“কিন্তু উচ্চপদে অধিষ্ঠিত যে-কোন লোক মহতের ন্যায় আচরণ করতে পারে। রঙ্গমঞ্চের পাদপ্রদীপের আলোয় অতি বড় ভীরুও সাহসী হয়ে ওঠে—জগৎসুদ্ধ লোক যে তার দিকে তাকিয়ে আছে! তখন কার না হৃদয় নেচে উঠবে? কার না শিরায় রক্তস্রোত দ্রুততর বইবে, যতক্ষণ না সে তার শক্তির সম্পূর্ণ বিকাশ দেখাতে পারছে।
“দিন দিন আমার কাছে নগণ্য কীটের মতো নীরব অবিচলিতভাবে মুহূর্তের পর মুহূর্ত, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অবিশ্রান্ত কর্তব্য কর্ম করে যাওয়াই প্রকৃত মহত্ত্ব বলে বোধ হয়।”
স্বামীজীর অপূর্ব কথাবার্তার স্মৃতি বিজড়িত থাকায় মানচিত্রের কত নূতন স্থানই না আমার দৃষ্টিতে নূতন সৌন্দর্য লাভ করিয়াছে। ইটালীর উপকূল অতিক্রম করিবার সময় আমরা বিভিন্ন খ্রীস্টীয় ধর্মমত সম্পর্কে আলোচনা করিয়াছি। বনিফেসিও প্রণালীর মধ্য দিয়া যাইবার সময় কর্সিকা দ্বীপের দক্ষিণ উপকূল আমাদের দৃষ্টিগোচর হইলে সম্রমের সহিত স্বামীজী মৃদুতরকণ্ঠে ‘সেই সংগ্রামদেবতার জন্মভূমি’ সম্পর্কে বলিতে লাগিলেন, এবং ক্রমশঃ ফরাসী দেশের অবতারণা করিয়া রোবসপিয়রের ক্ষমতা সম্পর্কে অথবা ‘তুমিও নেপোলিয়ন!’ এই কথা দ্বারা ভিকটর হিউগো তৃতীয় নেপোলিয়নের প্রতি যে অবজ্ঞা প্রদর্শন করেন, সে সম্বন্ধে বর্ণনা দিতে লাগিলেন।
জিব্রাল্টার প্রণালীর মধ্য দিয়া যাইবার সময় আমি প্রাতঃকালে ডেকের উপর আসিতেই, তিনি সাগ্রহে বলিলেন, “তুমি তাদের দেখেছ কি? তাদের দেখেছ কি? ওখানে জাহাজ থেকে তারা নামছে, আর ‘দীন্!’ ‘দীন্!’ শব্দে গগন বিদীর্ণ করছে।” অতঃপর আধ ঘণ্টা ধরিয়া মুরদিগের বারংবার স্পেন আক্রমণের জ্বলন্ত বর্ণনা দ্বারা তিনি আমাকে অভিভূত করিয়া দিলেন। আবার হয়তো কোন রবিবারের সন্ধ্যায় তিনি বহুক্ষণ ধরিয়া বুদ্ধদেবের গল্প করিলেন। বুদ্ধ-জীবনের সাধারণ ইতিহাস বর্ণিত নীরস ঘটনাগুলিতে তিনি যেন নূতন প্রাণ সঞ্চার করিতেন। মহাভিনিষ্ক্রমণ ব্যাপারটি ভগবান বুদ্ধের নিকট যেরূপ বোধ হইয়াছিল, স্বামীজী ঠিক সেইভাবেই উহার বর্ণনা দিতেন।
কিন্তু তাহার সকল কথাবার্তাই মনোরঙ্ক অথবা শিক্ষাসংক্রান্ত ছিল না। প্রায়ই তিনি জ্বলন্ত উৎসাহের সহিত নিজের জীবনের মহান উদ্দেশ্য বর্ণনা করিতেন। ঐ সকল সময়ে আমি পূর্ণ মনোযোগের সহিত অনুধাবন করিবার চেষ্টা করিতাম। তাহার শ্রীমুখ-নিঃসৃত প্রত্যেকটি বাক্য সংগ্রহ করিয়া রাখিবার ঐকান্তিক আগ্রহ আমার ছিল। কারণ আমি জানিতাম, ভবিষ্যতে অসংখ্য ভক্ত ও জিজ্ঞাসু জন্মগ্রহণ করিবেন, যাহারা স্বামীজীর স্বপ্নগুলি বাস্তবে পরিণত করিবেন, এবং তাহাদের ও স্বামীজীর মধ্যে আমি কেবল বার্তাবাহী যন্ত্র বা সেতুস্বরূপ।
