“দেখছ, একদল লোক বাহ্যবিকাশকে প্রাধান্য দেয়, আর একদল অন্তরের ভাব বা ধারণাকে। কোনটি আগে? পাখি আগে, তারপর ডিম-না ডিম আগে, তারপর পাখি পাত্রার তৈল, অথবা তৈলাধার পাত্র? এ সমস্যার মীমাংসা নেই, এ-সব বিচার ছেড়ে দাও। মায়ার হাত থেকে নিষ্কৃতিলাভ কর।”
———
(১) কেই যেন মনে না করেন, স্বামীজী এখানে ‘ধম্মপদ’কে উদ্দেশ করিতেছেন। ‘ধম্মপদ’কে তিনি গীতার সঙ্গে সমান স্থান দিতেন। সম্ভবতঃ স্বামীজী এখানে জাতকশ্রেণীব পুস্তকগুলি কথাই বলিতেছেন। Trubner’s Oriental Series-এ উক্ত গল্পগুলি দুইখণ্ডে প্রকাশিত হইয়াছে।
(২) স্বামীজী এখানে কেবল ধর্মমতের লক্ষণ নির্দেশ করিতেছেন, শ্রীচৈতন্যের কঠোর সন্ন্যাসব্রতের কথা বলিতেছেন না। সেরূপ কঠোরতা সম্ভবতঃ জগতে অতুলনীয়।
(৩) অর্থাৎ মানবমাত্রেই উপাসনা-মানবত্বের উপাসনা, ব্যক্তিবিশেষকে তাহার উন্নত মন বা চরিত্রের জন্য পূজা না করিয়া সকল মানুষকে গুণনির্বিশেষে পূজা করা।
(৪) বৈশেষিক মতে দ্রব্য নয়টি—পঞ্চভূত, কাল, দিক,আত্মা ও মন।—অনুঃ
(৫) পঞ্চাবব–প্রতিজ্ঞা, হেতু, উদাহবণ, উপনয় ও নিগমন। যথা ১. প্রতিজ্ঞা-”এই পর্বত বহ্নিযুক্ত”; ২. হে?–”যেহেতু ইহাতে ধূম রহিয়াছে”, ৩. উদাহরণ–”যে যে স্থলে ধূম থাকে, সেই সেই স্থলে অগ্নিও থাকে; যেমন রন্ধনশালা”; ৪. উপনয়—”এই পর্বতও সেইরূপ অর্থাৎ ধূমবান”; ৫. নিগমন –”যেহেতু এই পর্বত ধূমবিশিষ্ট, সেই হেতু উহা অবশ্যই বহ্নিবিশিষ্ট।”–অনুঃ
(৬) বিশেষেব জ্ঞান হইতে সাধাবণ নিয়মের জ্ঞান।—অনুঃ
(৭) উহার বিপরীত অর্থাৎ সাধারণ নিয়ম হইতে বিশেষের জ্ঞান।–ঐ
১৬. পাশ্চাত্যদেশে স্বামীজীর সহিত কয়েকদিন
৩১ জুলাই আমরা লণ্ডনে পৌঁছাই, এবং যে সমুদ্রযাত্রা আমার নিকট এত স্মরণীয় হইয়াছিল, তাহারও অবসান ঘটে। স্বামীজী উইম্বল্ডনে কয়েক সপ্তাহ অতিবাহিত করেন, কিন্তু বৎসরের এই সময়ে তাহার বন্ধুবর্গের অধিকাংশই লণ্ডনে ছিলেন না। এদিকে আমেরিকা হইতে ক্রমাগত আমন্ত্রণ আসিতেছিল। সুতরাং অল্পদিন পরেই তিনি ঐ আমন্ত্রণ গ্রহণপূর্বক আমেরিকা যাত্রা করেন। উদ্দেশ্য ছিল—সেখানে হাডসন নদীর তীরে এক রমণীয় পল্লীনিবাসে অবস্থানপূর্বক অতঃপর তাহার পরবর্তী কর্মক্ষেত্র বিষয়ে ভগবানের ইঙ্গিতের প্রতীক্ষা করিবেন। তাহার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, ঐ ইঙ্গিত আসিবেই। একমাস পরে আমি ঐ ভবনেই অতিথিরূপে বাস করি, এবং ৫ নভেম্বর পর্যন্ত, অর্থাৎ ছয়-সাত সপ্তাহ ধরিয়া প্রত্যহ তাহার দর্শনলাভের সুযোগ পাই। ঐ তারিখে আমরা পরস্পরের নিকট বিদায় গ্রহণ করিবার পর স্বামীজী নিউ ইয়র্ক এবং উহার কাছাকাছি কয়েকটি স্থান দর্শন করেন। ঐ মাসের শেষের দিকে কালিফোর্নিয়া যাইবার পথে তিনি শিকাগো হইয়া যান। আমিও তখন শিকাগোতে ছিলাম। পরবর্তী জুন মাসে (১৯০০ খ্রীঃ) আমি পুনরায় নিউ ইয়র্কে তাহার সাক্ষাৎলাভ করি। সেখানে কয়েক সপ্তাহ এবং পরে প্যারিসেও অনুরূপ সময় তাহার ঘন ঘন সাক্ষাৎ পাইতাম; অবশেষে সেপ্টেম্বর মাসে, ব্রিটানিতে তাহার সহিত আমেরিকাবাসী বন্ধুগণের অতিথিরূপে একই ভবনে একপক্ষ কাল অতিবাহিত করি। কয়েক বৎসর ধরিয়া তাহার নিকট শিক্ষালাভের যে অমূল্য স্মৃতি আমার মনে বর্তমান রহিয়াছে—এখানেই তাহার পরিসমাপ্তি। কারণ, ইহার পর ভারতবর্ষে ১৯০২ খ্রীস্টাব্দের প্রথমার্ধে যখন আমি স্বামীজীর সাক্ষাৎ লাভ করি, সে কেবল তাঁহার শেষ আশীর্বাদ গ্রহণ করিবার এবং শেষ বিদায় লইবার জন্য।
