নিজের শারীরিক গঠনের মধ্যে, তাঁহার মোঙ্গলীয়সদৃশ চোয়ালের জন্য তিনি বিশেষ গর্ববোধ করিতেন। উহাকে তিনি বুলডগের লক্ষণ অর্থাৎ কিছুতেই লক্ষ্যভ্রষ্ট না হওয়ার চিহ্ন বলিয়া গণ্য করিতেন। তিনি বিশ্বাস করিতেন, মোঙ্গলদের এই বিশেষ গুণটি আর্য জাতির সকল শাখা-প্রশাখার মধ্যে অনুস্যত হইয়া আছে, এবং সেজন্য একদিন উহার উল্লেখপূর্বক বলিয়া ওঠেন, “দেখছ না ? তাতার জাতিই আর্যজাতির মদিরাস্বরূপ। তাতার জাতিই সকলের রক্তে শক্তি ও বল সঞ্চার করেছে।”
পারিপার্শ্বিক অবস্থার প্রতি তাহার উদাসীনতার গৃঢ় কারণ অনুসন্ধান করিতে হইলে স্মরণ রাখিতে হইবে যে, সর্বদাই তাঁহার প্রচেষ্টা ছিল চিন্তার সহায়ক আদর্শ স্থান খুঁজিয়া বাহির করা। প্রত্যেকটি পরিবার, গৃহস্থালীর প্রত্যেকটি মুখ্য উপকরণ তাঁহার নিকট সেই পরিমাণে সমাদর লাভ করিত, যে পরিমাণে তাহারা উচ্চতম চিন্তাশীল জীবনগঠনের পক্ষে আবশ্যক চিত্ত ও ভাবের স্থৈর্য প্রদান করিতে পারিত। ১৯০০ খ্রীস্টাব্দের মাইকেলমাস(১) দিবসে কয়েকজন ব্যক্তি স্বামীজীর সহিত সঁ্যা মিশেল পর্বত (Mont Saint Michel) দর্শনে গমন করেন। ঘটনাক্রমে তাহাদের মধ্যে একজন স্বামীজীর পাশেই দাড়াইয়া ছিলেন। স্বামীজী তখন মধ্যযুগে কয়েদীদের জন্য নির্দিষ্ট অন্ধকার খাচার মতাে ঘরগুলি দেখিতেছিলেন। সহসা ঐ ব্যক্তি চমকিত হইয়া শুনিলেন, স্বামীজী অনুচ্চস্বরে বলিতেছেন, “আহা, কি চমৎকার ধ্যানের জায়গা !” যাহারা তাহাকে ১৮৯৩ খ্রীস্টাব্দে আতিথ্যদানে আপ্যায়িত করেন, তাহাদের মধ্যে কেহ কেহ এখনও বর্তমান। তাহারা বর্ণনা করেন, পাশ্চাত্যদেশে প্রথম পদার্পণের পর সর্বদা গভীর চিন্তায় মগ্ন হইয়া যাওয়ার অভ্যাস দূর করিবার জন্য স্বামীজীকে কিরূপ বেগ পাইতে হইত। ট্রামে উঠিয়া তিনি এমন গভীরভাবে চিন্তায় তন্ময় হইয়া যাইতেন যে, গন্তব্যস্থলে কখন পৌঁছিয়াছেন সে বিষয়ে হুঁশ থাকিত না; ফলে কোন এক জায়গায় যাইবার জন্য হয়তো তাঁহাকে দুই-তিনবার সমস্ত পথের ভাড়া দিতে হইত। যেমন বৎসরের পর বৎসর অতিবাহিত হইতে লাগিল এবং এই বন্ধুগণ মধ্যে মধ্যে তাহার সহিত সাক্ষাৎ করিতে লাগিলেন, তাহারা দেখিতে পাইলেন, ক্রমশঃ বাহিরের তৎপরতা ও লৌকিক ব্যবহার সম্পর্কে তাঁহার দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হইতেছে। কিন্তু স্বভাবের এই পরিবর্তন ছিল নিতান্তই বাহ্য। ভিতরে পূর্বের ন্যায় সেই জ্বলন্ত ইচ্ছাশক্তি বিরাজ করিত, এবং মন সর্বদা ভাবমুখে অবস্থান করিত! তাঁহার নিজের অলঙ্কারপূর্ণ ভাষায় বলা যায়, নে হইত, যেন কোন প্রতিকূল শক্তির দ্বারা তিনি বলের মতো একস্থান হইতে অপর স্থানে নিক্ষিপ্ত হইতেছেন এবং ঐরূপে ধীরে ধীরে শান্ত হইয়া যাইতেছেন’। একবার আবেগের সহিত তিনি বলিয়া ওঠেন, “আমি জানি, সারা পৃথিবী আমি ঘুরে বেড়িয়েছি, কিন্তু ভারতে আমি কেবল ধ্যান করবার জন্য গুহাই খুঁজে বেড়িয়েছি, আর কিছু নয়!”