যখন আমরা এডেনের নিকটবর্তী হইয়াছি, সেই সময়ে এইরূপ একটি সুযোগ উপস্থিত হইল। সেদিন প্রাতঃকালে আমি তাহাকে জিজ্ঞাসা করি, ভারতের কল্যাণের জন্য তাহার যে সব পরিকল্পনা, এবং অপরে যে সব উপায় নির্দেশ করে, এই উভয়ের মধ্যে মোটামুটি পার্থক্য কোন্ কোন্ বিষয়ে বলিয়া তিনি মনে করেন? এ বিষয়ে তাহার যথার্থ মনোভাব জানা অসম্ভব বলিয়াই বোধ হইল। বরং তিনি অন্য মতাবলম্বী নেতাদের কাহারও কাহারও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এবং কার্যপ্রণালীর প্রশংসাই করিলেন। আমারও মনে হইল, ঐ প্রশ্নটি চুকিয়া গেল। হঠাৎ সন্ধ্যার সময় তিনি নিজেই ঐ বিষয়ের পুনরবতারণা করিলেন।
তিনি বলিলেন, “যারা তাদের নিজের নিজের কুসংস্কারগুলো আমার দেশবাসীর মধ্যে ঢুকিয়ে দিচ্ছে, তাদের সঙ্গে আমি কখনো একমত নই। মিশরদেশের পুরাতত্ত্ব-আলোচনায় রত ব্যক্তিগণের যেমন ঐদেশের প্রতি একটা স্বার্থজড়িত অনুরাগ থাকে, তেমনি ভারতের প্রতিও কারও কারও এমন অনুরাগ থাকতে পারে যা সম্পূর্ণ স্বার্থজড়িত। এরকম অনুরাগলাভ শক্ত নয়। লোকের এরকম আকাঙক্ষা হতে পারে যে, এদের পড়া বইগুলিতে, চর্চায় এবং কল্পনার রাজ্যে ভারতের যে চিত্র তার মনের মধ্যে রয়েছে, অতীতযুগের সেই ভারতকেই সে আবার প্রত্যক্ষ করে। আমার ইচ্ছা, প্রাচীন ভারতের সগুণগুলিই আবার জেগে উঠুক এবং তার সঙ্গে যুক্ত হোক বর্তমান যুগের যা কিছু শক্তিশালী গুণ; কেবল এই মিশ্রণব্যাপারটা স্বাভাবিকভাবে হওয়া চাই! নূতন ভারতকে গড়ে উঠতে হবে ভিতর থেকে, কোন বাইরের শক্তির সাহায্যে নয়।
“সেজন্য, আমি শুধু উপনিষদ প্রচার করি। লক্ষ্য করে দেখলে বুঝতে পারবে, উপনিষদ্ ব্যতীত অন্য কিছু থেকে আমি কখনো প্রমাণরূপে উদ্ধৃত করিনি। আবার উপনিষদের মধ্যেও কেবল সেই ভাবটি—যা শক্তির প্রকাশক। বেদ-বেদান্তের সার ঐ একটি শব্দে নিহিত। বুদ্ধ অপ্রতিরোধ বা অহিংসা প্রচার করেছিলেন। কিন্তু আমার মতে ঐ একই শিক্ষা উপনিষদের বীর্য শব্দের দ্বারা আরও অধিক দেওয়া যায়। কারণ, অহিংসার পেছনে মারাত্মক দুর্বলতা থেকে যায়। দুর্বলতা থেকেই আসে প্রতিরোধের ভাব। গায়ে একবিন্দু সাগরজল লাগলে, আমি তার থেকে ভয়ে পালিয়ে যাই না, বা তাকে শাস্তি দেবার কথাও মনে আসে না। আমার কাছে ওটা গ্রাহ্যের মধ্যেই নয়। কিন্তু একটা মশার কাছে ঐ একবিন্দু জলই বিপজ্জনক। আমি চাই, যে কোন আঘাতের ক্ষেত্রেই, তাকে যেন তুচ্ছ করতে পারি। শক্তি ও নির্ভীকতা! আমার নিজের আদর্শ সেই অদ্ভুত সাধু, সিপাহী বিদ্রোহের সময় যাকে তারা মেরে ফেলেছিল–এবং যিনি মর্মান্তিকভাবে ছুরিকাবিদ্ধ হয়েই কেবল মৌন ভঙ্গ করে বলেছিলেন, ‘হ, তুমিও তিনি—তত্ত্বমসি!’
