আবার, প্রতিমাপূজার উপকারিতা সম্বন্ধেও তার ধারণা সমভাবেই স্পষ্ট ছিল। তিনি বলিতেন, “তোমরা সব সময়ে বলতে পার যে, প্রতিমাই ঈশ্বর। কিন্তু ঈশ্বরকে প্রতিমা ভেবে বসা–এ ভুল করো না।” একবার কয়েকজন তাহাকে ‘হোটেণ্টটদের জড়োপাসনা’র নিন্দা করিবার জন্য অনুরোধ করে। উত্তরে তিনি বলেন, “জড়োপাসনা কাকে বলে আমি জানি না।”
তখন তাড়াতাড়ি তাহার নিকট এক বীভৎস চিত্রসহকারে এ উপাসনা বর্ণনা করা হইল—পূজাৰ্হ বস্তুটিকে তাহারা ক্রমান্বয়ে প্রথমে পূজা, তারপর প্রহার এবং অবশেষে ধন্যবাদজ্ঞাপন করিয়া থাকে। উত্তরে তিনি সবিস্ময়ে বলিলেন, “আমি এর নিন্দা করব!” পরক্ষণেই সমাজে যাহারা নিম্নশ্রেণী, অসাক্ষাতে তাহাদের প্রতি অন্যায় আচরণে অসন্তুষ্ট হইয়া উত্তেজিতস্বরে বলিলেন,”দেখছ না, এটা জড়োপাসনা নয়? ওঃ, তোমাদের হৃদয় কি কঠিন! দেখতে পাও না যে, ছোট ছেলেরা ঠিকই করে থাকে। তারা সবই চৈতন্যময় দেখে। ঐহিক জ্ঞানবৃদ্ধি আমাদের বালকের সেই দৃষ্টি থেকে বঞ্চিত করে। কিন্তু অবশেষে উচ্চতর জ্ঞানের মাধ্যমে আমরা পুনরায় ঐ অবস্থায় উপনীত হই। ছোট ছেলেরা গাছপালা, ইট, কাঠ, পাথর, সব জিনিসের মধ্যে একটা জীবন্ত শক্তি দেখতে পায়। আর সত্যি কি এদের পিছনে কোন জ্বলন্ত শক্তির অস্তিত্ব নেই? এটা প্রতীকোপাসনা, জড়োপাসনা নয়। দেখতে পাচ্ছ না?”
কিন্তু যদিও প্রত্যেক ব্যক্তির আন্তরিক মনোভাব ছিল তাঁহার নিকট পবিত্র, মুহূর্তের জন্যও তিনি হিন্দুধর্ম-দর্শনের মাহাত্ম বিস্মৃত হইতেন না। আইনবিগণের বোধ্য শুষ্ক যুক্তিতর্ক দৃষ্টান্ত দ্বারা বুঝাইতে গিয়া তিনি তাহাদের উপর অবিরত কবিত্বের অনন্ত উৎস খুলিয়া দিতেন। কী অনুরাগের সহিত মীমাংসা দর্শনের ব্যাখ্যা করিতেন। কী গর্বের সহিত তিনি শ্রোতাকে স্মরণ করাইয়া দিতেন যে, হিন্দু পণ্ডিতগণের মতে সমগ্র জগৎ শুধু পদার্থময় (পদের অর্থ)! আগে শব্দ বা পদ, পরে বস্তু। সুতরাং অর্থ বা ভাবই সব! বস্তুতঃ ঐ বিষয়ে তিনি যখন ব্যাখ্যা করিতেছিলেন, তখন মীমাংসকদিগের অতি সাহসপূর্ণ যুক্তিপ্রণালী, নির্ভীকতার সহিত কতকগুলি বিষয়ের স্বীকৃতি এবং অনুমানের দৃঢ়তা আমাদের নিকট হিন্দুধর্মের বিশেষ গৌরবস্থল বলিয়া প্রতীত হইয়াছিল। যে জাতি এরূপ বলিতে পারেন যে, ‘প্রতিমা পূজা করিলেও প্রতিমা প্রকৃতপক্ষে লক্ষ্যবস্তু সম্বন্ধে চিন্তার অবলম্বন ব্যতীত তার কিছু নহে’; প্রার্থনার একাগ্রতার উপরেই উহার শক্তিবৃদ্ধি নির্ভর করে; দেবদেবীর অস্তিত্ব শুধু মনে, কিন্তু সে কারণেই জোর করিয়া বলা যায়, তাহারা সত্যই আছেন—তাঁহাদের সম্বন্ধে আর এ-কথা বলা যায় না যে, তর্কের যে-কোন মীমাংসা তাঁহারা কৌশলে পরিহার করিতে চাহেন। সমগ্র চিন্তাধারা যেন মূর্তিবিদ্বেষী কালাপাহাড়ের সর্ববিধ্বংসী আক্রমণ বলিয়া মনে হইয়াছিল অথচ উহাই প্রযুক্ত হইয়াছিল একটি মত ব্যাখ্যার অনুকূলে।
