ঐরূপ একদিন, কোন ব্রত লইয়া যাহারা সিদ্ধিলাভ না করিতে পারে, তাহাদের কী গতি হয়, এই বিষয়ে প্রশ্ন করিলে তিনি কয়েকটি সুন্দর সংস্কৃতশ্লোক উদ্ধৃত করিয়া উত্তর দেন। তাঁহার সেই অপূর্ব কণ্ঠস্বর এখনও আমার কানে বাজিতেছে।
অর্জুনের প্রশ্নটি আবৃত্তি করিলেনঃ
“অতিঃ শ্ৰদ্ধয়োপেতে যোগাচ্চলিতমানসঃ।
অপ্রাপ্য যোগসংসিদ্ধিং কাং গতিং কৃষ্ণ গচ্ছতি ॥
কচ্চিন্নোভয়বিভ্রষ্টশ্চিন্নাভ্রমিব নশ্যতি।
অপ্রতিষ্ঠো মহাবাহো বিমূঢ়ো ব্ৰহ্মণঃ পথি।।”
–গীতা, ৬/৩৭-৩৮
—অর্থাৎ হে কৃষ্ণ, যে সকল ব্যক্তি শ্রদ্ধার সহিত কোন যোগ অভ্যাস করিতে আরম্ভ করিয়া উহাতে সিদ্ধিলাভ করিতে না পারিলে তাহাদের কি গতি হয়? হে মহাবাহো, ব্ৰহ্মমার্গে অবস্থান না করিতে পারিয়া তাহারা কি উভয় কূল হারাইয়া বায়ুতাড়িত মেঘের ন্যায় খণ্ড খণ্ড হইয়া বিনাশপ্রাপ্ত হয়?
পরক্ষণেই তিনি শ্রীকৃষ্ণের নির্ভীক ও সগর্ব উত্তর আবৃত্তি করিলেনঃ
“পার্থ নৈবেহ নামুত্র বিনাশস্তস্য বিদ্যতে।
ন হি কল্যাণকৃৎ কশ্চিদুর্গতিং তাত গচ্ছতি ॥”
—গীতা, ৬/৪০
–হে পার্থ, ইহলোকে বা পরলোকে তাহাদের কদাপি বিনাশ নাই। হে তাত, যে ব্যক্তি কোন কল্যাণকর কার্যে প্রবৃত্ত হইয়াছে, তাহার কোন কালে দুর্গতি হয় না।
তারপর তিনি এমন এক প্রসঙ্গে উপনীত হইলেন, যাহা আমি জীবনে কখনও ভুলিব না। প্রথমে তিনি বুঝাইয়া দিলেন, শরীর, মন ও বাক্যের সম্পূর্ণ সংযম ব্যতীত যাহা কিছু কাজ, সব ইন্দ্রিয়সেবা মাত্র। অতঃপর বলিলেন, সিদ্ধিলাভে ব্যর্থ সাধক কখন কখনও রাজসিংহাসনের উত্তরাধিকারী হইয়া জন্মগ্রহণ করে, এবং যে বাসনার ফলে তাহার পতন ঘটিয়াছিল, ঐ জন্মে উহাই চরিতার্থ করে। তিনি আরও বলিলেন, “অনেক সময়, পূর্বজন্মের সাধু-জীবনের স্মৃতি এই সব রাজাদের মনের মধ্যে বারংবার উদয় হয়। পূর্বজন্মের এইরূপ একটা অস্পষ্ট স্মৃতি বর্তমান থাকা মহত্ত্বের লক্ষণ বলিয়া গণ্য হয়। আকবরের ঐরূপ স্মৃতি ছিল। তাহার মনে হইত, পূর্বজন্মে তিনি ছিলেন ব্রহ্মচারী, কোন কারণে ব্রত পালনে ব্যর্থ হইয়াছিলেন। কিন্তু তিনি আরও অনুকূল অবস্থার মধ্যে পুনরায় জন্মগ্রহণ করিবেন এবং সেইবার তিনি সিদ্ধিলাভ করিবেন। ইহার পর স্বামীজী নিজের ব্যক্তিগত ঘটনা কিছু কিছু বলিলেন। কদাচিৎ তিনি ঐরূপ বলিতেন। পূর্বজন্মের স্মৃতিপ্রসঙ্গে তিনি যেন অন্যমনে ক্ষণকালের জন্য নিজ অতীত জীবনের আবরণ উন্মোচন করিয়া ফেলিলেন। সহসা আমার দিকে ফিরিয়া আমাকে নাম ধরিয়া ডাকিয়া বলিলেন, “তুমি যাই ভাব . কেন, আমারও এরকম একটা স্মৃতি আছে। যখন আমি মাত্র দু-বছরের, আমাদের সহিসের সঙ্গে ছাইমাখা, কৌপীনপরা বৈরাগী