“জিজ্ঞেস করতে পার, এই প্রাচীন-আধুনিক সময়ের মধ্যে শ্রীরামকৃষ্ণের স্থান কোথায়?
“তিনিই এই কার্যসাধনের প্রণালীস্বরূপ—সেই অদ্ভুত, অহংজ্ঞানরহিত পন্থা! তিনি নিজেকে জানতেন না। ইংলণ্ড বা ইংরেজদের সম্বন্ধে তার এইটুকু মাত্র জ্ঞান ছিল যে, তারা এক অদ্ভুত প্রকৃতির লোক—দূরে সমুদ্রের ওপারে বাস করে। কিন্তু তিনি সেই অসাধারণ জীবন যাপন করে গেছেন—আমি তার ব্যাখ্যাকার মাত্র। তার মুখে কারও সম্পর্কে কদাপি নিন্দা ছিল না। একবার আমাদের দেশের বীভৎস আচার-বিশিষ্ট কোন সম্প্রদায়কে আমি তীব্র সমালোচনা করি। তিন ঘণ্টা ধরে আমি কঠোরভাবে তার উদ্দেশ্যে বকে যাচ্ছি, তিনিও নীরবে শুনে যাচ্ছেন। আমার সব কথা শেষ হবার পর তিনি শুধু বললেন, “দেখ, সব বাড়িতেই মেথর ঢুকবার জন্য পিছন দিকে একটা দরজা থাকে। এও সেইরকম আর কি!
“এতদিন ধরে আমাদের (ভারতের) দেশের ধর্মের মহাদোষ ছিল এই যে, সে মাত্র দুটি কথা জানতত্যাগ ও মুক্তি। এ জগতে কি কেবল মুক্তিই দরকার? গৃহীদের জন্য কিছুই চাই না?
“কিন্তু আমি এই সব লোকদেরই বিশেষ করে সাহায্য করতে চাই। সব আত্মাই স্বরূপতঃ এক নয় কি? সকলেরই গম্যস্থান কি এক নয়?
“শিক্ষার মধ্য দিয়ে জাতির মধ্যে শক্তি সঞ্চার করতে হবে—এইটিই উপায়?”
সেই সময়ে মনে হইয়াছিল, এবং পরেও যত ভাবিয়াছি, ততই অধিকতররূপে আমার মনে হইয়াছে যে, আচার্যের নিকট হইতে এই একটি মাত্র কথা শুনিবার জন্যও সমস্ত সমুদ্রপথ অতিক্রম করা সার্থক।
১৫. হিন্দুধর্ম
স্বামীজী সর্বদাই হিন্দুধর্মকে এক অখণ্ডরূপে চিন্তা করায় মগ্ন থাকিতেন, এবং বৈষ্ণবধর্ম প্রসঙ্গেই এ বিষয়টির বার বার অভিব্যক্তিদেখা যাইত। সন্ন্যাসী হিসাবে সম্ভবতঃ শৈবধর্মের ভাবসমূহের দ্বারা তাহার কল্পনা সমধিক প্রভাবিত ছিল, কিন্তু বৈষ্ণবধর্ম ও উহার বিশ্লেষণেও তাঁহার অনুরাগ ছিল চিরকাল। অবশ্য ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাসহায়ে যে বিষয়টি তাহার অধিগত ছিল, তাহা হইল অদ্বৈতবাদের সত্যতা। যে দুটি প্রতীকের মাধ্যমে তিনি এই অদ্বৈতবাদ প্রচার করিতে চাহিতেন—তাহার একটি সন্ন্যাসের আদর্শ, অপরটি ভীষণের পূজা। এই উভয় সত্যই কিন্তু কেবল বীর বা যোদ্ধাপ্রকৃতির ব্যক্তির জন্য। উহাদের দ্বারা একদল সৈন্য সংগঠন করা যাইতে পারে। জগতের অধিকাংশ মানব চিরদিন ঈশ্বরকে দয়ালু, রক্ষাকর্তা এবং পালনকর্তা বলিয়া চিন্তা করিবে। প্রকৃত প্রশ্ন হইল, সর্বোচ্চ অদ্বৈতদর্শন এবং এই প্রকারের বিশ্বাসের মধ্যে যে সংযোগ আছে, সেই সম্পর্কে সাধারণ লোকের জ্ঞান কিরূপে অধিকতর দৃঢ় করা যায়। বস্তুতঃ পাশ্চাত্যের কথা বলিতে গেলে এই সংযোগসেতু নির্মাণ করিবার প্রয়োজন ছিল। সেখানে অদ্বৈতবাদ ব্যাখ্যা ও প্রচার আবশ্যক। কিন্তু ভারতবর্ষে