আমাকে দেখিয়া তিনি বলিলেন, “এক অদ্ভুত রকমের মুসলমান সম্প্রদায় আছে; শোনা যায়, তারা এত গোড়া যে, প্রত্যেক নবজাত শিশুকে ঘরের বাইরে ফেলে রেখে বলে, “যদি আল্লা তোমাকে সৃষ্টি করে থাকেন, তবে তোমার মৃত্যু হোক, আর যদি আলি তোমাকে সৃষ্টি করে থাকেন, তবে বেঁচে থাক। শিশুকে তারা যা বলে থাকে, আজ রাত্রে আমিও তোমাকে তাই বলছি, কিন্তু কথাটাকে উল্টে দিয়ে যাও কর্মক্ষেত্রে ঝাপ দাও। যদি আমি তোমাকে সৃষ্টি করে থাকি, বিনষ্ট হও। আর যদি মহামায়া তোমাকে সৃষ্টি করে থাকেন, সার্থক হও।”
তথাপি পরদিন সকালে, সূর্যোদয়ের একটু পরেই তিনি পুনরায় আসিলেন আমাকে বিদায় দিতে। ইউরোপের ভূখণ্ডে তাঁহার সহিত এই আমার শেষ সাক্ষাৎ। আর একবার কৃষকের পণ্যবাহী শকট হইতে এই শেষ দিনটির প্রতি দৃষ্টিপাত করিয়া দেখিতে পাই, স্বামীজী আমাদের ল্যানিয়র কুটিরের বাহিরে রাস্তার উপর দাঁড়াইয়া আছেন এবং উর্ধ্বে হাত তুলিয়া অভিনন্দন জানাইতেছেন। তাঁহার পশ্চাতে প্রভাতের আলোকে সমুজ্জ্বল আকাশ, প্রাচ্যদেশের অধিবাসিগণের নিকট ইহা কেবল অভিনন্দন নহে, আশীর্বাদও।
ইউরোপ ও আমেরিকায় এই কয়মাস অবস্থানকালে স্বামীজীর জীবনযাপন দেখিয়া বিশেষভাবে এই ধারণা জন্মিয়াছিল যে, পারিপার্শ্বিক অবস্থা সম্পর্কে তিনি সম্পূর্ণ উদাসীন। প্রচলিত জিনিসের মূল্যবোধের প্রতি তাহার বিন্দুমাত্র আগ্রহ ছিল না। কর্মক্ষেত্রে সাফল্যলাভ তাহাকে কদাপি চমকিত অথবা সন্দিহান করিত না। বিস্মিত না হইবার কারণ, যে মহাশক্তি তাঁহার মধ্য দিয়া কার্য করিতেছিল, তাহার মাহাত্ম্য তিনি গভীরভাবে হৃদয়ঙ্গম করিয়াছিলেন। কিন্তু কোন কর্মে ব্যর্থতাও তাহাকে হতাশ করিত না। জয়-পরাজয় উভয়ই আসিবে এবং চলিয়া যাইবে; তিনি উহাদের সাক্ষিস্বরূপ। একবার তিনি বলিয়াছিলেন, “যদি জগৎটাই অদৃশ্য হয়ে যায়, তাতেই বা আমার কি? আমার দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী তা হবে অতি চমৎকার।” পরক্ষণেই সহসা গম্ভীর হইয়া বলিলেন, “কিন্তু প্রকৃতপক্ষে, বর্তমানে যা কিছু আমার প্রতিকূলে, তা সবই শেষে স্বপক্ষে আসবে। আমি কি মহামায়ার সৈনিক নই!”
পাশ্চাত্যের বিলাসপূর্ণ জীবনে তিনি নির্ভীকভাবে এবং বিন্দুমাত্র ইতস্ততঃ না করিয়া বিচরণ করিতেন। যেমন তাহাকে ভারতে অবিচলিতভাবে সাধারণ লোকের মতো বস্ত্র ও উত্তরীয়মাত্রে সজ্জিত এবং মেঝের উপর বসিয়া হাত দিয়া আহার করিতে দেখিয়াছি, ঠিক অনুরূপভাবে তিনি কিছুমাত্র সন্দেহ বা সঙ্কোচ না করিয়া আমেরিকা ও ফ্রান্সের জটিল ভোগবহুল জীবনকে গ্রহণ করিয়াছিলেন। তিনি বলিতেন, “সাধু ও রাজা একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। জগতের সকল শ্রেষ্ঠ বস্তুর ভোগ ও ত্যাগ—এই উভয়ের মধ্যে ব্যবধান অতি অল্প। ভারত অতীতে দারিদ্র্যকেই সকল গৌরব প্রদান করেছিল। ভবিষ্যতে সম্পদকেও কিছুটা গৌরব দান করতে হবে।”