সেজে খেলা করতাম। আর যদি কোন সাধু ভিক্ষা করতে আসত, তাহলে বাড়ির লোকে আমাকে ওপরতলায় দরজা বন্ধ করে রাখত, পাছে আমি তাকে অনেক কিছু দিয়ে ফেলি। আমি মনে প্রাণে অনুভব করতাম, আমিও ঐ রকম সাধু ছিলাম, কোন অপরাধবশতঃ শিবের কাছ থেকে বিতাড়িত হয়েছি। অবশ্য আমার বাড়ির লোকেরা ঐ ভাবটাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল, কারণ আমি যখন দুষ্টুমি করতাম, তারা বলত, “হায়! হায়! এত জপতপ করবার পর শেষে শিব কিনা কোন পুণ্যাত্মাকে না পাঠিয়ে এই ভূতটাকে আমাদের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছেন। অথবা আমি খুব দুরন্তপনা করলে তারা ‘শিব! শিব!’ বলতে বলতে আমার মাথার উপর এক বালতি জল ঢেলে দিত। আর আমিও তৎক্ষণাৎ শান্ত হয়ে যেতাম—এর অন্যথা কখনো হতো না। এখনো পর্যন্ত আমার মনে যখন কোন দুষ্টুবুদ্ধি জাগে, ঐ কথা মনে পড়ে যায়, আর অমনি আমি শান্ত হয়ে যাই। মনে মনে বলি, ‘না, না, এবার আর নয়’!”
যাহা হউক বর্তমান ক্ষেত্রেও স্বামীজী তাহার প্রথামত গীতার মত উদ্ধৃত করিলেন, আমার প্রশ্নের উত্তরে বলিলেন,”তিন রকমের দান আছে—তামসিক, রাজসিক ও সাত্ত্বিক। তামসিক দান—যা ঝোকের মাথায় করা হয়—সব সময়ে তা ভ্রমপূর্ণ। দাতা নিজের দান করবার ঝোক ছাড়া আর কিছু চিন্তা করেন না। নামযশের জন্য যে দান—তাকে বলা হয় রাজসিক দান। আর সাত্ত্বিক দান—যা দেশ কাল ও পাত্র বিচার করে দেওয়া হয়। তারপর যে ঘটনা হইতে আমার প্রশ্নটির উৎপত্তি তাহার উল্লেখ করিয়া বলিলেন, “আমার মনে হয়, তোমার দানটা তামসিক ধরনের হয়েছে। সাত্ত্বিক দানের কথা ভাবতে গেলে আমার মনে দিন দিন এক মহানুভবা পাশ্চাত্য রমণীর কথাই দৃঢ়ভাবে উদয় হচ্ছে; দেখেছি, তারই দানে কোন আড়ম্বর নেই, দেশ কাল ও পাত্রের যথেষ্ট বিচার আছে এবং কোন ভ্ৰম-প্রমাদ নেই! আমার নিজের কথা বলতে গেলে, আমি ক্রমাগত শিক্ষা করছি যে, দানেরও একটা নির্দিষ্ট মাত্রা থাকা চাই, নতুবা ওতে বিপরীত ফল হয়।”
তাহার কণ্ঠস্বর ক্রমে মৃদুতর হইয়া অবশেষে নীরবতায় ডুবিয়া গেল, এবং আমরা নক্ষত্রালোকে উদ্ভাসিত সমুদ্রের দিকে চাহিয়া বসিয়া রহিলাম। তারপর তিনি পুনরায় আরম্ভ করিলেন, “বয়স যত বাড়ছে, ততই দেখছি যে, ছোটছোট কাজের মধ্যেই আমি মহত্ত্বের বিকাশ দেখতে চাই। কোন মহৎ ব্যক্তির সম্পর্কে আমার জানতে ইচ্ছা করে তিনি কি আহার করেন, কি পরেন, চাকরবাকরদের সঙ্গে কিভাবে কথা বলেন—এই সব। আমি দেখতে চাই, সার ফিলিপ সিডনীর মতো ছোটখাট কাজে মহত্ত্বের নিদর্শন। মৃত্যুকালেও পরের তৃষ্ণানিবারণের কথা যাদের মনে আসে—তাদের মতো লোক অতি বিরল।
