এইরূপে তিনি বৈশেষিক মতে যে ছয়টি পদার্থের বিচারের দ্বারা জগতের উৎপত্তি নির্ণয় করিতে পারা যায়, তাহাদের উল্লেখ করিতেন। উহাদের নাম—দ্রব্য(৪), গুণ, কর্ম, সামান্য, সমবায় এবং বিশেষ। ইহাদের সহিত তিনি বৌদ্ধদের পঞ্চতত্ত্বের তুলনা করিতেন—রূপ, বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার, বিজ্ঞান। বৌদ্ধদের মতে রূপ অন্য চারিটি তত্ত্বের ফলস্বরূপ, নিজে কিছুই নহে। সুতরাং বৌদ্ধধর্মের মতে লক্ষ্যবস্তু বিজ্ঞানের পারে অবস্থিত বা পঞ্চতত্ত্বের বহির্ভূত। ইহাদের সঙ্গে আবার তিনি বেদান্তের (এবং ক্যান্টেরও) কাল, দেশ, নিমিত্ত—এই তিনটি প্রতিভাসিক বস্তুর উল্লেখ করিতেন—উহারাই নামরূপাকারে প্রকাশ পায়। এইনামরূপই মায়া—অর্থাৎ উহা সৎ নহে, আবার অসৎও নহে। অতএব স্পষ্টই দেখা যাইতেছে, দৃশ্যমান এই জগতের কোন স্থায়ী সত্তা নাই বরং উহা এক নিত্য পরিবর্তনশীল প্রক্রিয়া। সৎ বস্তু এক, কিন্তু প্রক্রিয়াবশতঃ ঐ সৎ বস্তু নানারূপে প্রতিভাত হয়। ক্রমবিকাশ ও ক্ৰমসঙ্কোচ—উভয়ই মায়ার অন্তর্গত। সৎ বস্তুর বা প্রকৃত সত্তাব অভিব্যক্তি অথবা সঙ্কোচ কিছুই হয় না, উহা নিত্য একরূপে অবস্থিত।
যে পথ অনুসরণ করিয়া হিন্দুজাতি বর্তমান অবস্থায় উপনীত, তাহার পুনঃপ্রতিষ্ঠারূপ মহৎ ব্যাপার-প্রসঙ্গে স্বামীজী পাশ্চাত্য চিন্তার ফলাফল বিস্মৃত হন নাই। কারণ তাহার মন এরূপ উপাদানে গঠিত ছিল, যাহা কেবল লক্ষ্য করিত মানবের অনুসন্ধিৎসা কোন্ পথ অনুসরণ করিয়া অগ্রসর হইতেছে; সেখানে প্রাচীন ও আধুনিকের মধ্যে কোন কৃত্রিম প্রভেদ করিত না। পাশ্চাত্য দর্শনে যাহাকে সিলোজিসম (Syllogism) বলে, তাহার বিশ্লেষণ করিয়া তিনি উহার সহিত প্রাচীন ভারতীয় ‘পঞ্চাবয়ব(৫) ন্যায়ের অদ্ভুত সাদৃশ্য দেখাইতেন। তারপরেই ন্যায়শাস্ত্রের চতুর্বিধ প্রমাণের আলোচনায় আসিতেন, উহারা হইল—প্রত্যক্ষ, অনুমান, উপমান এবং শব্দ। এই ন্যায়শাস্ত্র অনুসারে আধুনিক অবরোহী প্রথা(৬) (Induction) ও আরোহী প্রথা(৭) (Deduction) স্বীকৃত হইত না। এই মতে অনুমান মাত্রেই দুই প্রকার—অধিক পরিজ্ঞাত বস্তু হইতে অল্প পরিজ্ঞাত বস্তুর এবং অল্প পরিজ্ঞাত বস্তু হইতে অধিক পরিজ্ঞাত বস্তুর আবিষ্কার। প্রত্যক্ষ জ্ঞান হইতে যে অনুমান, তাহা ত্রিবিধ—প্রথম, যাহাতে কারণদৃষ্টে কার্য অনুমিত হয় (ন্যায়ের ভাষায় যাহাকে বলা হয় পূর্ববৎ’); দ্বিতীয়, যাহাতে কার্যদৃষ্টে কারণ অনুমিত হয় (শেষবৎ’);এবং তৃতীয়, যাহাতে আনুষঙ্গিক অন্যান্য অবস্থা পর্যালোচনার দ্বারা অনুমান করা