতন হইয়া উঠিতে লাগিলেন। বিভিন্ন যুগের ন্যায় বিভিন্ন জাতিকেও তিনি ক্রমান্বয়ে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি হইতে আলোচনা করিতেন—তাহাদের বিরাট সত্তার একটি দিকেই তাহার দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখিতেন না। রোমক সাম্রাজ্যের বংশধরদের তিনি সর্বদাই নিষ্ঠুর প্রকৃতি বলিয়া বিবেচনা করিতেন এবং জাপানীদের বিবাহসম্পৰ্কীয় ধারণা তাহার নিকট ভয়াবহ ছিল। তথাপি, কোন জাতির সম্পর্কে মতামত প্রকাশ করিবার সময় সর্বদা তিনি তাহাদের গঠনমূলক আদর্শ গুণগুলির প্রতি দৃষ্টি রাখিতেন, কখনও কোন সম্প্রদায়ের দোষগুলি দেখিয়াই বিচার করিতেন না। এই সকল বিষয়ে আলোচনার সময়ে আমি তাহাকে শেষ যেসব মন্তব্য করিতে শুনিয়াছি, তাহার অন্যতম হইল, “স্বদেশপ্রীতি দেখতে হলে জাপানীদের দেখ। পবিত্রতা চাইলে হিন্দুদের দেখ, আর যদি পৌরুষ দেখতে চাও, তবে ইউরোপীয়দের দিকে তাকাও।” তারপর জোরের সহিত বলিলেন, “কোন ব্যক্তির পক্ষে মানুষের গৌরবের বস্তু কি হওয়া উচিত, তা ইংরেজ যেমন বোঝে, জগতে আর কোন জাতি তেমন বোঝে না।”
এক ব্যক্তিগত আলোচনাকালে স্বামীজী বলিয়াছিলেন, ভারত সম্পর্কে তাহার বরাবর ইচ্ছা ছিল, “হিন্দুধর্মকে অপর ধর্মের উপর প্রভাবশালী করা।” সনাতন ধর্মকে সক্রিয় ও প্রচারশীল হইতে হইবে; বিশেষ উদ্দেশ্যে বিভিন্ন স্থানে প্রচারকদল প্রেরণ, ভিন্ন ধর্মাবলম্বীকে স্বমতে আনয়ন, এবং তাহার নিজের যে সকল সন্তান কুহকে পড়িয়া ধর্মান্তর গ্রহণ করিয়াছে, তাহাদের পুনরায় নিজ ক্রোড়ে গ্রহণের সামর্থ্য থাকা চাই; পরিশেষে জ্ঞাতসারে ও বিশেষ বিবেচনাপূর্বক নূতন নূতন ভাবকে আত্মসাৎ করিতে হইবে। স্বামীজী কি জানিতেন যে, কোন জাতি অথবা সম্প্রদায় যে মুহূর্তে নিজেদের জীবশরীরের ন্যায় সুসংবদ্ধ বলিয়া সচেতন হয়, সেই মুহূর্তে উহা অপরের উপর প্রভাবশালী এবং সক্রিয় হইয়া উঠে? তিনি কি জানিতেন যে, তিনিই তাহার পূর্বপুরুষগণের ধর্মের মধ্যে স্বস্বরূপ জ্ঞান উপলব্ধির পুনরুদ্বোধনে সহায়ক হইবেন? যেভাবে হউক, তাহার নিজের উক্তি অনুসারে প্রথমাবধি তাহার একমাত্র কার্য ছিল, ‘হিন্দুধর্মের সাধারণ ভিত্তিগুলি আবিষ্কার করা। স্বাভাবিক প্রেরণার বশে তিনি হৃদয়ঙ্গম করেন, এইগুলির আবিষ্কার ও দৃঢ় প্রত্যয়ের সহিত উহাদের সমর্থনই একমাত্র পন্থা, যাহা দ্বারা তিনি জননীস্বরূপ হিন্দুধর্মকে নিজের অটুট যৌবন ও শক্তি সম্বন্ধে এক আনন্দময় প্রত্যয়ে প্রতিষ্ঠিত করিয়া দিতে পারেন। বুদ্ধ কি ত্যাগ ও নির্বাণ প্রচার করেন নাই, এবং যেহেতু এই ত্যাগ ও নির্বাণলাভ জাতীয় জীবনের সারবস্তু, তাহার দেহাবসানের দুই শতাব্দীর মধ্যেই কি ভারতবর্ষ এক শক্তিশালী সাম্রাজ্যে পরিণত হয় নাই? সুতরাং স্বামীজীও সেইরূপ জাতীয় জীবনের পক্ষে অপরিহার্য সার বস্তুগুলির উপর নির্ভর করিয়া তাহাদের প্রচার করিবার সঙ্কল্প গ্রহণ করেন—ফল যাহা হয় হউক।