কিন্তু, বিদেশে যাহারা দ্বারে দ্বারে আতিথ্য গ্রহণপূর্বক বিচরণ করেন, তাহাদের অদৃষ্টে দ্রুত পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী। এই অবস্থা-বিপর্যয় তিনি গ্রাহ্য করিতেন না। কোন সম্প্রদায়ের গণ্ডি অথবা পারিপার্শ্বিক অবস্থা তাহাকে সহৃদয় ব্যক্তির সহানুভূতি হইতে বঞ্চিত করিতে পারিত না। প্রত্যেক মানুষের মধ্যে যে অন্তর্নিহিত ঈশ্বরীয় সত্তা বিদ্যমান—যাহার সম্পর্কে তিনি প্রায়ই উল্লেখ করিতেন—সেই সত্তার প্রতি তার এরূপ পূর্ণ বিশ্বাস ছিল যে, সাম্রাজ্যবাদী, প্রভুত্বপরায়ণ অভিজাত ব্যক্তি, কিংবা আমেরিকার কোটিপতি ঐশ্বর্যশালী, অথবা যাহারা নিপীড়িত, অত্যাচারিত তাহাদের সকলের সহিত আলাপকালে সর্বক্ষেত্রে সমভাবে তাহার প্রত্যক্ষ আবেদন ছিল মানবের ঐ সত্তার প্রতি। কিন্তু তাহার প্রেম ও সৌজন্য বিশেষ করিয়া প্রবাহিত হইত সাধারণ দীন-দরিদ্রের উপর।
|||||||||| আমেরিকায় ভ্রমণকালে যখন দক্ষিণ অঞ্চলের কোন কোন শহরে নিগ্রো মনে করিয়া তাহাকে হোটেলে প্রবেশ করিতে দেওয়া হয় নাই, তখন একথা তিনি কদাপি বলেন নাই যে, তিনি আফ্রিকাবাসী নিগ্রো নহেন। স্থানীয় সম্রান্ত ব্যক্তিগণ যখন এইরূপ আচরণের দ্বারা তাহাকে অপমান করা হইয়াছে বিবেচনা করিয়া দুঃখিত অন্তঃকরণে ক্ষমাপ্রার্থনা করিবার জন্য তাহার নিকট ছুটিয়া আসেন, তখন যেমনভাবে তিনি তাঁহাদের আতিথ্য গ্রহণ করেন, তেমন কৃষ্ণকায় নিগ্রো সমাজের আতিথ্যও অনুরূপভাবে নীরবে ও কৃতজ্ঞতাপূর্ণ হৃদয়ে গ্রহণ করিয়াছিলেন। বহুদিন পরে এক ব্যক্তি বিস্ময়ের সহিত জাতি সম্পর্কে তাহার এই নীরবতার উল্লেখ করিলে তাহাকে এইরূপ স্বগতোক্তি করিতে শোনা গিয়াছিল, “কী! একজনকে ছোট করে বড় হতে হবে! সেজন্য আমি এই পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করিনি।” সন্ন্যাসীর কোন জিনিস চাই বলিয়া জোর করিবার অধিকার নাই; তাহাকে সকল অবস্থাই মানিয়া লইতে হয়। এই সময়ে বহু কৃষ্ণকায় ব্যক্তি তাহার নিকট বিশ্বস্তচিত্তে গোপনে শ্বেতকায় জাতি কর্তৃক তাহাদের অধিকার বঞ্চনার যে করুণ কাহিনী নিবেদন করিত, পরবর্তী কালে স্বামীজী প্রায়ই তাহার উল্লেখ করিতেন। একবার কোন কারণে স্বামীজী স্টেশনে অপেক্ষা করিতেছিলেন, এমন সময়ে রেলের এক নিগ্রো ভৃত্য তাহার নিকট আসিয়া বলে যে, সে শুনিয়াছে, তাহার স্বজাতির মধ্যে একজন বিশেষ খ্যাতি অর্জন করিয়াছে এবং সে ব্যক্তি তিনি, সুতরাং সে তাহার সহিত করমর্দন করিতে চাহে। ঐ ঘটনার ন্যায় আনন্দ তিনি অল্প ঘটনাতেই পাইয়াছিলেন। তাহার সামনে কোন শ্বেতকায় ব্যক্তি সামাজিক পদমর্যাদা হেতু ইতরজননাচিত উল্লাস প্রদর্শন করিলে তিরস্কৃত হইত না, ইহা কখনও সম্ভব ছিল না। এ বিষয়ে এতটুকু আভাস পাইবামাত্র তিনি কি কঠোরভাব ধারণ করিতেন! কী তীব্র ছিল তাহার তিরস্কার! সর্বোপরি, এই জাতির সন্তানগণই হয়তো ভবিষ্যতে কখনও অপর সকলকে অতিক্রম করিয়া সমগ্র মানবজাতির নেতৃত্ব গ্রহণ করিবে, এই সম্পর্কে তাহার অঙ্কিত চিত্র কতই না উজ্জ্বল ছিল! অধিকারপ্রাপ্ত জাতিসমূহ কর্তৃক নিজেদের উৎপত্তির অসত্য বিবরণের প্রতি তাহার প্রতিবাদ ছিল ঘৃণাপূর্ণ। বলিতেন, “যদি আমি আমার শ্বেতকায় আর্য পূর্বপুরুষদের কাছে কৃতজ্ঞ থাকি, তবে আমার পীতকায় মোঙ্গল পূর্বপুরুষদের কাছে অনেক বেশি কৃতজ্ঞ, আর সবচেয়ে বেশি কৃতজ্ঞ কৃষ্ণকায় নিগ্রোজাতির কাছে।”