একদিন তিনি সত্যভামার ব্রত অনুষ্ঠানের গল্প বলেন। একটি তুলসীপত্রে শ্রীকৃষ্ণের নাম লিখিয়া তুলাদণ্ডের একদিকের পাল্লায় রাখা হইল; অপরদিকে শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং উপবিষ্ট থাকিলেও তাহার নামযুক্ত পাল্লা অধিক ভারী হইল। স্বামীজী বলিতে লাগিলেন, “প্রাচীনপন্থী হিন্দুধর্ম ‘শ্রুতি’ বা শব্দকেই সব বলে থাকেন। বস্তু’ হলো পূর্ব থেকে বর্তমান শাশ্বত ভাবের একটা ক্ষীণ প্রতিচ্ছায়া মাত্র। সুতরাং ঈশ্বরের ‘নাম’ই সব; ভগবান নিজেই বিরাট মনে অবস্থিত সেই ভাবের বাহ্য অভিব্যক্তি মাত্র। তোমার নিজের নামও, তুমি যে ব্যক্তি বা সান্ত, তার অপেক্ষা অনন্তগুণে পূর্ণতর। ঈশ্বর অপেক্ষা নামের মাহাত্ম্য অধিক। অতএব বাক্যপ্রয়োগ সম্পর্কে সাবধান হবে।” সত্য সম্পর্কে এরূপ নির্ভীক মতবাদ ইতিপূর্বে নিশ্চয়ই দেখা যায় নাই। তাহার কথা শুনিতে শুনিতে বুঝিলাম, সমস্ত ব্যাপারটি প্রাচ্য মনের এই অন্তর্নিহিত, স্বতঃসিদ্ধ বিশ্বাসের উপর স্থাপিত যে, ধর্ম উপলব্ধির বস্তু, কোন মতবাদ নহে; স্বামীজী নিজেই যেমন অন্যত্র বলিয়াছেন, উহা ক্রমিক অবস্থান্তর-প্রাপ্তি-ধর্মের প্রভাবে মানুষ উত্তরোত্তর নূতন ও উচ্চতর জীবন লাভ করে। যদি একথা সত্য হয় যে, এই উপায়ে মানবকে বহুত্বের ধারণা হইতে ক্রমে নিশ্চিতরূপে সেই ‘একমেবাদ্বিতীয় তত্ত্বে উপনীত করে, তাহা হইলে ইহাও নিশ্চিত সত্য যে, আমরা যাহা কিছু দেখি, শুনি সবই মনে; বাহ্য জগৎ মনের কল্পনারই স্থূল রূপমাত্র। সুতরাং প্লেটো-প্রচারিত গ্রীকদর্শন প্রকৃতপক্ষে হিন্দু মীমাংসা দর্শনের অন্তর্ভুক্ত, এবং ইউরোপীয়গণ যাহাকে শুধু ইন্দ্রিয়জন্য জ্ঞান’ বলিয়া অভিহিত করেন, ভারতীয় দর্শনে তাহার যুক্তিমূলক কারণ দেখিতে পাওয়া যায়। এইরূপেই আর একদিন, কোন স্বতঃসিদ্ধ সত্য সম্পর্কে যেমন কেহ বলিয়া থাকে, সেইভাবে তিনি বলেন, “আমি গ্রীক দেবতাদেরও পূজা করব না, কারণ স্বরূপতঃ তারা মানুষ থেকে পৃথক ছিলেন। কেবল তাদেরই পূজা করা উচিত, যারা আমাদেরই মতো, কিন্তু আমাদের অপেক্ষা মহত্তর। দেবতা ও আমার মধ্যে যে প্রভেদ, তা শুধু প্রকাশের তারতম্য—আমি ক্ষুদ্র, তারা বৃহৎ এইমাত্র।”
কিন্তু দর্শন সম্পর্কে তাঁহার আলোচনা কোনক্রমেই সব সময় এইরূপ সৌখীন মতবাদ বা একটু আধটু সুস্বাদু চাটনীর মতো ছিল না। সাধারণতঃ তাহার দাবি ছিল, সকলেই পূর্ণমাত্রায় বিচারশক্তির প্রয়োগ করুক—এ বিষয়ে তিনি ছিলেন নির্দয়। প্রাচীন মতবাদ ব্যাখ্যা করিতে গিয়া কখন কখনও তিনি দুই ঘণ্টাকাল পর্যন্ত কাটাইয়া দিতেন; শ্রোতৃবর্গ যে পণ্ডিত নহেন, এবং তাঁহারা বিরক্তি বা কষ্ট বোধ করিতে পারেন—এ বিষয়ে তাহার কোন সন্দেহ হইত না। ঐ সকল সময়ে ইহাও স্পষ্ট বোঝা যাইত যে, বিচারটি তিনি মনে মনে অপর এক ভাষায় অনুধাবন করিতেন, কারণ দেখা যাইত, পারিভাষিক শব্দগুলি অনুবাদ করিতে গিয়া মধ্যে মধ্যে তিনি ভিন্ন ভিন্ন শব্দ প্রয়োগ করিতেন।