আবার এ-সব সত্ত্বেও সর্বদাই তিনি ছিলেন তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষক। ছাত্রের আগ্রহ লইয়া তিনি যাদুঘর, বিশ্ববিদ্যালয়, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় ইতিহাস প্রভৃতির খোঁজ লইতেন। তবে কোন স্থানেরই রীতি-নীতি, আচার ব্যবহার প্রভৃতি তাঁহাকে কদাপি প্রভাবিত করিতে পারিত না। প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের মধ্যে যে বিপুল পার্থক্য, তাহা অনুভব করিয়া তাহাদের আবেদনে যথোচিত সাড়া দিবার মানসিক শক্তি তাঁহার ছিল! প্রত্যেক বস্তু যে ভাবরাশি অভিব্যক্ত করিতে প্রয়াস পায়, সেই ভাবের মাধ্যমেই তিনি সব কিছু বুঝিবার চেষ্টা করিতেন। ইংলণ্ড-যাত্রাকালে একদিন তিনি গভীর নিদ্রার পর জাহাজের ডেকে আসিয়া আমাকে বলেন যে, স্বপ্নে তিনি প্রাচ্য ও প্রতীচ্য দেশের বিবাহসম্পর্কিত কতকগুলি আদর্শের বিচার করিতেছিলেন, এবং অবশেষে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হইয়াছেন যে, উভয়ের মধ্যেই কিছু কিছু জিনিস আছে যাহা জগতের কল্যাণের পক্ষে অপরিহার্য। শেষবার আমেরিকা হইতে প্রত্যাগমনের পর তিনি আমাকে বলেন, “পাশ্চাত্য সভ্যতার প্রথম পরিচয়ে আমি তার প্রতি বিশেষ আকর্ষণ বোধ করেছিলাম; কিন্তু এখন প্রধানতঃ তারঅর্থলিপ্সা ও ক্ষমতাই দেখতে পাচ্ছি। অপর সকলের মতো আমিও.চিন্তা না করে ধরে নিয়েছিলাম যে, যন্ত্রপাতির দ্বারা কৃষিকার্যের বিশেষ উন্নতি হবে; কিন্তু এখন দেখছি যে, যন্ত্রের দ্বারা আমেরিকার কৃষকের সুবিধা হতে পারে, কারণ তাকে বহু বর্গমাইল চাষ করতে হয়, কিন্তু ভারতীয় চাষীদের ছোট ছোট জমির পক্ষে এতে লাভের চেয়ে ক্ষতি হবার সম্ভাবনাই বেশি। ভারত ও আমেরিকার সমস্যা সম্পূর্ণ পৃথক, অন্ততঃ এ বিষয়ে আমার অণুমাত্র সন্দেহ নেই।” ধনের সমবণ্টন সমস্যা সম্বন্ধেও—যাহা দুর্বল বা দরিদ্ৰশ্রেণীর সমূল উচ্ছেদসাধন চাহে, এমন সব তর্কের প্রতি তিনি সন্দিগ্ধচিত্তে কর্ণপাত করিতেন। অপরাপর বিষয়ের ন্যায় এই বিষয়েও যেন অজ্ঞাতসারেই তিনি ছিলেন প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতার প্রতিমূর্তিস্বরূপ। কোন জাতির মধ্যে দলবদ্ধ হইবার প্রবল অভ্যাস দেখিলে তিনি উহার প্রশংসা করিতে জানিতেন, কিন্তু হিংস্রপ্রকৃতির বৃকযুথের দলবদ্ধ হওয়ার মধ্যে সৌন্দর্য কোথায়?
