“কারণ বৌদ্ধগ্রন্থগুলি অধ্যয়ন করা একপ্রকার যন্ত্রণাবিশেষ। অজ্ঞ জনসাধারণের জন্য ঐ গ্রন্থগুলি লিখিত হওয়ার ফলে এক একখানি বিশাল গ্রন্থে মাত্র দু-একটি উচ্চভাব দেখতে পাওয়া যায়।(১) এই অভাব পূরণ করবার জন্যই পুরাণের উদ্ভব। ভারতে মাত্র একজন মনীষী পূর্ব থেকেই এই অভাব হৃদয়ঙ্গম করেছিলেন তিনি শ্রীকৃষ্ণ। বোধ হয় তার মতো মহাপুরুষ আর জন্মগ্রহণ করেননি। সাধারণ লোকের অভাব, এবং পূর্বেই জাতির মধ্যে যা কিছু সঞ্চিত হয়েছে, তা সংরক্ষণের আকাঙ্ক্ষা তিনিই সঙ্গে সঙ্গে উপলব্ধি করেছিলেন। শুধু গোপী-ভাগবত ও গীতার (গীতায় পুনঃ পুনঃ স্ত্রী ও শূদ্রগণের প্রসঙ্গ আছে) সাহায্যেই তিনি সাধারণ লোকদের মধ্যে ধর্ম প্রচার করেননি। কারণ, সমগ্র মহাভারত তাঁরই, তার ভক্তগণ কর্তৃক রচিত এবং গোড়া থেকেই ঘোষণা করছে যে, গ্রন্থখানি সাধারণ লোকদের জন্য।
“এইভাবে একটি ধর্মের সৃষ্টি হলো, যার পরিণতি বিষ্ণুপূজায় এবং তার মূল কথা হলো জীবনের গতি অব্যাহত রেখে, ভোগের মধ্যে থেকেও ঈশ্বরলাভের চেষ্টা। আমাদের দেশের শেষ ধর্ম-আন্দোলন শ্রীচৈতন্য প্রচারিত ধর্ম ভোগবাদের উপর প্রতিষ্ঠিত, তা বোধ হয় তোমার জানা আছে।(২) আবার দেখ, জৈনধর্ম প্রচার করছে ঠিক তার বিপরীত ভাব-আত্মপীড়নের মাধ্যমে ধীরে ধীরে শরীরপাত। সুতরাং দেখছ, বৌদ্ধধর্ম হলো জৈনধর্মের সংশোধিত আকার এবং বুদ্ধ কর্তৃক সেই পাচজন কঠোর তপস্বীর সঙ্গত্যাগের এই হলো প্রকৃত অর্থ। ভারতবর্ষে প্রত্যেক যুগে এমন কতকগুলি ক্রমবিন্যস্ত সম্প্রদায় থাকে, যাদের মধ্যে চরম শারীরিক-নিগ্রহ থেকে আবম্ভ করে চূড়ান্ত ভোগবাদ পর্যন্ত সকল প্রকার বাহ্য সাধনার নিদর্শন পাওয়া যায়। আবার ঐ কালেই ঐভাবে ক্রমবিন্যস্ত কতকগুলি সম্প্রদায়ের উদ্ভব হয়ে থাকে, যাদের সাধন প্রণালীর মধ্যে দেখা যায়, ইন্দ্রিয়গুলিকে সাধনের অঙ্গ হিসাবে গ্রহণ করা থেকে তাদের বিলোপ-সাধন পর্যন্ত সবরকম প্রচেষ্টার মাধ্যমে ঈশ্বরোপলব্ধির চেষ্টা। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, হিন্দুধর্ম চিরকালই দুটি spiral বা পেঁচের দ্বারা গঠিত তাদের বেড়গুলি বিপরীতমুখী; একই অক্ষ বা মেরুদণ্ড আশ্রয় করে আছে, এবং একটি অপরটির পরিপূরক।
“বৈষ্ণবধর্ম বলে, ‘পিতা, মাতা, ভ্রাতা, স্বামী বা সন্তানের জন্য এই যে প্রচণ্ড ভালবাসা, এসব ঠিক!, এসবই ঠিক, যদি কেবল তুমি ভাবতে পার যে, কৃষ্ণই তোমার ঐ সন্তান, এবং তাকে আহার করাবার সময় মনে করতে হবে, কৃষ্ণকেই আহার করাচ্ছ। ইন্দ্রিয়গুলোকে নিগ্রহ কর, ওদের দমন কর’—বেদান্তের এই নির্দেশের পরিবর্তে শ্রীচৈতন্যের উপদেশ ছিল—”ইন্দ্রিয়গুলির সহায়তা নিয়ে পূজা কর!