বহুপূর্বেই এ কার্য সম্পন্ন হইয়াছে। ভারতে এই বিষয়গুলি সর্বজনীনভাবে স্বীকৃত ও গৃহীত। এখন কেবল প্রয়োজন ঐ উপলব্ধির পুনরুজ্জীবন, হিন্দুধর্মের বিভিন্ন অংশগুলি যে পরস্পর সম্বদ্ধ তাহা ভারতবাসীকে স্মরণ করাইয়া দেওয়া এবং প্রয়োজন ঐ বিষয়টির বারংবার আলোচনা, যাহাতে যে তর্কযুক্তি সহায়ে বৈষ্ণবধর্ম ও সর্বোচ্চ দর্শন অদ্বৈতবাদ অবিসংবাদিতরূপে অনন্যান্যসাপেক্ষ বলিয়া প্রমাণিত, তাহার মধ্যে কোন ছিদ্র না থাকে।
এইরূপে, তিনি হিন্দুধর্মের ঐতিহাসিক আত্মপ্রকাশের সৌন্দর্যের দিকটি বর্ণনা করিতে ভালবাসিতেন। সর্বদাই তিনি অন্বেষণ করিতেন, কোন একটি ঘটনার ক্রমবিকাশের পশ্চাতে কোন মহাশক্তির প্রেরণা বিদ্যমান। কোন ধর্মসংস্থাপকের পিছনে সেই চিন্তাশীল মনীষী কোথায়? আবার সেই চিন্তারাশি পূর্ণতালাভ করিল কোন্ মহাপ্রাণের চেষ্টায়! বুদ্ধ তাহার রূপ, বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার ও বিজ্ঞান এই পঞ্চতত্ত্বে গঠিত দর্শন মহর্ষি কপিলের নিকট প্রাপ্ত হন। কিন্তু যে প্রেম ঐ দর্শনে প্রাণ সঞ্চার করে, তাহা বুদ্ধের নিজস্ব। কপিল বলিয়াছিলেন, এই পঞ্চতত্ত্বের কোনটির সম্পর্কেই নির্দিষ্ট করিয়া কিছু বলা যায় না, কারণ কোনটিরই অস্তিত্ব নাই। উহা অতীতে ছিল, কিন্তু বর্তমানে আর নাই। “প্রত্যেকেই জলরাশির উপর বুদ্বুদমাত্র। হে মানব, জেনে রাখো, তুমি সেই জলধিস্বরূপ।”
আবার সর্বসাধারণের বোধ্য যে হিন্দুধর্ম তাহার প্রচারক ও স্রষ্টা হিসাবে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রতি স্বামীজীর এমন আবেগপূর্ণ মনোভাব ছিল, যাহা ভগবান বুদ্ধের প্রতি ব্যক্তিগত প্রগাঢ় অনুরাগ অপেক্ষা কোনক্রমেই কম বলা চলে না। শ্রীকৃষ্ণের বহুমুখী ভাবের তুলনায় বুদ্ধের সন্ন্যাস আদর্শ প্রায় দুর্বলতাই বলা যায়। গীতা কি বিস্ময়কর গ্রন্থ!
“সমঃ শত্রৌ চ মিত্রে চ তথা মানাপমানয়োঃ।
শীতোষ্ণসুখদুঃখেষু সমঃ সঙ্গবিবর্জিতঃ ॥”গীতা, ১২।১৮
বাল্যকালে গীতা পড়িবার সময় তিনি প্রায়ই ঐ ধরনের কোন গভীর অর্থপূর্ণ বাক্য দেখিলে থামিয়া যাইতেন, তারপর বহুদিন ধরিয়া ঐ কথাগুলি তাহার মস্তিষ্কে আলোড়ন তুলিত। আর সেই যুদ্ধের বর্ণনা—সেই প্রচণ্ড তেজঃপূর্ণ যুদ্ধ—শ্রীকৃষ্ণের ‘ক্লৈব্যং মাস্ম গমঃ পার্থ নৈতত্ত্বয্যুপপদ্যতে’ (গীতা, ২।৩) বাক্যে যাহার আরম্ভ! কি শক্তিপূর্ণ! ইহা ব্যতীত সত্যই গীতা অপূর্ব সৌন্দর্যের খনি! বৌদ্ধগ্রন্থগুলির পর গীতা যেন সকলের নিকট স্বস্তি বহন করিয়া আনিল। বুদ্ধ সর্বদা বলিতেন, “আমি সাধারণ লোকদের জন্য এসেছি।” অমনি বৌদ্ধগণ তাহার নামে ললিতকলা ও বিদ্যাচর্চার সমস্ত গৌরব পদদলিত করিয়া চূর্ণ করিল। প্রাচীনকে ধ্বংস করিয়া ফেলাই বৌদ্ধধর্মের সর্বাপেক্ষা মারাত্মক ভুল।
