সেই রাত্রেই আবার রঘুনাথ শুনিলেন, রামনাম সঙ্কীর্তনের দল কীর্তন করিতে করিতে চলিয়াছে। তিনি যথাসাধ্য চেষ্টা করিলেন, কিন্তু সে আকর্ষণ অদম্য। অবশেষে সব কিছু ছুড়িয়া ফেলিয়া তিনি সারারাত্রি সঙ্কীর্তন দলের সহিত অতিবাহিত করিলেন।
এদিকে রঘুনাথদাসের উপর কর্ণেলের এতদূর আস্থা যে, তাহাকে নিজ মুখে অপরাধ স্বীকার করিতে শুনিয়াও তাহার বিরুদ্ধে কিছু বিশ্বাস করা তাহার পক্ষে কঠিন। সুতরাং ব্যাপারটি স্বচক্ষে দেখিবার জন্য তিনি রাত্রিকালে সৈন্যশিবিরে উপস্থিত হইলেন। দেখিলেন রঘুনাথ নিজ স্থানে দণ্ডায়মান, এবং তাহার সহিত যথাযথ তিনবার সঙ্কেত বাক্য আদান-প্রদান করিলেন। নিশ্চিন্তবোধ করিয়া কর্ণেল নিজ আবাসে প্রত্যাবর্তন করিয়া নিদ্রা গেলেন।
প্রাতঃকালে রঘুনাথদাস আসিলেন নিজের অপরাধ জ্ঞাপন করিয়া অস্ত্রশস্ত্র সমর্পণপূর্বক দণ্ডগ্রহণের উদ্দেশ্যে। কিন্তু তাহার বিবরণ কর্ণেল শুনিলেন না, তিনি নিজে যাহা দেখিয়া ও শুনিয়া আসিয়াছেন তাহাই বর্ণনা করিলেন।
বিস্ময়ে হতবুদ্ধি রঘুনাথ কার্য হইতে কোনপ্রকারে নিষ্কৃতিলাভ করিবার জন্য জিদ করিতে লাগিলেন। এ যে তাহার প্রভু রামচন্দ্র, যিনি ভৃত্যের জন্য ঐরূপ করিয়াছেন! প্রতিজ্ঞা করিলেন, এখন হইতে তিনি আর কাহারও দাসত্ব করিবেন না।
স্বামীজী বলিলেন, “তিনি সরস্বতী নদীর তীরে বৈরাগী সাধুর জীবন যাপন করতে লাগলেন। লোকে তাকে অজ্ঞ মনে করত, কিন্তু আমি তার ক্ষমতা জানতাম। তিনি প্রত্যহ হাজার হাজার লোককে খাওয়াতেন। কিছুদিন পরে হয়তো গমওয়ালা এসে তার প্রাপ্য চাইত। রঘুনাথদাস বলতেন,, কত, হাজার টাকা? দাঁড়াও, দেখি। কই, মহাপুরুষদর্শন প্রসঙ্গে মাস খানেকের ভেতর তো কিছু টাকাকড়ি পাইনি। এ টাকাটা কাল আসবে মনে হয়। টাকা ঠিক সেই দিনই আসত—তার একটুও অন্যথা হতো না।”
একজন রঘুনাথদাসকে জিজ্ঞাসা করেন, রামনাম সঙ্কীর্তন দলের গল্পটি সত্য কি না।
উত্তরে তিনি বলেন, “এ-সকল খবর জেনে লাভ কি?”