গুরুর সমীপে অবস্থানকালে শিষ্যের কর্তব্য শান্ত সংযতভাবে গুরুর আদেশ-পালন; কিন্তু গুরু অন্যত্র গমন করিলে তৎক্ষণাৎ শিষ্যের যথাশক্তি উদ্যম ও তৎপরতা দেখানো প্রয়োজন। এই শেষোক্ত আচরণই স্বামীজী তাহার শিষ্যগণের নিকট সর্বদা প্রত্যাশা করিতেন। একবার তিনি বলেন, যখনই কোন তরুণ সন্ন্যাসী কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস মঠবাসের পর ‘কিছুই শিখিলাম না’ বলিয়া অভিযোগ করিত, তিনি তখনই তাহাকে কিছুদিনের জন্য পূর্বাশ্রমে পাঠাইয়া দিতেন; এবং সেখানে যাইবার পর সে বুঝিতে পারিত, ইতিমধ্যে অজ্ঞাতসারে সে কতটা আয়ত্ত করিয়া ফেলিয়াছে। প্রতিবার তাহার নিকট বিদায় লওয়ার অর্থ ছিল, সেই শিষ্যের হস্তে যুদ্ধপতাকার ভার অর্পিত হইল। একবার এক বালিকা তাহার বাদত্ত স্বামীকে বিদায় দিবার সময় ভাবের আবেগে কাদিয়া ফেলিবার উপক্রম করে, এমন সময়ে স্বামীজী তাহাকে অনুচ্চকণ্ঠে বলিয়া ওঠেন, ‘রাজপুত রমণীর ন্যায় বীরপত্নী হও, তারা হাসিমুখে পতিকে বিদায় দিতেন।’ কথাগুলি যেন মন্ত্রের ন্যায় কাজ করিল। শিকাগো নগরে অল্পক্ষণ সাক্ষাতের পর যখন আমি তাহার নিকট বিদায় গ্রহণ করি, তখন তাহার শেষকথা ছিল, “মনে রেখো, ভারত চিরকালই ঘোষণা করছে, আত্মা প্রকৃতির জন্য নয়, প্রকৃতিই আত্মার জন্য।”
১৯০০ খ্রীস্টাব্দে সেপ্টেম্বর মাসে আমি ব্রিট্যানিতে তাহার নিকট বিদায় গ্রহণ করি, তখন আমি একাকী ইংলণ্ডে প্রত্যাবর্তনের উদ্যোগ করিতেছিলাম, উদ্দেশ্য, ভারতীয় কার্যের জন্য সহায়তা লাভ ও অর্থসংগ্রহের প্রচেষ্টা। কতদিন আমাকে সেখানে থাকিতে হইবে, তাহার স্থিরতা ছিল না। কোন কার্যপ্রণালীও নির্দিষ্ট ছিল না। সম্ভবতঃ স্বামীজীর মনে এই চিন্তার উদয় হইয়া থাকিবে যে, পুরানো সম্পর্কগুলি বহুসময়ে বিদেশে নূতন সম্পর্কস্থাপনের প্রবল অন্তরায় হয়। বহুলোককে তিনি কথা দিয়া কার্যের সময় পশ্চাৎপদ হইতে দেখিয়াছেন। মনে হইত, অন্য যে কেহ ঐরূপ করিতে পারে, এজন্য তিনি সর্বদা প্রস্তুত থাকিতেন। যেভাবেই হউক, তাঁহার শিষ্যের পক্ষে ঐ সময়টি ছিল সঙ্কটকাল, এবং উহা তিনি অবহিত ছিলেন। ব্রিটানিতে অবস্থানের শেষদিন সন্ধ্যার পর আমার লতাপাদপমণ্ডিত ক্ষুদ্র পাঠাগারের দ্বারপ্রান্তে আমি সহসা স্বামীজীর কণ্ঠস্বর শুনিতে পাইলাম। তখন রাত্রির আহার সমাপ্ত হইয়াছে, চারিদিক অন্ধকারাচ্ছন্ন। স্বামীজী আমাকে উদ্যানে যাইবার জন্য ডাকিতেছেন। আমি বাহিরে আসিলাম, দেখিলাম, তিনি জনৈক বন্ধুর সহিত নির্দিষ্ট কুটিরে যাইবার পথে আমাকে আশীর্বাদ জানাইবার জন্য দাঁড়াইয়া আছেন।