হয় (সামান্যতোদৃষ্ট’)। আবার অনুমানের প্রণালী পাচপ্রকার সাধ দ্বারা, বৈধ দ্বারা, সাধ ও বৈধ উভয় দ্বারা, আংশিক সাধ দ্বারা এবং আংশিক বৈধৰ্ম দ্বারা। শেষোক্ত দুইটি কখন কখনও একত্র ‘পারিশেষ্য’ নামে অভিহিত হয়। ইহা হইতে স্পষ্টই বুঝা যায় যে, কেবল তৃতীয় প্রণালী অবলম্বনেই ক্রটিশূন্য বা নির্ভুল অনুমান করা চলে, অর্থাৎ “অন্বয় ও ব্যতিরেক এই উভয় ভাবে প্রমাণ করিলে তবেই প্রমাণ যথার্থ হয়।” নৈয়ায়িকেরা অনুমান-প্রমাণবলে ঈশ্বরের অস্তিত্ব সিদ্ধ করিয়াছেন; বৈদান্তিকেরা কিন্তু শ্রুতি বা শব্দ-প্রমাণকেই ঈশ্বরের অস্তিত্ব সাধনের মূল প্রমাণ হিসাবে গ্রহণ করিয়াছেন। তাঁহাদের মতে অনুমান সহকারী প্রমাণ মাত্র।
“আবার ব্যাপ্তি বলে একটা ব্যাপার আছে। একখানা পাথর পড়ে গেল এবং তাতে একটা কীট মারা গেল। এর দ্বারা আমরা অনুমান করি, সকল পাথরই পড়লে কীট বিনাশ করে। একটি প্রত্যক্ষ ঘটনাকে আমরা বিন্দুমাত্র সন্দেহ না করে অন্যস্থলে প্রয়োগ করি কেন? কেউকেউ বলেন, ওটা অভিজ্ঞতারই ফল। কিন্তু মনে কর, ওটা প্রথমবারই ঘটল। একটি শিশুকে শূন্যে ছুঁড়ে দাও, সে কাঁদবে। অতীত জন্মের অভিজ্ঞতা বলছ? কিন্তু ভবিষ্যতে কেন প্রযুক্ত হয়? তার কারণ, কতকগুলি বস্তুর মধ্যে একটি প্রকৃত সম্পর্ক আছে—ব্যাপ্তি সম্বন্ধ। আমাদের শুধু এইটুকু লক্ষ্য রাখতে হবে যে, কোনভাবে ওতে অতিব্যাপ্তি অথবা অব্যাপ্তি দোষ না ঘটে। এই বিচারের ওপরেই মানবের সমস্ত জ্ঞান নির্ভর করছে।
“হেত্বাভাস অথবা ভ্রান্তযুক্তি সম্বন্ধে স্মবণ রাখতে হবে যে, প্রত্যক্ষ অনুভব তখনই প্রমাণস্বরূপ গণ্য হতে পারে, যখন ঐ অনুভবের ইন্দ্রিয়, অর্থাৎ যে ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে অনুভব হবে) যে উপায় মাধ্যমে অনুভব হবে তা এবং ঐ অনুভবের অবিচ্ছিন্ন স্থিতি—সমস্তই হবে নির্দোষ। পীড়া বা ভাবাবেগ থাকলে লক্ষ্যের বিচ্যুতি ঘটবে। সুতরাং প্রত্যক্ষ অনুভবও এক রকমের অনুমান। অতএব, সর্বপ্রকার মানবীয় জ্ঞান অনিশ্চিত এবং ভ্রমপ্রমাদপূর্ণ হতে পারে। প্রকৃত দ্রষ্টা কে? তিনিই প্রকৃত দ্রষ্টা, যার নিকট আলোচ্য বিষয়টি প্রত্যক্ষ অনুভূত। সুতরাং বেদই সত্য, কারণ বেদ আপ্তপুরুষের সাক্ষ্য। কিন্তু এই দর্শন বা অনুভবশক্তি কি কারও বিশেষ সম্পত্তি? না। ঋষিমাত্রেরই—আর্য বা ম্লেচ্ছ যেই হোন—এই ক্ষমতা আছে।
“আধুনিক বাঙালীরা বলেন, আপ্তবাক্য প্রত্যক্ষ অনুভবের এক বিশেষ অবস্থামাত্র, এবং উপমান ও সাদৃশ্যমূলক বিচার অপকৃষ্ট অনুমানমাত্র, সুতরাং প্রকৃত প্রমাণ মাত্র দুটি—প্রত্যক্ষ ও অনুমান।