“বর্তমান কালে আমরা জাতীয় ধর্মের তিনটি বিভিন্ন রূপ দেখতে পাইপ্রাচীনপন্থী ধর্ম, আর্যসমাজ ও ব্রাহ্মসমাজ। প্রাচীনপন্থী ধর্ম মহাভারত যুগে বৈদিক হিন্দুগণ কর্তৃক গৃহীত পথ অবলম্বন করেছে। জৈনধর্মের স্থান অধিকার করেছে আর্যসমাজ, এবং ব্রাহ্মসমাজ বৌদ্ধধর্মের স্থান গ্রহণ করেছে।
“আমি দেখতে পাচ্ছি, ভারত নবীন ও প্রাণবন্ত। ইউরোপও তরুণ এবং সজীব। এদের মধ্যে কেউ এখনো পর্যন্ত বিকাশের এমন স্তরে উপনীত হয়নি, যাতে তাদের সব অনুষ্ঠান নিরাপদে সমালোচনা করা চলে। উভয়েই বিরাট পরীক্ষা-নিরীক্ষায় রত, কোনটি এখন পর্যন্ত সম্পূর্ণতা লাভ করেনি। ভারতে আমাদের সর্বস্তরে যে সাম্যবাদ (Social Communism) তা সমাজের অধীনে, অদ্বৈতজ্ঞানের আলো তার ওপর এবং আশে পাশে বিকীর্ণ হচ্ছে, তাকে বলা যায় আধ্যাত্মিক ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র (Spiritual Individualism)। ইউরোপে তোমরা সামাজিক ব্যাপারে ব্যক্তিস্বাতন্ত্রতার (Social Individualism) পক্ষপাতী, কিন্তু চিন্তাধারায় তোমরা দ্বৈতবাদী; অর্থাৎ আধ্যাত্মিক ব্যাপারে তোমরা নিজ নিজ মতে না চলে কোন একটা সাধারণ মত (Spiritual Communism) অনুসরণ কর। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, একের (অর্থাৎ ভারতের) দৈনন্দিন জীবনের সব অনুষ্ঠান সমাজতন্ত্র দ্বারা নিয়ন্ত্রিত; কিন্তু ব্যক্তিগত চিন্তা স্বাধীনতা দ্বারা সীমাবদ্ধ; আর অপরের অনুষ্ঠানগুলি ব্যক্তিতান্ত্রিক, কিন্তু এক সাধারণ চিন্তাপ্রভাবে নিয়ন্ত্রিত।
“এখন আমাদের ভারতীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষাকে তার নিজের ভাবেই সাহায্য করতে হবে। যে সব আন্দোলন কোন ব্যক্তি বা কাজকে তাদের নিজস্বভাব বজায় রেখে সাহায্য করতে চেষ্টা না করে, আন্দোলন হিসাবে তার সার্থকতা থাকে না। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলতে পারি, ইউরোপে আমি বিবাহ ও ব্রহ্মচর্যকে সমানভাবে শ্রদ্ধা করি। কখনন ভুলে যেও না, দোষ ও গুণের সমাবেশেই মানুষ মহৎ হয় ও পূর্ণত্ব লাভ করে। সুতরাং কোন জাতির সবই দোষযুক্ত একথা প্রমাণ করা সম্ভব হলেও, তার উন্নতির জন্য সাহায্য করতে গিয়ে তার জাতীয়ত্ব অপহরণ করবার চেষ্টা করা উচিত নয়।”
ব্যক্তিস্বাতন্ত্র বলিতে তিনি কি বুঝিতেন, সে বিষয়ে তাহার ধারণা অত্যন্ত স্বচ্ছ ছিল। কতবার তিনি আমাকে বলিয়াছেন, “তোমরা এখনো ভারতবর্ষকে বুঝতে পারনি। যাই বলল, ভারতবাসী আমরা মানুষের উপাসনা করি। আমাদের ঈশ্বর দেহধারী মানুষ।” এ স্থলে তিনি সেই সব আত্মদর্শী মহাপুরুষদের কথা বলিতেছিলেন —যেমন বুদ্ধ, শ্রীকৃষ্ণ, গুরু বা মহাপুরুষ। অন্য এক সময়ে তিনি ‘মানব’ শব্দটি সম্পূর্ণ পৃথক অর্থে ব্যবহার করেন। তিনি বলিয়াছিলেন, “এই মানব-উপাসনার(৩) ভাব সূক্ষ্ম বীজাকারে ভারতবর্ষে বর্তমান, কিন্তু কখনো বিকাশলাভ করেনি। তোমাদের উচিত এর বিকাশসাধন। এই ভাবকে কাব্যে, ললিতকলায় রূপায়িত কর। তোমাদের মধ্যযুগের ইউরোপের মতো আবার সেই ভিক্ষুকদের পা পূজা করবার প্রথা প্রবর্তন কর। মানুষের পূজা করবে এমন এক উপাসক সম্প্রদায়ের সৃষ্টি কর।”