প্রশ্নকর্তা বলিলেন, “আমি কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করছি না। আমি শুধু জানতে চাই, এরূপ ব্যাপার ঘটা সম্ভব কি না।”
রঘুনাথদাস উত্তরে বলেন, “ভগবানের ইচ্ছায় সকলই সম্ভব।”…
স্বামীজী তারপর বলিতে লাগিলেন, “আমি হৃষীকেশে অনেক মহাপুরুষ দেখেছি। একজনের কথা আমার মনে আছে। তাকে দেখে পাগল বলে বোধ হয়েছিল। তিনি উলঙ্গ হয়ে রাস্তা দিয়ে আসছিলেন, আর কতকগুলো ছেলে তার পিছু পিছু পাথর ছুঁড়তে ছুঁড়তে আসছিল। তার মুখ ও ঘাড় থেকে দরদর করে রক্ত পড়ছে, তবুও তিনি হেসে কুটিকুটি হচ্ছেন। আমি তাকে কাছে এনে ক্ষতগুলি ধুয়ে দিলাম এবং রক্তপাত বন্ধ করবার জন্য নেকড়া পুড়িয়ে সেখানে লাগিয়ে দিলাম। যতক্ষণ আমি এসকল কাজে ব্যস্ত ছিলাম, তিনি উচ্চ হাস্য করতে করতে ছেলেদের পাথর ছোড়াছুড়ি নিয়ে কি অপূর্ব আনন্দ উপভোগ করছিলেন, তাই আমাকে বলতে লাগলেন। বললেন, ‘জগৎপিতা এভাবেই খেলা করে থাকেন।
“এঁদের মধ্যে অনেকে লোকসঙ্গ থেকে নিষ্কৃতি পাবার জন্য লুকিয়ে থাকেন। লোকজন তাদের কাছে উৎপাতের হেতু মাত্র। একজন তার গুহার চারদিকে মানুষের হাড় ছড়িয়ে রেখেছিলেন এবং রটিয়ে দিয়েছিলেন যে, তিনি শবমাংসভোজী। আর
একজন পাথর ছুঁড়তেন। তারা এরকম নানা উপায় অবলম্বন করে থাকেন।…
“কখনো কখনো তাদের হঠাৎ চৈতন্যোদয় হয়। একটা ঘটনা বলছি। একটি ছোকরা অভেদানন্দের কাছে উপনিষদ্ পড়তে আসত। একদিন সে জিজ্ঞেস করল, ‘মশায়, এ-সব কি বাস্তবিকই সত্য?’
“অভেদানন্দ বলেন, “নিশ্চয়ই! এ-সকল অবস্থা লাভ করা শক্ত হতে পারে, কিন্তু এ-সব নিশ্চয়ই সত্য!
“পরদিনই সেই বালক নগ্ন সন্ন্যাসীর বেশে মৌনব্রত অবলম্বন করে কেদারনাথদর্শনে যাত্রা করল!
“তার কি হলো, জিজ্ঞেস করছ? সে মৌনী হয়ে গেল!
“কিন্তু সন্ন্যাসীদের আর পূজা, তীর্থযাত্রা বা তপস্যাদি করতে হয় না। তবে কেন তারা তীর্থ থেকে তীর্থান্তরে দেবদর্শনাদি করে বেড়ান এবং নানারকম কঠোর তপশ্চরণ করেন? এ-ভাবে পুণ্য অর্জন করে তারা জগৎকে দান করেন।”
তারপর হয়তো শিবিরানার গল্প হইল!বর্ণনান্তে স্বামীজী বলিলেন, “এই সব গল্পই আমাদের জাতির হৃদয়ের অন্তরতম প্রদেশ অধিকার করে রয়েছে। কখনো ভুলোনা যে, সন্ন্যাসী দুটি ব্রত গ্রহণ করেন। একটি সত্যোপলব্ধি, অপরটি জগতের হিতসাধন—’আত্মনো মোক্ষার্থং জগদ্ধিতায় চ। আর তার সবচেয়ে কঠোরভাবে পালনীয় ব্রত হলো, তিনি স্বর্গাদিলাভের চিন্তা পর্যন্ত বর্জন করবেন।”
১৪. ভারতের অতীত ও ভবিষ্যৎ
গুরুর সহিত যদি ভূ-প্রদক্ষিণও করা যায়, তবে উহাই তীর্থযাত্রায় পরিণত হয়। একদিন লোহিতসাগরে সন্ধ্যার কিছু পরে একটি ব্যক্তিগত সমস্যা লইয়া আমি স্বামীজীর নিকট উপস্থিত হই। প্রশ্নটি ছিল, অপরকে সাহায্য করিবার প্রকৃত পন্থা কি। বস্তুতঃ এই ধরনের প্রশ্নের উত্তর তিনি শাস্ত্রোক্তি অবলম্বন ব্যতীত স্বয়ং কদাচিৎ দিতেন। এইরূপ উত্তরের জন্য পরে আমরা কতই না কৃতজ্ঞ বোধ করিয়াছি! তাহার ব্যক্তিগত মত আমরা জানিতে চাহিতাম। কিন্তু কোন শাস্ত্রবাক্যের ব্যাখ্যাসহযোগে ঐ মত প্রকাশ করায় আমাদের মনে উহা দৃঢ়ভাবে অঙ্কিত হইয়া যাইত, এবং অসহিষ্ণু প্রশ্নকর্তার অভিপ্রায় মতো তৎক্ষণাৎ কোন একটা উত্তর দিলে যেরূপ হইত, তাহা অপেক্ষা অধিক দিন ধরিয়া আমরা ঐ বিষয়ে চিন্তা ও আলোচনা কবিতে পারিতাম।
